শান্তিপর্ব: ১৯। বিষবৃক্ষ — বিষ্ণুর মাহাত্ম্য — রুদ্রের উৎপত্তি
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আমরা অতি পাপী ও নিষ্ঠুর, অর্থের নিমিত্ত আত্মীয়গণকে সংহার করেছি। যাতে অর্থতৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় তার উপায় বলুন।
ভীষ্ম বললেন, তত্ত্বজিজ্ঞাসু মাণ্ডব্যকে বিদেহরাজ জনক এই কথা বলেছিলেন। — আমার কিছুই নেই, তথাপি সুখে জীবনযাপন করি। মিথিলা দগ্ধ হয়ে গেলেও আমার কিছু নষ্ট হয় না। সকল সমৃদ্ধিই দুঃখের কারণ। সমস্ত ঐহিক সুখ এবং স্বর্গীয় সুখ তৃষ্ণাক্ষয়জনিত সুখের ষোড়শাংশের একাংশও নয়। বৃষের দেহবৃদ্ধির সঙ্গে যেমন তার শৃঙ্গও বৃদ্ধি পায়, সেইরূপ ধনবৃদ্ধির সঙ্গে বিষয়তৃষ্ণাও বর্ধিত হয়। সামান্য বস্তুতেই যদি মমতা হয় তবে তা নষ্ট হলে দুঃখ হয়; অতএব কামনা ত্যাগ করাই উচিত। জ্ঞানী লোকে সর্বভূতকে আপনার তুল্য মনে করেন এবং কৃতজ্ঞতা ও বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে সবই ত্যাগ করতে পারেন। মন্দবুদ্ধি লোকের পক্ষে যা ত্যাগ করা দুঃসাধ্য, দেহ জীর্ণ হলেও যা জীর্ণ হয় না, যা আমরণস্থায়ী রোগের তুল্য, সেই বিষয়তৃষ্ণাকে যিনি ত্যাগ করেন তিনিই সুখী হন।
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, লোকে আমাদের ধন্য ধন্য বলে, কিন্তু আমাদের চেয়ে দুঃখী কেউ নেই। কবে আমরা রাজ্য ত্যাগ ক'রে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করতে পারব যাতে সকল দুঃখের অবসান হবে?
ভীষ্ম বললেন, মহারাজ, ঐশ্বর্যকে দোষজনক মনে ক'রো না! তোমরা ধর্মজ্ঞ, ঐশ্বর্য সত্ত্বেও শমদমাদি সাধন দ্বারা যথাকালে মোক্ষলাভ করবে। উদ্যোগী পুরুষের অবশ্যই ব্রহ্মলাভ হয়। পুরাকালে দৈত্যরাজ বলি যখন নির্জিত রাজ্যহীন ও অসহায় হয়ে শত্রুগণের মধ্যে অবস্থান করছিলেন তখন শুক্রাচার্য তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, দানব, তুমি পরাজিত হয়েছ কিন্তু দুঃখিত হও নি কেন? বলি বললেন, আমি সংসার ও মোক্ষের তত্ত্ব জানি সেজন্য আমার শোক বা হর্ষ হয় না। পূর্বে আমি ত্রিলোক জয় করেছিলাম, তপস্যা দ্বারা ঐশ্বর্য লাভ করেছিলাম, কিন্তু আমার কর্মদোষে সব নষ্ট হয়েছে। এখন আমি ধৈর্য অবলম্বন ক'রে শোকহীন হয়েছি। ইন্দ্রের সহিত যুদ্ধের সময় আমি ভগবান হরিনারায়ণ সনাতন বিষ্ণুকে দেখেছিলাম, যাঁর কেশ মুঞ্জতৃণের ন্যায় পীতবর্ণ, শ্মশ্রু পিঙ্গলবর্ণ, যিনি সর্বভূতের পিতামহ। আমার সেই পুণ্যের ফল এখনও কিছু অবশিষ্ট আছে, তাঁরই প্রভাবে আপনাকে প্রশ্ন করছি — ব্রহ্ম কোথায় অবস্থান করেন? জীব কি প্রকারে ব্রহ্মত্ব লাভ করে?
এই সময়ে মহামুনি সনৎকুমার সেখানে উপস্থিত হলেন। শুক্র তাঁকে বললেন, আপনি এই দানবরাজের নিকট বিষ্ণুর মাহাত্ম্য কীর্তন করুন। সনৎকুমার বললেন, মহাবাহু, এই জগৎ বিষ্ণুতেই অবস্থান করছে, তিনিই সমস্ত সৃষ্টি এবং লয় করেন। তপস্যা ও যজ্ঞ দ্বারা তাঁকে পাওয়া যায় না; যিনি ইন্দ্রিয়সংযম ও চিত্তশোধন করেছেন, যাঁর বুদ্ধি নির্মল হয়েছে, তিনিই পরলোকে মোক্ষলাভ করেন। স্বর্ণকার যেমন বহুবার অগ্নিতে নিক্ষেপ ক'রে অতি যত্নে স্বর্ণ শোধন করে, জীবও সেইরূপ বহুবার জন্মগ্রহণ করে কর্ম দ্বারা বিশুদ্ধি লাভ করে।
যেমন অল্প পুষ্পের সংস্পর্শে তিলসর্ষপাদি নিজ গন্ধ ত্যাগ করে না, কিন্তু বার বার বহু পুষ্পের সংস্পর্শে নিজ গন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে পুষ্পগন্ধে বাসিত হয়, সেইরূপ বহুবার জন্মগ্রহণ করে মানুষ আসক্তিজনিত দোষ থেকে মুক্ত হয়। যাঁর চিত্ত শুদ্ধ হয়েছে তিনি মন দ্বারা অনুসন্ধান করে চৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার এবং অক্ষয় মোক্ষপদ লাভ করেন।
সনৎকুমারের উপদেশ শোনার পর দানবরাজ বৃত্র যোগস্থ হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পরমগতি লাভ করলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, সনৎকুমার যাঁর কথা বলেছিলেন, এই জনার্দন কৃষ্ণই কি সেই ভগবান? ভীষ্ম বললেন, এই মহাত্মা কেশব সেই পরমপুরুষের অংশ। ইনিই জগতের স্রষ্টা এবং প্রলয়কালে সমস্ত বিনষ্ট হলে ইনিই পুনর্বার জগৎ সৃষ্টি করেন; এই বিচিত্র বিশ্ব এতেই অবস্থান করছে। ধর্মরাজ, তোমরা শুদ্ধ ও উচ্চ বংশে জন্মেছ, ব্রতপালনও করেছ। মৃত্যুর পরে তোমরা দেবলোকে যাবে, তার পর আবার মর্ত্যলোকে আসবে; পুনর্বার দেবলোকে সুখভোগ করে সিদ্ধগণের পদ লাভ করবে। তোমাদের ভয় নেই, সকলে সুখে কালযাপন কর।
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, বৃত্র ধার্মিক ও বিষ্ণুভক্ত ছিলেন, তিনি ইন্দ্র কর্তৃক নিহত হলেন কি করে? ভীষ্ম বললেন, যুদ্ধকালে বৃত্রের অতি বিশাল মূর্তি দেখে ভয়ে ইন্দ্রের উরুস্তম্ভ হয়েছিল। তিনি বৃত্র কর্তৃক নিপীড়িত হয়ে মূর্ছিত হলে বশিষ্ঠ তাঁর চৈতন্য সম্পাদন করলেন। তার পর ইন্দ্রাদি দেবগণ ও মহর্ষিগণ বৃত্রবধের জন্য মহাদেবের শরণাপন্ন হলেন। মহাদেব ইন্দ্রের দেহে নিজের তেজ এবং বৃত্রের দেহে জ্বররোগ সংক্রামিত করে বললেন, দেবরাজ, এখন তুমি বজ্র দ্বারা তোমার শত্রুকে বধ কর। তখন ইন্দ্র বজ্রপ্রহার করে বৃত্রকে পাতিত করলেন। মহাদেব যখন দক্ষযজ্ঞ নষ্ট করেছিলেন তখন তাঁর ধর্মবিন্দু থেকে একটি পুরুষ উৎপন্ন হয়েছিল, তারই নাম জ্বর। ব্রহ্মার অনুরোধে মহাদেব জ্বরকে নানা-প্রকারে বিভক্ত করেছিলেন। হস্তিমস্তকের তাপ, পর্বতের শিলাজতু, জলের শৈবাল, ভুজঙ্গের নির্মোক, গোজাতির খুররোগ, ভূমির উর্বরতা, পশুর দৃষ্টিরোধ, অশ্বের গলরোগ, ময়ূরের শিখাচ্ছেদ, কোকিলের নেত্ররোগ, মেষের পিত্তভেদ, শুকের হিক্কা, এবং শার্দূলের ভ্রম, এই সকলকে জ্বর বলা হয়।