শান্তিপর্ব: ২৩। বাষ্পসূত্র শ্লোক — নারদের উপদেশ

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, ব্যাসের পুত্র ধর্ম্মাত্মা শুক কিপ্রকারে জন্ম- গ্রহণ ও সিদ্ধিলাভ করেছিলেন তা বলুন। ভীষ্ম বললেন, পুরাকালে মহাদেব ও শৈলরাজসুতা ভবানী ভীষণদর্শন ভূতগণে পরিবেষ্টিত হয়ে সুমেরুর শৃঙ্গে বিহার করতেন। ব্যাসদেব পুত্রকামনায় সেখানে তপস্যায় রত হয়ে মহাদেবের আরাধনা করতে লাগলেন। মহেশ্বর প্রসন্ন হয়ে বললেন, দ্বৈপায়ন, তুমি অগ্নি বায়ু জল ভূমি ও আকাশের ন্যায় পবিত্র পুত্র লাভ করবে, সে ব্রহ্মপরায়ণ হয়ে নিজ তেজে ত্রিলোক আবরন ক'রে যশস্বী হবে।

বরলাভ ক'রে ব্যাস অগ্নি উৎপাদনের জন্য দুই খণ্ড অরণি কাষ্ঠ নিয়ে মন্থন করতে লাগলেন। সেই সময়ে ঘৃতাচী অপ্সরাকে দেখে ব্যাস কামাবিষ্ট হলেন। তখন ঘৃতাচী শুক পক্ষিণীর রূপ ধারণ করলেন। ব্যাস মনঃসংযম করতে পারলেন না, তাঁর শুক্র অরণিকাষ্ঠের উপর স্খলিত হ'ল; তথাপি তিনি মন্থন করতে লাগলেন। সেই অরণিতে শুকদেব জন্মগ্রহণ করলেন। শুকের মন্থনে উৎপন্ন এজন্য তাঁর নাম শুক হ'ল। তখন গঙ্গা মূর্ত্তিমতী হয়ে সুমেরুশিখরে এসে শিশুকে স্নান করালেন, শুকের জন্য আকাশ থেকে রহস্যচারীর ধারণীয় দণ্ড ও কৃষ্ণাজিন পতিত হ'ল এবং দিব্য বাদ্যধ্বনি ও গন্ধর্ব্ব-অপ্সরাদের নৃত্যগীত হ'তে লাগল। মহাদেব ভগবতীর সঙ্গে এসে সদ্যোজাত মুনিপুত্রের উপনয়ন-সংস্কার করলেন। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে কমণ্ডলু ও দিব্যবস্ত্র দিলেন। বহু সহস্র হংস, শতপত্র (কাঠঠোকরা), সারস, শুক, চাষ (নীলকণ্ঠ) প্রভৃতি শুভসূচক পক্ষী বালককে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। জন্মমাত্র সমস্ত বেদ শুকের আয়ত্ত হ'ল। তিনি বৃহস্পতির নিকট সকল শাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন।

শুকদেব তাঁর পিতাকে বললেন, আপনি মোক্ষধর্ম্মের উপদেশ দিন। ব্যাস তাঁকে নিখিল যোগ ও কাপিল (সাঙ্খ্য) শাস্ত্র শিখিয়ে বললেন, তুমি মিথিলায় জনক রাজার কাছে যাও, তিনি তোমাকে মোক্ষধর্ম্মের উপদেশ দেবেন। শুকদেব সুমেরু- শৃঙ্গ থেকে যাত্রা ক'রে ইলাবৃতবর্ষ হরিবর্ষ ও হৈমবতবর্ষ অতিক্রম করলেন এবং চীন হূণ প্রভৃতি দেশ দেখে ভারতবর্ষে আর্য্যাবর্ত্তে এলেন। তার পর মিথিলার রাজ- ভবনে উপস্থিত হয়ে দুই কক্ষ (মহল) অতিক্রম ক'রে তিনি অমরাবতীতুল্য তৃতীয় কক্ষায় প্রবেশ করলেন। সেখানে পঞ্চাশ জন রূপবতী বারাঙ্গনা তাঁকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে পূজা ক'রে সুস্বাদু অন্ন নিবেদন করলে। জিতেন্দ্রিয় শুকদেব সেইসকল নারীগণে পরিবৃত হয়ে নির্ব্বিকারচিত্তে এক দিবারাত্র যাপন করলেন।

পরদিন জনক রাজা মস্তকে অর্ঘ্য ধারণ ক'রে তাঁর গুরুপুত্র শুকদেবের কাছে এলেন। যথাবিধি সংবর্ধনা ও কুশলজিজ্ঞাসার পর শুকদেবের প্রশ্নের উত্তরে জনক ব্রাহ্মণের কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দিলেন। শুক বললেন, মহারাজ, যার মনে রাগদ্বেষাদি দ্বন্দ্ব নেই এবং শাশ্বত জ্ঞানবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়েছে, তাকেও কি ব্রহ্মচর্য্য গার্হস্থ্য ও বানপ্রস্থ এই তিন আশ্রমে বাস করতে হবে? জনক বললেন, জ্ঞানবিজ্ঞান বিনা মোক্ষ হয় না এবং গুরুর উপদেশ ভিন্ন জ্ঞানলাভও হয় না। যাতে লোকাচার ও কর্মকাণ্ডের উচ্ছেদ না হয় সেজন্যই ব্রহ্মচর্য্যাদি চতুরাশ্রম বিহিত হয়েছে। একে একে চার আশ্রমের ধর্ম পালন ক'রে ক্রমশ শুভাশুভ কর্ম ত্যাগ করলে মোক্ষলাভ হয়। কিন্তু বহু জন্মের সাধনার ফলে যার চিত্তশুদ্ধি হয়েছে তিনি ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমে মোক্ষলাভ করেন, তাঁর অপর তিন আশ্রমের প্রয়োজন হয় না।

তার পর জনক মোক্ষবিষয়ক বহু উপদেশ দিলেন। শুকদেব আত্মজ্ঞান লাভ ক'রে কৃতার্থ হয়ে হিমালয়ের পূর্ব দিকে তাঁর পিতার নিকট উপস্থিত হলেন। ব্যাসদেব সেখানে সুমন্ত বৈশম্পায়ন জৈমিনি ও পৈল এই চার শিষ্যের সঙ্গে শুকদেবকেও বেদাধ্যয়ন করাতে লাগলেন। শিক্ষা সমাপ্ত হ'লে শিষ্যগণ এই বর প্রার্থনা করলেন, ভগবান, আমরা চার জন এবং গুরুপুত্র শুক — এই পাঁচ জন ভিন্ন আর কেউ যেন বেদের প্রতিষ্ঠাতা না হয়। ব্যাসদেব সম্মত হয়ে বললেন, তোমরা উপযুক্ত শিক্ষার্থীকে উপদেশ দিয়ে বেদের বহু প্রচার কর; শিষ্য ব্রতচারী ও পুণ্যাত্মা ভিন্ন অন্য কোনও লোককে, এবং চরিত্র পরীক্ষা না করে বেদশিক্ষা দান করবে না। শিষ্যগণ তুষ্ট হয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন এবং ব্যাসকে প্রণাম করে প্রস্থান করলেন এবং অগ্নিহোত্রাদির মন্ত্র রচনা, যজ্ঞানুষ্ঠান ও অধ্যাপনা ক'রে বিখ্যাত হলেন।

শিষ্যগণ চ'লে গেলে ব্যাসদেব তাঁর পুত্রের সঙ্গে নীরবে ব'সে রইলেন। সেই সময়ে নারদ এসে বললেন, হে বশিষ্ঠবংশীয় মহর্ষি, বেদধ্বনি শুনছি না কেন, তুমি নীরবে ধ্যানস্থ হয়ে রয়েছ কেন? ব্যাস বললেন, শিষ্যগণের বিচ্ছেদে আমার মন নিরানন্দ হয়েছে। নারদ বললেন, বেদের দোষ বেদপাঠ না করা, ব্রাহ্মণের দোষ ব্রত না করা, পৃথিবীর দোষ বাহীক (১) দেশ, স্ত্রীলোকের দোষ কৌতূহল। অতএব তুমি পুত্রের সঙ্গে বেদধ্বনি কর, রাক্ষসভয় দূর হ'ক।

(১) কর্ণপর্ব ১২-পরিচ্ছেদে বাহীকদেশের নিন্দা আছে।

নারদের বাক্যে হৃষ্ট হয়ে ব্যাসদেব তাঁর পুত্রের সঙ্গে উচ্চকণ্ঠে বেদপাঠ করতে লাগলেন। সেই সময়ে প্রবলবেগে বায়ু বইতে লাগল; অনধ্যায়কাল বিবেচনা ক'রে ব্যাস তাঁর পুত্রকে নিবারণ করলেন। শুকদেব তাঁর পিতাকে বললেন, এই বায়ু কোথা থেকে এল? আপনি বায়ুর বিষয় বলুন। ব্যাসদেব তখন সমান উদান ব্যান অপান ও প্রাণ এই পাঁচ বায়ুর ক্রিয়া বিবৃত ক'রে তাদের অন্য পাঁচ নাম বললেন — সংবহ উদ্বহ বিবহ আবহ ও প্রবহ। তিনি আরও দুই বায়ুর নাম বললেন — পরিবহ ও পরাবহ। তার পর তিনি বললেন, এই সকল বায়ুর দ্বারাই মেঘের সঞ্চরণ, বিদ্যুৎপ্রকাশ, সমুদ্র হতে জলশোষণ, মেঘের উৎপত্তি, বারিবর্ষণ, ঝঞ্ঝা প্রভৃতি সাধিত হয়।

বায়ুবেগ শান্ত হ'লে ব্যাসদেব তাঁর পুত্রকে আবার বেদপাঠের অনুমতি দিয়ে গঙ্গায় স্নান করতে গেলেন। শুকদেব নারদকে বললেন, দেবর্ষি, ইহলোকে যা হিতকর আপনি তার সম্বন্ধে উপদেশ দিন। নারদ বললেন, পুরাকালে ভগবান সনৎকুমার এই বাক্য বলেছিলেন —

নাস্তি বিদ্যাসমং চক্ষুর্নাস্তি সত্যসমং তপঃ।
নাস্তি রাগসমং দুঃখং নাস্তি ত্যাগসমং সুখম্॥
নিত্যং ক্রোধাৎ তপো রক্ষেচ্ছ্রিয়ং রক্ষেচ্চ মৎসরাৎ।
বিদ্যাং মানাপমানাত্যামাত্মানং তু প্রমাদতঃ॥
আনৃশংসিং পরো ধর্মঃ ক্ষমা চ পরমং বলম্।
আত্মজ্ঞানং পরং জ্ঞানং ন সত্যাদ্ বিদ্যতে পরম্॥
সত্যস্য বচনং শ্রেয়ঃ সত্যাদপি হিতং বদেৎ।
যদ্ভূতহিতমত্যন্তমেতৎ সত্যং মতো মম॥

— বিদ্যার তুল্য চক্ষু নেই, সত্যের তুল্য তপস্যা নেই, আসক্তির তুল্য দুঃখ নেই, ত্যাগের তুল্য সুখ নেই। ক্রোধ হ'তে তপস্যাকে, পরশ্রীকাতরতা হতে নিজের শ্রীকে, মান-অপমান হ'তে বিদ্যাকে এবং প্রমাদ হ'তে আত্মাকে সর্বদা রক্ষা করবে। আনৃশং্যতাই পরম ধর্ম, ক্ষমাই পরম বল, আত্মজ্ঞানই পরম জ্ঞান; সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কিছুই নেই। সত্যবাক্য শ্রেয়, কিন্তু সত্য অপেক্ষাও হিতবাক্য বলবে; যা প্রাণিগণের অত্যন্ত হিতকর তাই আমার মতে সত্য। —

ন হিংস্যাৎ সর্বভূতানি মৈত্রায়ণগতশ্চরেৎ।
নেদং জন্ম সমাসাদ্য বৈরং কুর্বীত কেনচিৎ॥
মৃতং বা যদি বা নষ্টং যোহতীতমনুশোচতি।
দুঃখেন লভতে দুঃখং দ্বাবন্বর্থী প্রপদ্যতে॥
ভৈষজ্যমেতদ্ দুঃখস্য যদেতন্নানুচিন্তয়েৎ।
চিন্ত্যমানং হি ন ব্যেতি ভূয়শ্চাপি প্রবর্ধতে॥

— কোনও প্রাণীর হিংসা করবে না, সকলের প্রতি মিত্রতুল্য আচরণ করবে; এই মানবজন্ম পেয়ে কারও সঙ্গে শত্রুতা করবে না। যদি কেউ মরে, বা কোনও বস্তু নষ্ট হয়, তবে সেই অতীত বিষয়ের জন্য যে শোক করে সে দুঃখ হতেই দুঃখ পেয়ে দ্বিগুণ অনর্থ ভোগ করে। চিন্তা না করাই দুঃখনিবারণের ঔষধ; চিন্তা করলে দুঃখ কমে না, আরও বেড়ে যায়। —

ব্যাধিতৈরর্থ্যমানাং ত্যজতাং বিপুলং ধনম্।
বেদনাং নাপকর্ষন্তি যতমানাশ্চিকিৎসকাঃ।।
তে চাভিনিপুণা বৈদ্যাঃ কুশলাঃ সম্ভৃতৌষধ্যাঃ।
ব্যাধিভিঃ পরিকৃষ্যন্তে মৃগা ব্যাধৈরিবাদিতাঃ।।
কে বা ভুবি চিকিৎসন্তে রোগার্তান্ মৃগপক্ষিণঃ।
শ্বাপদানি দরিদ্রাংশ্চ প্রায়ো নার্তা ভবন্তি তে।।
ঘোরানপি দুরাধর্ষান্ নৃপতীনুগ্রতেজসঃ।
আক্রম্যাদদতে রোগাঃ পশূন্ পশুগণা ইব।।

— ব্যাধিতে ক্লিষ্ট হয়ে যাদের বিপুল ধন ত্যাগ করতে হয়, চিকিৎসকগণ যত্ন ক’রেও তাদের মনোবেদনা দূর করতে পারেন না। অতিনিপুণ অভিজ্ঞ বৈদ্যগণ, যাঁরা ঔষধ সঞ্চয় ক’রে রাখেন, ব্যাধ কর্তৃক নিপীড়িত মৃগের ন্যায় তাঁরাও ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হন। পৃথিবীতে রোগার্ত মৃগ পক্ষী শ্বাপদ ও দরিদ্র লোককে কে চিকিৎসা করে? এরা প্রায়ই পীড়িত হয় না। পশু যেমন প্রবলতর পশু কর্তৃক আক্রান্ত হয়, অতি দুর্ধর্ষ উগ্রতেজা নৃপতিও সেইরূপ রোগের কবলে পড়েন।

দেবর্ষি নারদ শুকদেবকে এইপ্রকার অনেক উপদেশ দিলেন। শুকদেব ভাবলেন, স্ত্রীপুত্রাদি পালনে বহু ক্লেশ, বিদ্যার্জনেও বহু শ্রম; অল্প আয়াসে কি ক’রে আমি শাশ্বত স্থান লাভ করব যেখান থেকে আর সংসারে ফিরে আসতে হবে না? শুকদেব স্থির করলেন, তিনি যোগবলে দেহ ত্যাগ ক’রে সূর্য্যমণ্ডলে প্রবেশ করবেন। তিনি নারদের অনুমতি নিয়ে ব্যাসদেবের কাছে গেলেন। ব্যাস বললেন, পুত্র, তুমি কিছুক্ষণ এখানে থাক, তোমাকে দেখে আমার চক্ষু তৃপ্ত হ’ক। শুকদেব উদাসীন স্নেহশূন্য ও সংশয়মুক্ত হয়ে পিতাকে ত্যাগ ক’রে কৈলাস পর্বতের উপরে চলে গেলেন। সেখান থেকে তিনি যোগাবলম্বন ক’রে আকাশে উঠে সূর্য্যের অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং বায়ুমণ্ডলের উর্ধ্বে গিয়ে ব্রহ্মত্ব লাভ করলেন।

ব্যাসদেব স্নেহবশত পুত্রের অনুগমন করলেন এবং সরোদনে উচ্চৈঃস্বরে শুক ব’লে ডাকতে লাগলেন। সর্বব্যাপী সর্বাত্মা সর্বতোমুখ শুক স্থাবরজঙ্গম অনুনাদিত ক'রে 'ভোঃ' শব্দে উত্তর দিলেন। তদবধি গিরিশৃঙ্গ প্রভৃতিতে কিছু বললে তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

শুকদেব অন্তর্হিত হ'লে ব্যাসদেব পর্বতশিখরে ব'সে তাঁর পুত্রের বিষয় চিন্তা করতে লাগলেন। সেই সময়ে মন্দাকিনী তীরে যে অপ্সরারা নগ্ন হয়ে ক্রীড়া করছিল তারা ব্যাসকে দেখে ত্রস্ত ও লজ্জিত হ'ল, কেউ জলমধ্যে লীন হয়ে রইল। কেউ গুল্মের অন্তরালে গেল, কেউ পরিধেয় বস্ত্র গ্রহণে ত্বরান্বিত হ'ল। এই দেখে পুত্রের অনাসক্তি এবং নিজের আসক্তি বুঝে ব্যাসদেব প্রীত (১) ও লজ্জিত হলেন। অনন্তর পিনাকপাণি ভগবান শঙ্কর আবির্ভূত হয়ে পুত্রবিরহকাতর ব্যাসদেবকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমার পুত্রের ও তোমার কীর্তি চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে। মহামুনি, তুমি আমার প্রসাদে সর্বদা সর্বত্র নিজ পুত্রের ছায়া দেখতে পাবে।

(১) ব্যাস জানতেন যে অপ্সরারা জিতেন্দ্রিয় নির্বিকার শুকের সমক্ষে লজ্জিত হ'ত না।