অনুশাসনপর্ব: ৫। অষ্টাবক্রের পরীক্ষা
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, পাণিগ্রহণকালে যে 'সহধর্ম' বলা হয় তার উদ্দেশ্য কি? পতিপত্নীর এক সঙ্গে ঋষিপ্রোক্ত যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান, না প্রজাপতিবিহিত সন্তান উৎপাদন, না অসুরধর্ম অনুযায়ী কেবল ইন্দ্রিয়সেবা? ভীষ্ম বললেন, আমি এক প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন। — বদান্য নামক ঋষির কন্যা সুপ্রভার রূপগুণে মুগ্ধ হয়ে অষ্টাবক্র তাঁর পাণি প্রার্থনা করেছিলেন। বদান্য বললেন, আমি তোমাকে কন্যা দান করব, কিন্তু প্রথমে তুমি উত্তর দিকে যাত্রা করবে এবং হিমালয় পর্বত ও কুবেরভবন অতিক্রম ক'রে ভগবান রুদ্রের আবাস দেখে এক রমণীয় বনে উপস্থিত হবে। সেখানে এক বৃদ্ধা তপস্বিনী আছেন; তুমি তাঁর সঙ্গে দেখা ক'রে ফিরে এলে আমার কন্যাকে পাবে।
অষ্টাবক্র উত্তর দিকে যাত্রা করলেন এবং হিমালয় পার হয়ে এক হ্রদের নিকটে এসে রুদ্র ও রুদ্রাণীর পূজা করলেন। তার পর এক দৈব বৎসর (মানুষের ৩৬০ বৎসর) কুবেরের আতিথ্য ভোগ ক'রে কৈলাস মন্দর ও সুমেরু পর্বত অতিক্রম করলেন এবং রমণীয় বনের মধ্যে একটি দিব্য আশ্রমে উপস্থিত হলেন। সেই আশ্রমে কুবেরালয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একটি কাঞ্চনময় ভবন ছিল। অষ্টাবক্র সেই ভবনের দ্বারে এসে বললেন, আমি অতিথি এসেছি। তখন সাতটি রূপবতী মনোহারিণী কন্যা এসে তাঁকে বললে, ভগবান, ভিতরে আসুন। অষ্টাবক্র মুগ্ধ হয়ে ভবনের অভ্যন্তরে গেলেন এবং দেখলেন সেখানে এক বৃদ্ধা রমণী শুভ্র বসন প'রে সর্বাভরণে ভূষিত হয়ে পর্যঙ্কে ব'সে আছেন। পরস্পর অভিবাদনের পর বৃদ্ধা অষ্টাবক্রকে বললেন, আপনি বসুন। অষ্টাবক্র বললেন, এইসকল নারীদের মধ্যে যিনি জ্ঞানবতী ও শান্ত-প্রকৃতি তিনি এখানে থাকুন, আর সকলে নিজ নিজ গৃহে চ'লে যান। কন্যারা অষ্টাবক্রকে প্রদক্ষিণ ক'রে চ'লে গেল, কেবল বৃদ্ধা রইলেন।
অষ্টাবক্র শয্যায় শুয়ে বৃদ্ধাকে বললেন, রাত্রি গভীর হয়েছে, তুমিও শোও। বৃদ্ধা অন্য এক শয্যায় শুলেন, কিন্তু কিছু কাল পরে শীতে কাঁপতে কাঁপতে মহর্ষির শয্যার এসে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন। অষ্টাবক্র কাষ্ঠপ্রাচীরের ন্যায় নির্বিকার হয়ে আছেন দেখে বৃদ্ধা দুঃখিত হয়ে বললেন, বিপ্রর্ষি, প্রফুল্ল হও, আমার মনোরথ পূর্ণ কর। তোমার তপস্যা সফল হয়েছে, তুমি আমার এবং এই সমস্ত ধনের প্রভু। অষ্টাবক্র বললেন, আমি পরদারগমন করি না। আমি বিষয়ভোগে অনভিজ্ঞ, ধর্মপালনের জন্যই সন্তান কামনা করি, পুত্রলাভ হলে আমার সদ্গতি হবে। তুমি ধর্ম স্মরণ কর, অন্যায় উপরোধ ক'রো না; যদি তোমার অন্য প্রার্থনা কিছু থাকে তো বল। বৃদ্ধা বললেন, তুমি এখানে বাস কর, ক্রমশ দেশ কাল বুঝে মতি স্থির করতে পারবে এবং কৃতজ্ঞতা হবে। অষ্টাবক্র সম্মত হয়ে সেখানেই রইলেন, কিন্তু সেই বৃদ্ধার জীর্ণ দেহ দেখে তাঁর কিছুমাত্র অনুরাগ হ'ল না। তিনি ভাবতে লাগলেন, ইনিই কি এই গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, শাপের ফলে বিরূপা হয়েছেন?
পরদিন বৃদ্ধা অষ্টাবক্রের সর্বদেহে তৈল মর্দন ক'রে তাঁকে সযত্নে স্নান করিয়ে দিলেন এবং অমৃততুল্য স্বাদু অন্ন খেতে দিলেন। রাত্রিকালে তাঁরা পূর্বের ন্যায় পৃথক শয্যায় শুলেন এবং অর্ধরাত্রে বৃদ্ধা পুনর্বার মহর্ষির শয্যায় এলেন। মহর্ষি বললেন, পরদারে আমার আসক্তি নেই, তুমি নিজের শয্যায় যাও, তোমার মঙ্গল হ'ক। বৃদ্ধা বললেন, আমি স্বতন্ত্রা, কারও পত্নী নই; যদি অন্য স্ত্রীর সংসর্গে আপত্তি থাকে তবে আমাকে বিবাহ কর। মহর্ষি বললেন, নারীর স্বতন্ত্রতা কোনও কালে নেই; কৌমার্যে পিতা, যৌবনে পতি এবং বার্ধক্যে পুত্র তাকে রক্ষা করে। বৃদ্ধা বললেন, আমি কন্যা, ব্রহ্মচর্য পালন করি, আমাকে বিবাহ কর, প্রত্যাখ্যান ক’রো না।
সহসা বৃদ্ধার রূপান্তর হ’ল, তিনি সর্বাভরণভূষিতা পরমরূপবতী কন্যার আকৃতি ধারণ করলেন। অষ্টাবক্র আশ্চর্য হয়ে ভাবলেন, মহর্ষি বদান্য আমাকে পরীক্ষার জন্য এখানে পাঠিয়েছেন; তাঁর দুহিতাকে ত্যাগ ক’রে কি এই পরমসুন্দরী কন্যাকেই গ্রহণ করব? আমার কামদমনের শক্তি ও ধৈর্য আছে, আমি সত্য থেকে চ্যুত হব না। তিনি সেই কন্যাকে বললেন, তুমি কিজন্য নিজের রূপ পরিবর্তন করলে সত্য বল। কন্যা বললেন, সত্যবিক্রম ব্রাহ্মণ, আমি উত্তর দিকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, মহর্ষি বদান্যের অনুরোধে তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম, তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ। জেনে রাখ যে স্ত্রীজাতি চপলা, স্থবিরা স্ত্রীরও কামজ্বর হয়। দেবতারা তোমার উপর প্রসন্ন হয়েছেন, তুমি নির্বিঘ্নে গৃহে ফিরে যাও এবং বাঞ্ছিতা কন্যাকে বিবাহ ক’রে পুত্রলাভ কর।
তার পর অষ্টাবক্র বদান্যের কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন, বদান্য তুষ্ট হয়ে তাঁর কন্যাকে দান করলেন। অষ্টাবক্র শুভনক্ষত্রযোগে সুপ্রভাকে বিবাহ ক’রে নিজ আশ্রমে সুখে বাস করতে লাগলেন। (১)