শান্তিপর্ব: ১২। বিশ্বামিত্র-চণ্ডাল-সংবাদ
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, যখন ধর্ম লোপ পায়, লোকে পরস্পরকে বঞ্চনা করে, অনাবৃষ্টির ফলে খাদ্যাভাব হয়, জীবিকার সমস্ত উপায় দস্যুর হস্তগত হয়, সেই আপৎকালে কিরূপে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা উচিত? ভীষ্ম বললেন, আমি এক ইতিহাস বলছি শোন। —
ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিকালে দ্বাদশবর্ষব্যাপী ঘোর অনাবৃষ্টি হয়েছিল। কৃষি ও গোরক্ষা অসম্ভব হ’ল, চোর এবং রাজাদের উৎপীড়নে গ্রাম নগর জনশূন্য হ’ল, গবাদি পশু নষ্ট হয়ে গেল, মানুষ ক্ষুধিত হয়ে পরস্পরের মাংস খেতে লাগল। সেই সময়ে মহর্ষি বিশ্বামিত্র স্ত্রীপুত্রকে কোনও জনপদে ফেলে রেখে ক্ষুধার্ত হয়ে নানা স্থানে পর্যটন করতে লাগলেন। একদিন তিনি চণ্ডালবসতিতে এসে দেখলেন, ভগ্ন কলস, কুক্কুরের চর্ম, শূকর ও গর্দভের অস্থি, এবং মৃত মানুষের বস্ত্র চারিদিকে ছড়ানো রয়েছে। কোথাও কুক্কুট ও গর্দভ ডাকছে, কোথাও চণ্ডালরা কলহ করছে। বিশ্বামিত্র খাদ্যের অন্বেষণ করলেন, কিন্তু কোথাও মাংস অন্ন বা ফলমূল পেলেন না; তখন তিনি দুর্বলতায় অবসন্ন হয়ে ভূপতিত হলেন। এমন সময়ে তিনি দেখতে পেলেন, এক চণ্ডালের গৃহে সদ্যোনিহত কুক্কুরের মাংস রয়েছে। বিশ্বামিত্র ভাবলেন, প্রাণরক্ষার জন্য চুরি করলে দোষ হবে না। রাত্রিকালে চণ্ডালরা নিদ্রিত হ’লে বিশ্বামিত্র কুটিরে প্রবেশ করলেন। সেই কুটিরস্থ চণ্ডাল জাগরিত হয়ে বললে, কে তুমি মাংস চুরি করতে এসেছ? তোমাকে আর বাঁচতে হবে না।
বিশ্বামিত্র উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, আমি বিশ্বামিত্র, ক্ষুধায় মৃতপ্রায় হয়ে তোমার কুক্কুরের জঘন্যমাংস হরণ করতে এসেছি। আমার বেদজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে, আমি খাদ্যাখাদ্য বিচারে অক্ষম, অধর্ম জেনেও আমি চৌর্যে প্রবৃত্ত হয়েছি। অগ্নি যেমন সর্বভুক, আমাকেও এখন সেইরূপ জেনো।
চণ্ডাল সসম্ভ্রমে শয্যা থেকে উঠে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললে, মহর্ষি, এমন কার্য করবেন না যাতে আপনার ধর্মহানি হয়। পণ্ডিতদের মতে কুকুর শৃগালেরও অধম, আবার তার জঘন্য মাংস অন্য অমেধ্যের মাংস অপেক্ষা অপবিত্র। আপনি ধার্মিকগণের অগ্রগণ্য, প্রাণরক্ষার জন্য অন্য উপায় অবলম্বন করুন। বিশ্বামিত্র বললেন, আমার অন্য উপায় নেই। প্রাণরক্ষার জন্য যে কোনও উপায় বিধেয়, সবল হয়ে ধর্মাচরণ করিলেই চলবে। বেদরূপ অগ্নি আমার বল, তারই প্রভাবে আমি অভক্ষ্য মাংস খেয়ে ক্ষুধাশান্তি করব। চণ্ডাল বললে, এই কুক্কুরমাংসে আয়ুর্বৃদ্ধি হয় না, প্রাণ তৃপ্ত হয় না। পঞ্চনখ প্রাণীর মধ্যে শশকাদি পঞ্চ পশুই দ্বিজাতির ভক্ষ্য, অতএব আপনি অন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করুন, অথবা ক্ষুধার বেগ দমন ক'রে ধর্মরক্ষা করুন।
বিশ্বামিত্র বললেন, এখন আমার পক্ষে মৃগমাংস আর কুক্কুরমাংস সমান। আমার প্রাণসংশয় হয়েছে, অসৎ কার্য করলেও আমি চণ্ডাল হয়ে যাব না। চণ্ডাল বললে, ব্রাহ্মণ কুকর্ম করলে তাঁর ব্রাহ্মণত্ব নষ্ট হয়, এজন্য আমি আপনাকে নিবারণ করছি। নীচ চণ্ডালের গৃহ থেকে কুক্কুরমাংস হরণ করলে আপনার চরিত্র দূষিত হবে, আপনাকে অনুতাপ করতে হবে। বিশ্বামিত্র বললেন, ভেকের চিৎকার শব্দে বৃষ জলপানে বিরত হয় না; তোমার উপদেশ দেবার অধিকার নেই।
বিশ্বামিত্র চণ্ডালের কোনও আপত্তি মানলেন না, মাংস নিয়ে বনে চ'লে গেলেন। আগে দেবগণকে তৃপ্ত ক'রে তার পর সপরিবারে মাংস ভোজন করবেন এই স্থির ক'রে তিনি যথাবিধি অগ্নি আহরণ ও চরু(১) পাক ক'রে দেবগণ ও পিতৃগণকে আহ্বান করলেন। তখন দেবরাজ ইন্দ্র প্রচুর বারিবর্ষণ ক'রে ওষধি ও প্রজাগণকে সঞ্জীবিত করলেন। বিশ্বামিত্রের পাপ নষ্ট হ'ল, তিনি পরমগতি লাভ করলেন।
আখ্যান শেষ ক'রে ভীষ্ম বললেন, চরুর আস্বাদ না নিয়েই বিশ্বামিত্র দেবগণ ও পিতৃগণকে তৃপ্ত করেছিলেন। বিপদাপন্ন হ'লে বিদ্বান লোকের যেকোনও উপায়ে আত্মরক্ষা করা উচিত; জীবিত থাকলে তিনি বহু পুণ্য অর্জন ও শুভলাভ করতে পারবেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি যে অশ্রদ্ধেয় ঘোর কর্ম কর্তব্য ব'লে নির্দেশ করলেন তা শুনে আমি বিষাদগ্রস্ত ও মোহচ্ছন্ন হয়েছি, আমার ধর্মজ্ঞান শিথিল হচ্ছে। আপনার কথিত ধর্মে আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। ভীষ্ম বললেন, আমি তোমাকে বেদাদি শাস্ত্র থেকে উপদেশ দিচ্ছি না, পণ্ডিতগণ বুদ্ধিবলে আপৎকালের কর্তব্য নির্ণয় করেছেন। ধর্মের কেবল এক অংশে আশ্রয় করা উচিত নয়, রাজধর্মের বহু শাখা। উগ্র কর্ম সাধনের জন্য বিধাতা তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। শুক্রাচার্য বলেছেন, আপৎকালে অশিষ্ট লোকের নিগ্রহ এবং শিষ্ট লোকের পালনই ধর্ম।