শান্তিপর্ব: ১৪। কৃতঘ্ন গৌতমের উপাখ্যান
ভীষ্মের কথা শেষ হ’লে যুধিষ্ঠির গৃহে গেলেন এবং বিদুর ও ভ্রাতাদের সঙ্গে ধর্ম অর্থ ও কাম সম্বন্ধে বহু আলাপ করলেন। পরদিন তাঁরা পুনর্বার ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, কিপ্রকার লোক সাধু? কার সঙ্গে পরম প্রীতি হয়? বর্তমান কালে এবং ভবিষ্যতে কারা হিতকারী হয়? আমার মনে হয়, হিতবাক্য শোনে এবং হিতকার্য করে এমন সুহৃৎ দুর্লভ। ভীষ্ম বললেন, যারা লোভী ক্রুর ধর্মত্যাগী শঠ অলস কুটিল গুরু পত্নীধর্ষক বন্ধুপরিত্যাগী নির্লজ্জ নাস্তিক অসত্যভাষী দুঃশীল নৃশংস, যে মিত্রের অপকার করে, অপরের অর্থ কামনা করে, অকারণে ক্রোধ এবং হঠাৎ বিরোধ করে, যারা সুরাপায়ী প্রাণিহিংসাপরায়ণ কৃতঘ্ন এবং জনসমাজে নিন্দিত, এমন লোকের সঙ্গে মিত্রতা করা উচিত নয়। যাঁরা সৎকুলজাত জ্ঞানী রূপবান গুণবান অলোভী কৃতজ্ঞ সত্যসন্ধ জিতেন্দ্রিয় ও জন-সমাজ খ্যাত, তাঁরাই রাজার মিত্র হবার যোগ্য। যাঁরা কষ্টস্বীকার করেও সুহৃদের কার্য করেন, তাঁরাই বিশ্বস্ত ও ধার্মিক হন এবং সুহৃদ্গণের প্রতি সর্বদা অনুরক্ত থাকেন। কৃতঘ্ন ও মিত্রঘাতক নরাধমগণ সকলেরই বর্জনীয়। আমি এক প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন। —
গৌতম নামে এক ব্রাহ্মণ ভিক্ষার জন্য এক ভদ্রস্বভাব দস্যুর গৃহে এসেছিলেন। দস্যু তাঁকে নূতন বস্ত্র এবং একটি বিধবা যুবতী দান করলে। গৌতম দস্যুদের আশ্রয়ে বাস করতে লাগলেন এবং তাদেরই তুল্য হিংস্র ও নির্দয় হলেন। কিছুকাল পরে এক শুদ্ধস্বভাব বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ সেই দস্যুগ্রামে এলেন; ইনি গৌতমের স্বদেশবাসী ও সখা ছিলেন। গৌতমের স্কন্ধে নিহিত হংসের ভার, হস্তে ধনুর্বাণ এবং তাঁর রাক্ষসের ন্যায় রুধিরার্ত দেহ দেখে নবাগত ব্রাহ্মণ বললেন, তুমি প্রসিদ্ধ বেদজ্ঞ বিপ্রের বংশে জন্মগ্রহণ ক’রে এমন কুলাঙ্গার হয়েছ কেন? গৌতম বললেন, আমি দরিদ্র ও বেদজ্ঞানশূন্য, অভাবে পড়ে এমন হয়েছি। আজ তুমি এখানে থাক, কাল আমি তোমার সঙ্গে চ’লে যাব। দয়ালু ব্রাহ্মণ সম্মত হয়ে সেখানে রাত্রিযাপন করলেন, কিন্তু গৌতম বার বার অনুরোধ করলেও আহার করলেন না।
পরদিন ব্রাহ্মণ চ’লে গেলে গৌতমও সাগরের দিকে যাত্রা করলেন। তিনি একদল বণিকের সঙ্গ নিলেন, কিন্তু বন্য হস্তীর আক্রমণে বহু বণিক বিনষ্ট হ’ল, গৌতম একাকীই অরণ্যপথে যেতে লাগলেন এবং এক সুরম্য সমতল প্রদেশে উপস্থিত হলেন। সেখানে এক বৃহৎ বটবৃক্ষ দেখে গৌতম তার পাদদেশে সুখে নিদ্রা গেলেন। সন্ধ্যাকালে সেখানে ব্রহ্মার প্রিয় সখা কশ্যপপুত্র পক্ষিশ্রেষ্ঠ নাড়ীজঙ্ঘ নামক বকরাজ ব্রহ্মলোক থেকে অবতীর্ণ হলেন। ইনি ধরাতলে রাজধর্মা নামে বিখ্যাত ছিলেন।
রাজধর্ম গৌতমকে বলিলেন, ব্রাহ্মণ, আপনার কুশল তো? আপনি আমার আলয়ে অতিথি হইয়াছেন, আজ এখানেই রাত্রিযাপন করুন।
রাজধর্ম গঙ্গা থেকে নানাপ্রকার মৎস্য এনে অতিথিকে খেতে দিলেন। গৌতমকে ধনাভিলাষী জেনে রাজধর্ম পরদিন প্রভাতকালে বলিলেন, সৌম্য, আপনি এই পথ দিয়ে যান, তিন যোজন দূরে আমার সখা বিরূপাক্ষ নামক রাক্ষসরাজকে দেখতে পাবেন; তিনি আপনার সকল অভিলাষ পূর্ণ করবেন।
বিরূপাক্ষ গৌতমকে সসম্মানে গ্রহণ ক’রে তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। গৌতম কেবল তাঁর গোত্র জানালেন, আর কিছুই বললেন না। বিরূপাক্ষ বললেন, ব্রাহ্মণ, আপনার নিবাস কোথায়? কোন্ গোত্রে বিবাহ করেছেন? সত্য বলুন, ভয় করবেন না। গৌতম বললেন, আমার জন্ম মধ্যদেশে, এখন শবরালয়ে থাকি; আমি এক বিধবা শূদ্রাকে বিবাহ করেছি। রাক্ষসরাজ বিষণ্ন হয়ে ভাবলেন, ইনি কেবল জাতিতেই ব্রাহ্মণ; যাই হোক, আমার সুহৃৎ মহাত্মা বকরাজ এ’কে পাঠিয়েছেন, অতএব এ’কে আমি তুষ্ট করব। আজ কার্তিকী পূর্ণিমা, সহস্র ব্রাহ্মণের সঙ্গে একেও ভোজন করাব, তার পর ধনদান করব।
ব্রাহ্মণভোজনের পর বিরূপাক্ষ সকলকেই স্বর্ণময় ভোজনপাত্র এবং প্রচুর ধনরত্ন দক্ষিণা দিলেন। সকলে সন্তুষ্ট হয়ে প্রস্থান করলেন, গৌতম তাঁর স্বর্ণের ভার কণ্ঠে বহন ক’রে শ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পূর্বোক্ত বটবৃক্ষের নিকট ফিরে এলেন। মিত্রবৎসল বিহগশ্রেষ্ঠ রাজধর্ম পক্ষদ্বারা বীজন ক’রে গৌতমের শ্রান্তি দূর করলেন এবং ভোজনের আয়োজন ক’রে দিলেন। ভোজনকালে গৌতম ভাবলেন, আমি অনেক সুবর্ণ পেয়েছি, বহু দূরে আমাকে যেতে হবে, পথের জন্য খাদ্য-সামগ্রী কিছুই নেই। এই বকরাজের দেহে প্রচুর মাংস আছে, একেই বধ ক’রে নিয়ে যাব। রাজধর্ম বটবৃক্ষের নিকটে অগ্নি জ্বেলে তারই নিকটে নিজের ও গৌতমের শয়নের ব্যবস্থা করলেন। রাত্রিকালে দুরাত্মা গৌতম রাজধর্মকে বধ করলেন এবং তাঁর পক্ক মাংস ও সুবর্ণভার নিয়ে দ্রুতবেগে প্রস্থান করলেন।
পরদিন রাক্ষসরাজ বিরূপাক্ষ তাঁর পুত্রকে বললেন, বৎস, আজ আমি রাজধর্মকে দেখি নি, তিনি প্রতিদিন প্রভাতকালে ব্রহ্মাকে বন্দনা করতে যান, আমাকে না দেখে গৃহে ফেরেন না। তুমি তাঁর খোঁজ নিয়ে এস। দুরাচার গৌতম তাঁর কাছে গেছে সেজন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়েছি। বিরূপাক্ষের পুত্র তাঁর অনুচরদের নিয়ে বটবৃক্ষের কাছে গিয়ে রাজধর্মের অস্থি দেখতে পেলেন। তার পর তিনি দ্রুতবেগে গিয়ে গৌতমকে ধ’রে ফেললেন এবং তাঁকে মেরুব্রজ নগরে বিরূপাক্ষের কাছে নিয়ে গেলেন। রাজধর্মের মৃতদেহ দেখে সকলেই কাতর হয়ে কাঁদতে লাগলেন। বিরূপাক্ষ বললেন, এই পাপাত্মা গৌতমকে এখনই বধ কর, এর মাংস রাক্ষসেরা খাক্। রাক্ষসেরা বিনীত হয়ে বললে, মহারাজ, একে দস্যুর হাতে দিন, এর পাপদেহ আমরা খেতে পারব না। বিরূপাক্ষের আদেশে রাক্ষসেরা গৌতমকে খণ্ড খণ্ড ক'রে দস্যুদের দিলে, কিন্তু দস্যুরাও খেতে চাইল না। মিত্রদ্রোহী কৃতঘ্ন নৃশংস লোক কীটেরও অভক্ষ্য।
বিরূপাক্ষ যথাবিধি রাজধর্মের প্রেতকার্য করলেন। সেই সময়ে দক্ষকন্যা পয়স্বিনী সুরভি উর্ধ্বে আবির্ভূত হলেন, তাঁর মুখ থেকে দুগ্ধফেন নিঃসৃত হয়ে চিতার উপর পড়ল। বকরাজ রাজধর্ম পুনর্জীবিত হলেন। তখন ইন্দ্র এসে বললেন, পুরাকালে রাজধর্ম একবার ব্রহ্মার সভায় যায় নি; ব্রহ্মা রুষ্ট হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তারই ফলে রাজধর্মের নিধন হয়েছিল।
রাজধর্ম ইন্দ্রকে বললেন, দেবরাজ, যদি আমার উপর দয়া থাকে তবে আমার প্রিয় সখা গৌতমকে পুনর্জীবিত করুন। গৌতম জীবন লাভ করলে রাজধর্ম তাঁকে আলিঙ্গন ক'রে ধনরত্নের সহিত বিদায় দিলেন এবং পূর্বের ন্যায় ব্রহ্মার সভায় গেলেন। গৌতম শবরালয়ে ফিরে এলেন এবং পুনর্ভূ (দ্বিতীয়বার বিবাহিতা) শূদ্রা পত্নীর গর্ভে দুষ্কৃতকারী বহু পুত্রের জন্ম দিলেন। দেবগণের শাপে কৃতঘ্ন গৌতম মহানরকে গিয়েছিলেন।
আখ্যান শেষ ক'রে ভীষ্ম বললেন, কৃতঘ্ন লোকের যশ সুখ ও আশ্রয় নেই, তারা কিছুতেই নিষ্কৃতি পায় না। মিত্র হ'তে সম্মান ও সর্বপ্রকার ভোগ্য বস্তু লাভ করা যায়, বিপদ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। বিচক্ষণ লোকে মিত্রের সমাদর করেন এবং মিত্রদ্রোহী কৃতঘ্ন নরাধমকে বর্জন করেন।