শান্তিপর্ব: ৬। বেণ ও পৃথু রাজার কথা
পরদিন যুধিষ্ঠিরাদি পুনর্বার ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হলেন। ব্যাস প্রভৃতি ঋষি ও ভীষ্মকে অভিবাদনের পর যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন, পিতামহ, ‘রাজা’ শব্দের উৎপত্তি কি করে হ’ল তা বলুন। রাজা কি প্রকারে পৃথিবী রক্ষা করেন? লোকে কেন তাঁর অনুগ্রহ চায়?
ভীষ্ম বললেন, নরশ্রেষ্ঠ, সত্যযুগের প্রথমে যেভাবে রাজপদের উৎপত্তি হয় তা বলছি শোন। পুরাকালে রাজা ছিল না, রাজা ও দণ্ডও ছিল না, দণ্ডার্হ লোকও ছিল না, প্রজারা ধর্মানুসারে পরস্পরকে রক্ষা করত। ক্রমশ মোহের বশে লোকের ধর্মজ্ঞান নষ্ট হ’ল, বেদও লুপ্ত হ’ল, তখন দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নিলেন। ব্রহ্মা এক লক্ষ অধ্যায়যুক্ত একটি নীতিশাস্ত্র রচনা ক’রে তাতে ধর্ম-অর্থ-কাম এই ত্রিবর্গ এবং মোক্ষবিষয়ক চতুর্থ বর্গ বিবৃত করলেন। এই শাস্ত্রে তিন বেদ, আন্বীক্ষিকী (তর্কবিদ্যা), বার্তা (কৃষিবানিজ্যাদি বৃত্তি), দণ্ডনীতি, সাম দান দণ্ড ভেদ উপেক্ষা এই পঞ্চ উপায়, সন্ধিবিগ্রহাদি, যুদ্ধ, দুর্গ, বিচারালয়ের কার্য, এবং আরও অনেক বিষয় বর্ণিত হয়েছে। মানুষ অল্পায়ু, এই বুঝে মহাদেব সেই নীতিশাস্ত্রকে সংক্ষিপ্ত করলেন, তার পর ইন্দ্র বৃহস্পতি ও যোগাচার্য শুক্র ক্রমশ আরও সংক্ষিপ্ত করলেন।
দেবগণ প্রজাপতি বিষ্ণুর কাছে গিয়ে বললেন, মানুষের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ হবার যোগ্য তা বলুন। বিষ্ণু বিরজা নামে এক মানসপুত্র সৃষ্টি করলেন। বিরজার অধস্তন পুরুষ যথাক্রমে কীর্তিমান কর্দম অনঙ্গ নীতিমান (বা অতিবল) ও বেণ। বেণ অধার্মিক ও প্রজাপীড়ক ছিলেন, সেজন্য ঋষিগণ মন্ত্রপূত কুশ দিয়ে তাঁকে বধ করলেন। তার পর তাঁরা বেণের দক্ষিণ উরু মন্থন করলেন, তা থেকে এক খর্বদেহ কদাকার দগ্ধকাষ্ঠতুল্য পুরুষ উৎপন্ন হ’ল। ঋষিরা তাকে বললেন, ‘নিষীদ’— উপবেশন কর। এই পুরুষ থেকে বনপর্বতবাসী নিষাদ ও ম্লেচ্ছ সকল উৎপন্ন হ’ল। তার পর ঋষিরা বেণের দক্ষিণ হস্ত মন্থন করলেন, তা থেকে ইন্দ্রের ন্যায় রূপবান একটি পুরুষ উৎপন্ন হলেন। ইনি ধনুর্বাণধারী, বেদ-বেদাঙ্গ-ধনুর্বেদে পারদর্শী এবং দণ্ডনীতিজ্ঞ। দেবতা ও মহর্ষিগণ এই বৈণ্যকে বললেন, তুমি নিজের প্রিয়-অপ্রিয় এবং কাম ক্রোধ লোভ মান ত্যাগ ক’রে সর্বজীবের প্রতি সমদর্শী হবে এবং ধর্মভ্রষ্ট মানুষকে দণ্ড দেবে; তুমি প্রতিজ্ঞা কর যে কায়মনোবাক্যে বেদ-নির্দিষ্ট ও দণ্ডনীতিসম্মত ধর্ম পালন করবে, দ্বিজগণকে দণ্ড দেবে না এবং বর্ণসংকরদোষ নিবারণ করবে। বেণপুত্র প্রতিজ্ঞা করলে শুক্রাচার্য তাঁর পুরোহিত হলেন, বালখিল্য প্রভৃতি মুনিরা তাঁর মন্ত্রী হলেন এবং গর্গ তাঁর জ্যোতিষী হলেন।
এই বেণপুত্রে পৃথু বিষ্ণু থেকে অষ্টম পুরুষ। পূর্বোৎপন্ন সূত ও মাগধ নামক দুই ব্যক্তি পৃথুর স্তুতিপাঠক হলেন। পৃথু সূতকে অনূপ-দেশ (কোনও জলময় দেশ) এবং মাগধকে মগধ দেশ দান করলেন। ভূপৃষ্ঠ অসমতল ছিল, পৃথু তা সমতল করলেন। বিষ্ণু, ইন্দ্রাদি দেবগণ ও ঋষিগণ পৃথুকে পৃথিবীর রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। পৃথুর রাজত্বকালে জরা দুর্ভিক্ষ ব্যাধি তস্কর প্রভৃতির ভয় ছিল না, তিনি পৃথিবী দোহন ক’রে সপ্তদশ প্রকার শস্য ও বিবিধ অভীষ্ট বস্তু উৎপাদন করেছিলেন। ধর্মপরায়ণ পৃথু প্রজারঞ্জন করতেন সেজন্য ‘রাজা’, এবং ব্রাহ্মণগণকে ক্ষত (বিনাশ বা ক্ষতি) থেকে ত্রাণ করতেন সেজন্য ‘ক্ষত্রিয়’ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর সময়ে মেদিনী ধর্মের জন্য প্রথিত (খ্যাত) হয়েছিলেন সেজন্যই ‘পৃথিবী’ নাম। পৃথুর রাজ্যে ধর্ম অর্থ ও শ্রী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
যুধিষ্ঠির, স্বর্গবাসী পুণ্যাত্মার যখন পুণ্যফলভোগ সমাপ্ত হয় তখন তিনি দণ্ডনীতিবিশারদ এবং বিষ্ণুর মহত্ত্বযুক্ত হয়ে পৃথিবীতে রাজা রূপে জন্ম-গ্রহণ করেন। পণ্ডিতগণ বলেন, নরদেব (রাজা) দেবতারই সমান।