অনুশাসনপর্ব: ২১। ভীষ্মের স্বর্গারোহণ

যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরে এসে পুরবাসী ও জনপদবাসীদের যথোচিত সম্মান ক'রে গৃহগমনের অনুমতি দিলেন এবং পতিপুত্রহীনা নারীদের প্রচুর অর্থ দিয়ে সান্ত্বনা করলেন। পঞ্চাশ দিন পরে তিনি স্মরণ করলেন যে ভীষ্মের কাছে তাঁর যাবার সময় উপস্থিত হয়েছে। তখন তিনি অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার জন্য ঘৃত মাল্য ক্ষৌমবস্ত্র চন্দন অগুরু প্রভৃতি এবং বিবিধ মহার্ঘ রত্ন পাঠিয়ে দিলেন এবং ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী কুন্তী ও ভ্রাতৃগণকে অগ্রবর্তী ক'রে যাজকগণের সঙ্গে যাত্রা করলেন। কৃষ্ণ বিদুর যুযুৎসু ও সাত্যকি তাঁর অনুসরণ করলেন। তাঁরা কুরুক্ষেত্রে ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হয়ে দেখলেন, ব্যাসদেব নারদ ও অসিতদেবল তাঁর কাছে ব’সে আছেন এবং নানা দেশ হ’তে আগত রাজা ও রক্ষিগণ তাঁকে রক্ষা করছেন।

সকলে অভিবাদন ক’রে যুধিষ্ঠির ভীষ্মকে বললেন, জাহ্ণবীনন্দন, আমি যুধিষ্ঠির, আপনাকে প্রণাম করছি। মহাবাহু, আপনি শুনতে পাচ্ছেন? বলুন এখন আমি আপনার কি করব। আমি অর্পণ নিয়ে যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছি; আচার্য ঋত্বিক ও ব্রাহ্মণগণ, আমার ভ্রাতৃগণ, আপনার পুত্র জনেশ্বর ধৃতরাষ্ট্র, এবং অমাত্যসহ বাসুদেবও এসেছেন। কুরুশ্রেষ্ঠ, আপনি চক্ষু উন্মীলন ক’রে সকলকে দেখুন। আপনার অন্ত্যেষ্টির জন্য যা আবশ্যক সমস্তই আমি আয়োজন করেছি।

ভীষ্ম সকলের দিকে চেয়ে দেখলেন, তার পর যুধিষ্ঠিরের হাত ধ’রে মেঘগম্ভীর স্বরে বললেন, কুন্তীপৌত্র, তুমি উপযুক্ত কালে এসেছ। আমি আটান্ন দিন এই তীক্ষ্ণ শরশয্যায় শুয়ে আছি, বোধ হচ্ছে যেন শত বর্ষ গত হয়েছে। এখন চান্দ্র মাঘ মাসের তিন ভাগ অবশিষ্ট আছে, শুক্লপক্ষ চলছে। তার পর ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, রাজা, তুমি ধর্মজ্ঞ, শাস্ত্রবিৎ বহু ব্রাহ্মণের সেবা করেছ, বেদ ও ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব তুমি জান; তোমার শোক করা উচিত নয়, যা ভবিতব্য তাই ঘটেছে। পাণ্ডুর পুত্রেরা ধর্মত তোমার পুত্রতুল্য, তুমি ধর্মানুসারে এদের পালন কর। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শুদ্ধস্বভাব গুরুবৎসল ও অহিংস ইনি তোমার আজ্ঞানুবর্তী হয়ে চলবেন। তোমার পুত্রেরা দুরাত্মা ক্রোধী মৎসর ঈর্ষান্বিত ও দুর্বৃত্ত ছিল, তাদের জন্য শোক ক’রো না।

অনন্তর ভীষ্ম কৃষ্ণকে বললেন, হে দেবদেবেশ সুরাসুরপ্রনত শঙ্খচক্র-গদাধর ত্রিবিক্রম ভগবান, তোমাকে নমস্কার। তুমি সনাতন পরমাত্মা, আমি তোমার একান্ত ভক্ত; পুরুষোত্তম, তুমি আমাকে ত্রাণ কর, তোমার অনুগত পাণ্ডবগণকে রক্ষা কর। আমি দুর্বুদ্ধি দুর্যোধনকে বলেছিলাম —

যতঃ কৃষ্ণস্ততো ধর্মো যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ।

— যে পক্ষে কৃষ্ণ সেই পক্ষে ধর্ম, যেখানে ধর্ম সেখানে জয়। আমি বার বার তাকে সন্ধি করতে বলেছিলাম, কিন্তু সেই মূঢ় আমার কথা শোনে নি, পৃথিবীস্থ সমস্ত রাজাকে নিহত করিয়ে নিজে নিহত হয়েছে। কৃষ্ণ, এখন আমি কলেবর ত্যাগ করব, তুমি আজ্ঞা কর যেন আমি পরমগতি পাই।

কৃষ্ণ বললেন, ভীষ্ম, আমি আজ্ঞা দিচ্ছি আপনি বসুগণের লোকে যান। রাজর্ষি, আপনি নিষ্পাপ, পিতৃভক্ত, দ্বিতীয় মার্কণ্ডেয় তুল্য; মৃত্যু ভৃত্যের ন্যায় আপনার বশবর্তী হয়ে আছে। তার পর ভীষ্ম সকলকে সম্ভাষণ ও আলিঙ্গন ক’রে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, ব্রাহ্মণগণ — বিশেষত আচার্য ও ঋত্বিগণ, তোমার পূজনীয়।

শান্তনুপুত্র ভীষ্ম সমবেত কুরুগণকে এইরূপ বলে নীরব হলেন, তার পর যথাক্রমে মূলাধারাদিতে তাঁর চিত্ত নিবেশিত করলেন। তাঁর প্রাণবায়ু নিরুদ্ধ হয়ে যেমন ঊর্ধ্বগামী হ'তে লাগল সেই সঙ্গে তাঁর শরীর ক্রমশ ব্যাধিমুক্ত ও ব্যথাহীন হ'ল। তার পর তাঁর প্রাণ ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে মহা উল্কার ন্যায় আকাশে উঠে অন্তর্হিত হ'ল। পুষ্পবৃষ্টি ও দেবদুন্দুভির ধ্বনি হ'তে লাগল, সিদ্ধ ও মহর্ষিগণ সাধু সাধু বলতে লাগলেন। ভীষ্ম এইরূপে স্বর্গারোহণ করলে পাণ্ডবগণ বিদুর ও যুযুৎসু চিতা রচনা করলেন, যুধিষ্ঠির ও বিদুর তাঁকে ক্ষৌম বস্ত্র পরিয়ে দিলেন, যুযুৎসু তাঁর উপরে ছত্র ধারণ করলেন, ভীমার্জুন শ্বেত চামর ব্যজন করতে লাগলেন, নকুল-সহদেব উষ্ণীষ পরিয়ে দিলেন, ধৃতরাষ্ট্র ও যুধিষ্ঠির তাঁর পাদদেশে রইলেন। কৌরবনারীগণ ভীষ্মের আপাদমস্তক তালপত্র (পাখা) দিয়ে ব্যজন করতে লাগলেন। হোম ও সামগানের পর ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি ভীষ্মের দেহ চন্দনকাষ্ঠ অগুরু প্রভৃতি দ্বারা আচ্ছাদিত ক'রে অগ্নিদান করলেন। অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া শেষ হ'লে সকলে ভাগীরথীতীরে গিয়ে যথাবিধি তর্পণ করলেন।

সেই সময়ে দেবী ভাগীরথী জল থেকে উঠে সরোদনে বললেন, কৌরবগণ, আমার পুত্র রাজোচিত গুণসম্পন্ন প্রজ্ঞাবান ও মহাকুলজাত ছিলেন; পরশুরামের নিকট যিনি পরাজিত হন নি, তিনি শিখণ্ডীর দিব্য অস্ত্রে নিহত হয়েছেন। আমার হৃদয় লৌহময়, তাই প্রিয়পুত্রের মরণে বিদীর্ণ হয় নি। ভাগীরথীর এইরূপ বিলাপ শুনে কৃষ্ণ বললেন, দেবী, শোক ত্যাগ কর, তোমার পুত্র পরমলোকে গেছেন। শিখণ্ডী তাঁকে বধ করেন নি, তিনি স্বধর্ম অনুসারে যুদ্ধ ক'রে অর্জুন কর্তৃক নিহত হয়ে ব্রহ্মলোকে গেছেন।