অনুশাসনপর্ব: ৪। হরপার্বতীর নিকট কৃষ্ণের বরলাভ
যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি জগৎপতি মহেশ্বর শম্ভুর নামসকল বলুন। ভীষ্ম বললেন, তাঁর নামকীর্তন আমার সাধ্য নয়। এই মহাবাহু কৃষ্ণ বদরিকাশ্রমে তপস্যা ক’রে মহাদেবকে তুষ্ট করেছিলেন, ইনিই তাঁর নাম ও গুণাবলী কীর্তন করুন।
ভীষ্মের অনুরোধ শুনে বাসুদেব বললেন, ব্রহ্মা ইন্দ্রাদি দেবগণ এবং মহর্ষিগণও মহাদেবের সকল তত্ত্ব জানেন না, মানুষ কি ক’রে জানবে? আমি তাঁর কথা কিঞ্চিৎ বলছি শুনুন। অনন্তর কৃষ্ণ জলস্পর্শ করে শুচি হয়ে বলতে লাগলেন। — একদা জাম্ববতী আমাকে বললেন, তুমি পূর্বে মহাদেবের আরাধনা করেছিলে, তার ফলে রুক্মিণীর গর্ভে চারুদেহ সুচারু চারুবেশ যশোধর চারুশ্রবা চারুযশা প্রদ্যুম্ন ও শাম্ব এই আট জন পুত্র জন্মেছে; তাদের তুল্য একটি পুত্র আমাকেও দাও। জাম্ববতীর অনুরোধ শুনে আমি পিতা মাতা, রাজা আহুক (১) ও বলরাম প্রভৃতির অনুমতি নিয়ে গরুড়ের পৃষ্ঠে আরোহণ ক’রে হিমালয় পর্বতে গেলাম। সেখানে মহর্ষি ব্যাঘ্রপাদের পুত্র উপমন্যুর আশ্রমে গিয়ে তাঁকে আমার অভিলাষ জানালে তিনি বললেন, তুমি যাকে চাও সেই ভগবান মহেশ্বর সপত্নীক এখানেই থাকেন। বাল্যকালে আমি ক্ষীরান্ন খেতে চাইলে জননী আমাকে বুঝিয়েছিলেন, বৎস, আমরা বনবাসী তাপস, আমাদের গাভী নেই, ক্ষীরান্ন কোথায় পাব? যদি শঙ্করকে প্রসন্ন করতে পার তবেই তোমার কামনা পূর্ণ হবে। তার পর আমি বহু কাল তপস্যা ক’রে মহাদেবকে তুষ্ট করলাম। তাঁর প্রসাদে আমি অজর অমর সর্বজ্ঞ ও সুদর্শন হয়েছি এবং বন্ধুগণের সহিত অমৃততুল্য ক্ষীরান্ন ভোজন করতে পাচ্ছি। মহাদেব সর্বদা আমার আশ্রমের নিকটে অবস্থান করেন। মাধব, আমি দিব্যনেত্রে দেখছি তুমি ছ মাস পরে তাঁর দর্শন পাবে এবং হরপার্বতীর নিকট চব্বিশটি বর লাভ করবে। . . . তার পর কৃষ্ণ বললেন, মুনিবর উপমন্যুর ইতিহাস শুনে আমি তাঁর কাছে দীক্ষা নিলাম এবং মস্তকমুণ্ডন করে ঘৃতাক্তদেহে দণ্ড-কুশ-চীর-মেখলা ধারণ করে কঠোর তপস্যা করতে লাগলাম। ছ মাস পরে মহাদেব পার্বতীর সহিত আবির্ভূত হলেন। আমি চরণে পতিত হয়ে স্তব করলে মহাদেব প্রসন্ন হলেন এবং আমার প্রার্থনা শুনে আটটি বর দিলেন — ধর্মে দৃঢ়নিষ্ঠা, যুদ্ধে শত্রুনাশের শক্তি, শ্রেষ্ঠ যশ, পরম বল, যোগাসিদ্ধি, লোকপ্রিয়তা, মহাদেবের নৈকট্য, এবং শত শত পুত্র। তার পর জগন্মাতা ভবানীও প্রীত হয়ে আমার প্রার্থনায় আটটি বর দিলেন — দ্বিজগণের প্রতি অক্রোধ, পিতার অনুগ্রহ, শত পুত্র, পরম ভোগ, কুলে প্রীতি, মাতার প্রসাদ, শান্তিলাভ, এবং দক্ষতা। তিনি আমাকে আরও বললেন, তুমি মহাপ্রভাবান্বিত হবে, মিথ্যা বলবে না, তোমার এক হাজার ষোল ভার্যা হবে, তোমার প্রতি তাদের প্রীতি থাকবে, তোমার ধনধান্যাদি অক্ষয় হবে, তুমি বন্ধুদের অতিশয় প্রিয় হবে, তোমার শরীর কমনীয় হবে, এবং তোমার গৃহে প্রত্যহ সাত হাজার অতিথি ভোজন করবে। তার পর আমি উপমন্যুর কাছে ফিরে এসে তাকে বরপ্রাপ্তির সংবাদ দিলাম, তিনি প্রীত হয়ে মহাদেবের মাহাত্ম্য এবং স্থির, স্থাণু, প্রভু, প্রবর, বরদ, বর, সর্বাত্মা প্রভৃতি অষ্টোত্তর শত নাম কীর্তন করলেন। হর-পার্বতীর আরাধনা করেই আমি জাম্ববতীর পুত্র শাম্বকে পেয়েছিলাম।