শান্তিপর্ব: ৭। বর্ণাশ্রমধর্ম্ম — চরনিয়োগ — শুল্ক

ভীষ্ম বললেন, ব্রাহ্মণের ধর্ম ইন্দ্রিয়দমন বেদাভ্যাস ও যাজন। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম দান যজন বেদাধ্যয়ন প্রজাপালন ও দুষ্টের দমন; তিনি যাজন ও অধ্যাপন করবেন না। বৈশ্যের ধর্ম দান, বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ, সদুপায়ে ধনসঞ্চয়, এবং পিতার ন্যায় পশুপালন। প্রজাপতি শূদ্রকে অপর তিন বর্ণের দাসেরূপে সৃষ্টি করেছেন, তিন বর্ণের সেবা করাই শূদ্রের ধর্ম। শূদ্র ধনসঞ্চয় করবে না, কারণ নীচ লোকে ধন দিয়ে উচ্চশ্রেণীর লোককে বশীভূত করে; কিন্তু ধার্মিক শূদ্র রাজার অনুমতিতে ধনসঞ্চয় করতে পারে। শূদ্রের বেদে অধিকার নেই, ব্রাহ্মণাদি তিন বর্ণের সেবা এবং তাঁদের অনুষ্ঠিত যজ্ঞই শূদ্রের যজ্ঞ।

ব্রহ্মচর্য গার্হস্থ্য বানপ্রস্থ ও ভৈক্ষ্য — ব্রাহ্মণের এই চার আশ্রম। মোক্ষকামী ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচর্যের পরেই ভৈক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন। ক্ষত্রিয়াদি তিন বর্ণ চতুরাশ্রমের সবগুলি গ্রহণ করেন না। যে ব্রাহ্মণ দুশ্চরিত্র ও স্বধর্মভ্রষ্ট তিনি বেদচর্চা করুন বা না করুন, তাঁকে শূদ্রের ন্যায় ভিন্ন পংক্তিতে খেতে দেবে এবং দেবকাৰ্য্যে বৰ্জ্জন করবে। যে শূদ্র তার কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম করেছে এবং সন্তানের জনক হয়েছে, সে যদি তত্ত্বজিজ্ঞাসু ও সদাচারী হয় তবে রাজার অনুমতি নিয়ে ভৈক্ষ্য ভিন্ন অন্য আশ্রমে প্ৰবেশ করতে পারে।

যুধিষ্ঠির, সমস্ত জন্তুর পদচিহ্ন যেমন হস্তীর পদচিহ্নে লীন হয় সেইরূপ অন্য সমস্ত ধৰ্ম্ম রাজধৰ্ম্মে লীন হয়। সকল ধৰ্ম্মের মধ্যে রাজধৰ্ম্মই প্রধান, তার দ্বারাই চতুৰ্ব্বর্ণ পালিত হয়। সৰ্ব্বপ্রকার ত্যাগই রাজধৰ্ম্মে আছে এবং ত্যাগই শ্রেষ্ঠ ও প্ৰাচীন ধৰ্ম্ম। সৰ্ব্বপ্রকার ভোগ উপদেশ ও বিদ্যা রাজধৰ্ম্মে আছে, সকলেই রাজধৰ্ম্মের আশ্ৰয়ে থাকে। রাজা যদি দণ্ড না দেন, তবে প্রবল মৎস্য যেমন দুৰ্ব্বল মৎস্যকে ভক্ষণ করে সেইরূপ প্রবল লোকে দুৰ্ব্বলের উপর পীড়ন করবে। রাজার ভয়েই প্রজারা পরস্পরকে সংহার করে না।

রাজা প্রথমেই ইন্দ্ৰিয় জয় ক'রে আত্মজয়ী হবেন, তার পর শত্ৰুজয় করবেন। যারা জড় অন্ধ বা বধিরের ন্যায় দেখতে, এবং ক্ষুধা পিপাসা ও শ্রম সইতে পারে, এমন বিচক্ষণ লোককে পরীক্ষার পর গুপ্তচর করবেন। অমাত্য মিত্র রাজপুত্র ও সামন্তরাজগণের নিকটে এবং নগরে ও জনপদে গুপ্তচর রাখবেন। এই চরেরা যেন পরস্পরকে জানতে না পারে, এবং তারা কি করছে তা দেখবার জন্য অপর লোক নিযুক্ত করতে হবে। যাঁরা সৰ্ব্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন লোককে রাজা অধিকারে নিযুক্ত করবেন। খনি, লবণ-উৎপাদন, পার-ঘাট, ধৃত বন্য হস্তী এবং অন্যান্য বিষয়ের শুল্ক আদায়ের জন্য বিশ্বস্ত লোক রাখবেন। প্রবল শত্ৰু আক্ৰমণ করলে রাজা দুৰ্গমধ্যে আশ্ৰয় নেবেন এবং সমস্ত শস্য সংগ্রহ করবেন। দুৰ্গের মধ্যে আনা অসম্ভব হ'লে ক্ষেত্ৰের শস্য পুড়িয়ে ফেলবেন। নদীর সেতু ভেঙে দেবে, পানীয় জল অপসৃত করবে। অথবা তাতে বিষ দেবেন।

মহৰ্ষি কশ্যপ পুরূরবাকে বলেছিলেন, পাপী লোকে যখন স্ত্ৰীহত্যা ও ব্রাহ্মণহত্যা ক'রেও সভায় সাধুবাদ পায়, রাজাকেও উপেক্ষা করে, তখন রাজার ক্ষয় উপস্থিত হয়। লোকে অত্যন্ত পাপ করলে রুদ্রদেব উৎপন্ন হন, তিনি সাধু ও অসাধু সকলকেই সংহার করেন। এই রুদ্র মানবগণের হৃদয়েই থাকেন এবং ইনিই নিজের ও পরের দেহ বিনষ্ট করেন।

তস্কর যদি প্ৰজার ধন হরণ করে এবং রাজা তা উদ্ধার করতে না পারেন, তবে সেই অক্ষম রাজা নিজের কোষ থেকেই প্ৰজার ক্ষতি পূরণ করবেন। ধৰ্ম্মরাজ, তুমি যদি সৰ্ব্বদাই মৃদুস্বভাব, অতিসৎ, অতিধাৰ্ম্মিক, ক্লীবতুল্য উদ্যমহীন ও দয়ালু হও তবে লোকে তোমাকে মানবে না।