শান্তিপর্ব: ১১। মার্জ্জার-মূষিক সংবাদ

ভীষ্ম বললেন, অবস্থভেদে অমিত্রও মিত্র হয়, মিত্রও অমিত্র হয়; দেশ কাল বিবেচনা ক'রে স্থির করতে হয় কে বিশ্বাসের যোগ্য এবং কার সঙ্গে বিরোধ করা উচিত। হিতার্থী পণ্ডিতগণের সঙ্গে চেষ্টা ক'রে সন্ধি করা উচিত, এবং প্রাণরক্ষার জন্য শত্রুর সঙ্গেও সন্ধি করা বিধেয়। যিনি স্বার্থ বিচার ক'রে উপযুক্ত কালে অমিত্রের সঙ্গে সন্ধি এবং মিত্রের সঙ্গে বিরোধ করেন তিনি মহৎ ফল লাভ করেন। এক পুরাতন উপাখ্যান বলছি শোন। —

কোনও মহারণ্যে এক বিশাল বটবৃক্ষ ছিল। পালিত নামে এক মূষিক সেই বটবৃক্ষের মূলে শতদ্বার গর্ত নির্মাণ ক'রে তাতে বাস করত। লোমশ নামে এক মার্জার সেই বটের শাখায় থাকত এবং শাখাবাসী পক্ষীদের ভক্ষণ করত। এক চণ্ডাল পশুপক্ষী ধরবার জন্য প্রত্যহ সেই বৃক্ষের নীচে ফাঁদ পেতে রাখত। একদিন লোমশ সতর্কতা সত্ত্বেও সেই ফাঁদে পড়ল। চিরশত্রু বিড়াল আবদ্ধ হ'লে মূষিক নির্ভয়ে বিচরণ করতে লাগল। সে দেখলে, ফাঁদের মধ্যে আমিষ খাদ্য রয়েছে; তখন সে মনে মনে বিড়ালকে উপহাস ক'রে ফাঁদের উপর থেকে আমিষ খেতে লাগল। সেই সময়ে এক নকুল (বেঁজি) এবং এক পেচকও সেখানে উপস্থিত হ'ল। মূষিক ভাবলে, এখন আমার তিন শত্রু সমাগত হয়েছে, আমি নীতিশাস্ত্র অনুসারে বিড়ালের সাহায্য নেব। এই মূঢ় বিড়াল বিপদে পড়েছে, প্রাণরক্ষার জন্য সে আমার সঙ্গে সন্ধি করবে। মূষিক বললে, ওহে মার্জার, তুমি জীবিত আছ তো? ভয় নেই, তুমি রক্ষা পাবে; যদি আমাকে আক্রমণ না কর তবে আমি তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করব। আমিও সংকটাপন্ন, ওই নকুল আর পেচক লোলুপ হয়ে আমাকে দেখছে। তুমি আর আমি বহুকাল এই বটবৃক্ষের আশ্রয়ে বাস করছি, তুমি শাখায় থাক, আমি মূলদেশে থাকি। যে কাকেও বিশ্বাস করে না এবং যাকে কেউ বিশ্বাস করে না, পণ্ডিতরা তেমন লোকের প্রশংসা করেন না। অতএব তোমার আর আমার মধ্যে প্রণয় হ'ক, তুমি যদি আমাকে রক্ষা কর তবে আমিও তোমাকে রক্ষা করব।

বৈদূর্য্যলোচন মার্জ্জার মূষিককে বললে, সৌম্য, তোমার কল্যাণ হ'ক। যদি উদ্ধারের উপায় জান তবে আর বিলম্ব ক'রো না, তুমি আর আমি দুজনেই বিপদাপন্ন, অতএব আমাদের সন্ধি হ'ক। মুক্তি পেলে আমি তোমার উপকার ভুলব না। আমি মান বিসর্জ্জন দিয়ে তোমার শরণাপন্ন হ'লাম।

মূষিক আশ্বস্ত হয়ে বিড়ালের বক্ষস্থলে লগ্ন হ'ল, তখন নকুল ও পেচক হতাশ হয়ে চ'লে গেল। মূষিক ধীরে ধীরে বিড়ালের পাশ কাটতে লাগল। বিড়াল বললে, সখা, বিলম্ব করছ কেন? আমি যদি পূর্বে কোনও অপরাধ ক'রে থাকি তবে ক্ষমা কর, আমার উপর প্রসন্ন হও। মূষিক উত্তর দিলে, সখা, আমি সময়জ্ঞ। যদি অসময়ে তোমাকে বন্ধনমুক্ত করি তবে আমি তোমার কবলে পড়ব। তুমি নিশ্চিন্ত হও, আমি তোমার পাশের সমস্ত তন্তু কেটে ফেলেছি, কেবল একটি অবশিষ্ট রেখেছি; চন্ডালকে আসতে দেখলেই তা কেটে ফেলব, তখন তুমি ত্রস্ত হয়ে বৃক্ষশাখায় আশ্রয় নেবে, আমিও গর্তে প্রবেশ করব।

রাত্রি প্রভাত হ'লে বিকটমূর্তি চন্ডাল কুকুরের দল নিয়ে উপস্থিত হ'ল। মূষিক তখনই বিড়ালকে বন্ধনমুক্ত করলে, বিড়াল বৃক্ষশাখায় এবং মূষিক তার গর্তে গেল। চন্ডাল হতাশ হয়ে চ'লে গেল। ভয়মুক্ত হয়ে বিড়াল মূষিককে বললে, সখা, তুমি আমার প্রাণরক্ষা করেছ, এখন বিপদ দূর হয়েছে, তবে আমার কাছে আসছ না কেন? তুমি সবান্ধবে আমার সঙ্গে এস, আমার আত্মীয়বন্ধুগণ সকলেই তোমার সম্মান করবে। তুমি বুদ্ধিতে শুক্রাচাৰ্য্য তুল্য; আমার অমাত্য হও এবং পিতার ন্যায় আমাকে উপদেশ দাও।

তখন সেই পালিত নামক মূষিক বললে, হে লোমশ, মিত্রতা ও শত্রুতা স্থির থাকে না, প্রয়োজন অনুসারে লোকে মিত্র বা শত্রু হয়; স্বার্থই বলবান। যে কারণে আমাদের সৌহার্দ্য হয়েছিল সেই কারণ আর নেই। এখন কিজন্য আমি তোমার প্রিয় হ'তে পারি? তুমি আমার শত্রু ছিলে, স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিত্র হয়েছিলে, এখন আবার শত্রু হয়েছ। আমাকে ভক্ষণ করা ভিন্ন তোমার এখন অন্য কর্তব্য নেই। তোমার ভার্যা আর পুত্রেরাই বা আমাকে নিষ্কৃতি দেবে কেন? সখা, তুমি যাও, তোমার কল্যাণ হ'ক। যদি কৃতজ্ঞ হ'তে চাও তবে আমি যখন অসতর্ক থাকব তখন আমার অনুসরণ ক'রো না, তা হ'লেই সৌহার্দ্য রক্ষা হবে।

উপাখ্যান শেষ ক'রে ভীষ্ম বললেন, যুধিষ্ঠির, সেই মূষিক দুর্ব্বল হলেও একাকী বুদ্ধিবলে বহু শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল। যারা পূর্বে শত্রুতা ক'রে আবার মৈত্রীর চেষ্টা করে, পরস্পরকে প্রতারণা করাই তাদের উদ্দেশ্য। তাদের মধ্যে যে অধিক বুদ্ধিমান সে অন্যকে বঞ্চনা করে, যে নির্বোধ সে বঞ্চিত হয়।