শান্তিপর্ব: ২২। সুলভা জনক-সংবাদ
যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম সাংখ্য যোগ গৃহস্থাশ্রম তপস্যা প্রভৃতি সম্বন্ধে বহু উপদেশ দিয়ে সুলভা ও জনকের এই প্রাচীন ইতিহাস বললেন। — সত্যযুগে মিথিলায় জনক (১) নামে এক রাজা ছিলেন, তাঁর অন্য নাম ধৰ্মধ্বজ। তিনি সন্ন্যাসধৰ্ম মোক্ষশাস্ত্র ও দণ্ডনীতিতে অভিজ্ঞ ছিলেন এবং জিতেন্দ্রিয় হয়ে রাজ্য-শাসন করতেন। সুলভা নামে এক ভিক্ষুকী (সন্ন্যাসিনী) রাজর্ষি জনকের খ্যাতি শুনে তাঁকে পরীক্ষা করবার সঙ্কল্প করলেন এবং যোগবলে মনোহর রূপ ধারণ ক’রে মিথিলার রাজসভায় উপস্থিত হলেন। তাঁর সৌন্দর্য দেখে রাজা বিস্মিত হলেন এবং পাদ্য অর্ঘ্য আসন ভোজ্য প্রভৃতি দিয়ে সংবর্ধনা করলেন। তার পর সুলভা যোগবলে নিজের সত্ত্ব বুদ্ধি ও চক্ষু জনকের সত্ত্ব বুদ্ধি ও চক্ষুতে সন্নিবিষ্ট করলেন (২)।
সুলভার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে জনক তাঁকে নিজের মনোমধ্যে গ্রহণ ক’রে সহাস্যে বললেন, দেবী, তুমি কার কন্যা, কোথা থেকে এসেছ? তোমার সম্মানের জন্য আমি নিজের তত্ত্বজ্ঞানলাভের বিষয় বলছি শোন। বৃদ্ধ মহাত্মা পঞ্চশিখ আমার গুরু, তাঁর কাছেই আমি সাংখ্য যোগ ও রাজধৰ্ম এই ত্ৰিবিধ মোক্ষতত্ত্ব শিখেছি। আসক্তি মোহ ও সুখদুঃখাদি দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে আমি পরমশুদ্ধি লাভ করেছি! যদি একজন আমার দক্ষিণ বাহুতে চন্দন লেপন করে এবং অপর একজন আমার বাম বাহু ছেদন করে তবে দুজনকেই আমি সমদৃষ্টিতে দেখব। নিঃস্ব হলেই মোক্ষলাভ হয় না, ধনী হলেও হয় না, জ্ঞান দ্বারাই মোক্ষলাভ হয়। সন্ন্যাসিনী, তোমাকে সুকুমারী সুন্দরী ও যুবতী দেখছি, তুমি যোগসিদ্ধ কিনা সে বিষয়ে আমার সংশয় হচ্ছে। কার সাহায্যে তুমি আমার রাজ্যে ও রাজভবনে এসেছ, কোন্ উপায়ে আমার হৃদয়ে প্রবেশ করেছ? তুমি ব্রাহ্মণী, আমি ক্ষত্রিয়; তুমি সন্ন্যাসিনী হয়ে মোক্ষের অন্বেষণ করছ, আমি গৃহস্থাশ্রমে আছি; আমাদের মিলন হ’তে পারে না। যদি তোমার পতি জীবিত থাকেন তবে আমার পক্ষে তুমি অগম্য পরপত্নী। তুমি আমাকে পরাজিত ক’রে নিজের উন্নতি করতে চাচ্ছ। স্ত্রী-পুরুষের যদি পরস্পরের প্রতি অনুরাগ থাকে তবেই তাদের মিলন অমৃততুল্য হয়, নতুবা তা বিষতুল্য। অতএব আমাকে ত্যাগ করে তোমার সন্ন্যাসধর্ম পালন কর।
জনকের কথায় বিচলিত না হয়ে সুলভা বললেন, মহারাজ, যেমন কাষ্ঠের সঙ্গে লাক্ষা এবং ধূলির সঙ্গে জলবিন্দু, সেইরূপ শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয় প্রাণীর সহিত সংশ্লিষ্ট থাকে। চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়কে কেউ পরিচয় জিজ্ঞাসা করে না, ইন্দ্রিয়গণেরও নিজের সম্বন্ধে জ্ঞান নেই। চক্ষু নিজেকে দেখে না, কর্ণ নিজেকে শোনে না, একত্র হ’লেও পরস্পরকে জানতে পারে না। তুমি যদি নিজেকে এবং অন্যকে সমান জ্ঞান কর তবে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করছ কেন? এই বস্তু আমার, এই বস্তু আমার নয় — এই দ্বন্দ্ব থেকে তুমি যদি মুক্ত হয়ে থাক, তবে তোমার প্রশ্ন নিরর্থক। তুমি মোক্ষের অধিকারী না হয়েই নিজেকে মুক্ত মনে কর। কুপথভোজীর যেমন ঔষধসেবন, সমদৃষ্টিহীন লোকের মোক্ষের অভিমান সেইরূপ বৃথা। তুমি যদি জীবন্মুক্ত হও তবে আমার সংস্পর্শে তোমার কি অপকার হবে? পদ্মপত্রে জলের ন্যায় আমি নির্লিপ্তভাবে তোমার দেহে আছি; এতে যদি তোমার স্পর্শজ্ঞান হয় তবে পঞ্চশিখের উপদেশ বৃথা হয়েছে। আমি তোমার সজাতি, রাজর্ষি প্রধানের বংশে আমি জন্মেছি, আমার নাম সুলভা। যোগ্য পতি না পাওয়ায় আমি মোক্ষধর্মের সন্ধানে সন্ন্যাসিনী হয়েছি, সেই ধর্ম জানবার জন্যই তোমার কাছে এসেছি। নগরমধ্যে শূন্য গৃহ পেলে ভিক্ষুক যেমন সেখানে রাত্রিযাপন করে, সেইরূপ আমি তোমার শরীরে এক রাত্রি বাস করব। মিথিলরাজ, তোমার কাছে আমি সম্মান ও আতিথ্য পেয়েছি; তোমার শরীরের মধ্যে এক রাত্রি শয়ন ক’রে কাল আমি প্রস্থান করব।
সুলভার যুক্তিসম্মত ও অর্থযুক্ত বাক্য শুনে জনক রাজা উত্তর না দিয়ে নীরবে রইলেন।