শান্তিপর্ব: ১৫। আত্মজ্ঞান — ব্রাহ্মণ-সেনাজিৎ- সংবাদ

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি রাজধর্মের অন্তর্গত আপদ্ধর্ম বিবৃত করেছেন, এখন যে ধর্ম সকলের পক্ষেই শ্রেয় তার উপদেশ দিন। ধনক্ষয় হ'লে অথবা স্ত্রীপুত্রাদির মৃত্যু হ'লে যে বুদ্ধি দ্বারা শোক দূর করা যায় তার সম্বন্ধেও বলুন।

ভীষ্ম বললেন, ধর্মের নানা দ্বার আছে, ধর্মকার্য কখনও বিফল হয় না। লোকের যে বিষয়ে নিষ্ঠা হয় তাকেই শ্রেয় জ্ঞান করে, অন্য বিষয়ে তার প্রবৃত্তি হয় না। সংসার অসার এই জ্ঞান হ’লে বৈরাগ্যের উদয় হয়, তখন বুদ্ধিমান লোকের আত্মমোক্ষের জন্য যত্ন করা উচিত। শোকনিবারণের উপায় আত্মজ্ঞান লাভ। আমি এক প্রাচীন কথা বলছি শোন। —

রাজা সেনজিৎ পুত্রের মৃত্যুতে অত্যন্ত কাতর হয়েছিলেন। এক ব্রাহ্মণ তাঁকে এই কথা বলে প্রবোধ দিয়েছিলেন। — রাজা, তুমি নিজেই শোচনীয়, তবে অন্যের জন্য শোক করছ কেন? আমি মনে করি, আমার আত্মাও আমার নয়, আবার সমগ্র পৃথিবীই আমার। এইরূপ বুদ্ধি থাকায় আমি হৃষ্ট হই না ব্যথিতও হই না। মহাসাগরে যেসব কাষ্ঠ ভাসে তারা কখনও মিলিত হয় কখনও পৃথক হয়; জীবগণের মিলনবিচ্ছেদও সেইরূপ। পুত্রাদির উপর স্নেহ করা উচিত নয়, কারণ বিচ্ছেদ অনিবার্য। তোমার পুত্র অদৃশ্য স্থান থেকে এসেছিল, আবার অদৃশ্য স্থানেই চলে গেছে; সে তোমাকে জানত না, তুমিও তাকে জানতে না, তবে কেন শোক করছ? বিষয়বাসনা থেকেই দুঃখের উৎপত্তি হয়। সুখের অন্তে দুঃখ এবং দুঃখের অন্তে সুখ হয়, সুখদুঃখ চক্রের ন্যায় আবর্তন করে। জীবন ও শরীর একসঙ্গেই উৎপন্ন হয়, একসঙ্গেই বিনষ্ট হয়। তৈলকার যেমন তৈলযন্ত্রে তিল নিপীড়িত করে, অজ্ঞানসম্ভূত ক্লেশসকল সেইরূপ জীবগণকে সংসারচক্রে নিপীড়িত করে। মানুষ স্ত্রীপুত্রাদির জন্য পাপকর্ম করে, কিন্তু সে একাকীই ইহলোকে ও পরলোকে পাপের ফল ভোগ করে। বুদ্ধি থাকলেই ধন হয় না, ধন থাকলেই সুখ হয় না। —

যে চ মূঢ়তমা লোকে যে চ বুদ্ধের পরং গতাঃ।
তে নরাঃ সুখমেধন্তে ক্লিশ্যন্ত্যন্তরিতো জনঃ॥
যে চ বুদ্ধিসুখং প্রাপ্তা দ্বন্দ্বাতীতা বিমৎসরাঃ।
তান্নার্থা ন চান্যর্থা ব্যথয়ন্তি কদাচন॥
অথ যে বুদ্ধিমপ্রাপ্তা ব্যতিক্রান্তাশ্চ মূঢ়তাম্।
তেহতিবেলং প্রহৃষ্যন্তি সন্তপ্যন্তি চ॥
সুখং বা যদি বা দুঃখং প্রিয়ং বা যদি বাপ্রিয়ম্।
প্রাপ্তং প্রাপ্তমুপাসীত হৃদয়েনাপরাজিতঃ॥

— জগতে যারা মূঢ়তম এবং যারা পরমবুদ্ধি লাভ করেছে তারাই সুখভোগ করে, যারা মধ্যবর্তী তারা ক্লেশ পায়। যাঁরা রাগদ্বেষাদির অতীত এবং অসূয়াশূন্য হয়ে পরমবুদ্ধিজনিত সুখ লাভ করেছেন, অর্থ ও অনর্থ (ইষ্ট ও অনিষ্ট) তাঁদের কদাচ ব্যথিত করে না। আর, যাঁরা পরমবুদ্ধি লাভ করেন নি অথচ মৃত্যু অতিক্রম করেছেন, তাঁরাই অত্যন্ত হর্ষ ও অত্যন্ত সন্তাপ ভোগ করেন। সুখ বা দুঃখ, প্রিয় বা অপ্রিয়, যাই উপস্থিত হোক, অপরাজিত (অনভিভূত) হয়ে হৃদয়ে মেনে নেবে।

ব্রাহ্মণের নিকট এইপ্রকার উপদেশ পেয়ে সেনজিৎ শান্তিলাভ করলেন।