শান্তিপর্ব: ২০। দক্ষযজ্ঞ
মহাভারতবক্তা বৈশম্পায়নকে জনমেজয় বলিলেন, মহর্ষি, বৈবস্বত মন্বন্তরে প্রচেতার পুত্র প্রজাপতি দক্ষের অশ্বমেধ যজ্ঞ কিরূপে নষ্ট এবং পুনর্বার অনুষ্ঠিত হইয়াছিল তা আপনি বলুন।
বৈশম্পায়ন বলিলেন, পুরাকালে হিমালয় পর্বতের পৃষ্ঠে পবিত্র গঙ্গাদ্বারে দক্ষ প্রজাপতি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। সেই যজ্ঞে দেব দানব গন্ধর্ব, আদিত্যগণ বসুগণ রুদ্রগণ প্রভৃতি, ইন্দ্রাদি দেবগণ, এবং ব্রহ্মার সহিত ঋষিগণ ও পিতৃগণ আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। জরায়ুজ অণ্ডজ স্বেদজ ও উদ্ভিজ্জ এই চতুর্বিধ জীবও সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। সমাগত সকলকে দেখে দধীচি মুনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, যে অনুষ্ঠানে মহেশ্বর রুদ্র পূজিত হন না তা যজ্ঞও নয় ধর্মও নয়। ঘোর বিপদ আসন্ন হয়েছে, মোহবশে তা কেউ বুঝতে পারছে না। এই বলে মহাযোগী দধীচি ধ্যাননেত্রে হরপার্বতী এবং তাঁদের নিকটে উপবিষ্ট নারদকে দেখলেন। দধীচি বুঝলেন, সকলে একযোগে মন্ত্রণা করে মহাদেবকে নিমন্ত্রণ করেন নি। তখন তিনি যজ্ঞস্থান থেকে সরে গিয়ে বললেন, যে লোক অপূজ্যের পূজা করে এবং পূজ্যের পূজা করে না সে নরহত্যার সমান পাপ করে। আমি সত্য বলছি, এই যজ্ঞে জগৎপতি যজ্ঞভোক্তা পশুপতি আসছেন, তোমরা সকলেই দেখতে পাবে!
দক্ষ বললেন, এখানে শূলপাণি জটাজুটধারী একাদশ রুদ্র উপস্থিত রয়েছেন, আমি মহেশ্বর রুদ্রকে চিনি না। দধীচি বললেন, তোমরা সকলে মন্ত্রণা করেই তাঁকে বর্জন করেছ। শঙ্কর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেবতা আমি জানি না। তোমার এই বিপুল যজ্ঞ পণ্ড হবে। দক্ষ বললেন, যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণুই যজ্ঞভাগ গ্রহণের অধিকারী; আমি এই সুবর্ণপাত্রে রক্ষিত মন্ত্রপূত হবি তাঁকেই নিবেদন করব।
এই সময়ে কৈলাসশিখরে দেবী ভগবতী ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আমি কিরূপে দান ব্রত বা তপস্যা করব যার ফলে আমার পতি যজ্ঞের অর্ধ বা একতৃতীয় ভাগ পেতে পারেন? মহাদেব বললেন, দেবী, তুমি কি আমাকে জান না? তোমার মোহের জন্যই ইন্দ্রাদি দেবগণ এবং ত্রিলোক মোহাবিষ্ট হয়েছে। সকল যজ্ঞে আমারই স্তব করা হয়, আমার উদ্দেশ্যেই সামগান হয়, ব্রহ্মবিৎ ব্রাহ্মণগণ আমারই অর্চনা করেন, অধ্বর্যগণ আমাকেই যজ্ঞভাগ দেন। দেবী বললেন, অতি প্রাকৃত (অশিক্ষিত গ্রাম্য) লোকেও স্ত্রীলোকের কাছে নিজের প্রশংসা ও গর্ব করে। মহাদেব বললেন, - Footer/Footnote: (১) সৌপ্তিকপর্ব ৭-পরিচ্ছেদে আছে, যজ্ঞ মৃগরূপে পালিয়েছিলেন।
আমি আত্মপ্রশংসা করছি না, যজ্ঞের জন্য আমি যা সৃষ্টি করছি দেখ। এই ব’লে মহাদেব তাঁর মুখ থেকে এক ঘোরদর্শন রোমহর্ষকর পুরুষ সৃষ্টি করলেন; তাঁর মুখ অতি ভয়ঙ্কর, শরীর অগ্নিশিখায় ব্যাপ্ত, বহু হস্তে বহু আয়ুধ। বীরভদ্র নামক এই পুরুষ কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, কি আজ্ঞা করছেন? মহেশ্বর বললেন, দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস কর।
বীরভদ্র তাঁর রোমকূপ থেকে রোম্য নামক রুদ্রতুল্য অসংখ্য গণদেবতা সৃষ্টি ক’রে তাদের নিয়ে যজ্ঞস্থলে যাত্রা করলেন। মহেশ্বরীও ভীমরূপা মহাকালীর মূর্তি ধারণ করে বীরভদ্রের অনুগমন করলেন। এঁরা যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হ’লে দেবগণ ত্রস্ত হলেন, পর্বত বিদীর্ণ ও বসুন্ধরা কম্পিত হ’ল, বায়ু ঘূর্ণিত এবং সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হতে লাগল, সমস্ত জগৎ তিমিরাচ্ছন্ন হ’ল। বীরভদ্রের অনুচরগণ যজ্ঞের সমস্ত উপকরণ চূর্ণ উৎপাটিত ও দগ্ধ করে সকলকে প্রহার করতে লাগল। তারা অন্ন মাংস পায়স প্রভৃতি খেয়ে ও নষ্ট ক’রে, দেবসৈন্যগণকে ভয় দেখিয়ে হতবুদ্ধি করে, এবং সুরনারীদের ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খেলা করতে লাগল। রুদ্রকর্মা বীরভদ্র যজ্ঞস্থল দগ্ধ এবং যজ্ঞের (১) শিরশ্ছেদন ক’রে ঘোর সিংহনাদ করলেন।
ব্রহ্মাদি দেবগণ ও প্রজাপতি দক্ষ কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, আপনি কে? বীরভদ্র উত্তর দিলেন, আমি রুদ্র নই, ইনিও দেবী ভগবতী নন; আমরা ভোজনের জন্য বা তোমাদের দেখতে এখানে আসি নি, এই যজ্ঞ নষ্ট করতেই এসেছি। ভগবতীকে ক্ষুব্ধ দেখে মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়েছেন। আমি রুদ্রকোপে উৎপন্ন বীরভদ্র, ইনি ভগবতীর কোপ হ’তে বিনিঃসৃত ভদ্রকালী। দক্ষ, তুমি দেবদেব উমাপতির শরণ নাও; অন্য দেবতার নিকট বরলাভ অপেক্ষা মহাদেবের ক্রোধে পড়াও ভাল।
দক্ষ প্রণিপাত ক’রে মহেশ্বরের স্তব করতে লাগলেন। তখন সহস্র সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান মহাদেব অগ্নিকুণ্ড থেকে উত্থিত হয়ে সহাস্যমুখে দক্ষকে বললেন, বল, কি চাও। দক্ষ ভয়ে আকুল হয়ে সাশ্রুনয়নে বললেন, ভগবান, এই যজ্ঞের জন্য বহু যত্নে আমি যেসকল উপকরণ সংগ্রহ করেছিলাম তা দগ্ধ ভক্ষিত ও নাশিত হয়েছে; যদি প্রসন্ন হয়ে থাকেন তবে এই বর দিন — আমার যজ্ঞ যেন নিষ্ফল না হয়। ভগবান বিরূপাক্ষ বললেন, তথাস্তু। তখন দক্ষ নতজানু হয়ে অষ্টোত্তর সহস্র নাম পাঠ ক’রে ভগবান বৃষভধ্বজের স্তব করলেন।