অনুশাসনপর্ব: ২০। ত্রিবিধ প্রমাণ — ভীষ্মোপদেশের সমাপ্তি

যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, প্রত্যক্ষ ও আগম (শ্রুতি) এই দুই প্রমাণের কোন্‌টি শ্রেষ্ঠ? ভীষ্ম বললেন, পণ্ডিতম্মানী হেতুবাাদীরা প্রত্যক্ষ ভিন্ন অন্য প্রমাণ মানে না; তাদের এই সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত। আগমই প্রধান প্রমাণ, কিন্তু অনলস ও অভিনিবিষ্ট না হ'লে তা স্থির করা দুঃসাধ্য। যারা শিষ্টাচারহীন, বেদ ও ধর্মের বিদ্বেষী, তাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাঁরা সাধু, শাস্ত্রচর্চায় যাঁদের বুদ্ধি বিশুদ্ধ হয়েছে, তাঁদের কাছেই সংশয়ভঞ্জনের জন্য যাওয়া উচিত। বেদ, প্রত্যক্ষ ও শিষ্টাচার — এই তিনটিই প্রমাণ। যুধিষ্ঠির বললেন, তবে ধর্মও কি তিন প্রকার? ভীষ্ম বললেন, ধর্ম একই, তার প্রমাণ তিনপ্রকার হতে পারে। তর্কদ্বারা ধর্ম জানতে চেষ্টা ক'রো না, প্রমাণের যে নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে তার দ্বারাই নিজে সংশয় দূর করতে পারবে। অহিংসা সত্য অক্রোধ ও দান — এই চারিটিই সনাতন ধর্ম, তুমি এই ধর্মের অনুষ্ঠান করবে। পিতৃপিতামহের অনুসরণ ক'রে ব্রাহ্মণের সেবা কর, তাঁরাই তোমাকে ধর্মের উপদেশ দেবেন।

ভীষ্ম এইরূপে যুধিষ্ঠিরকে নানাবিষয়ক উপদেশ দিয়ে নীরব হলেন। যে ক্ষত্রবীরগণ তাঁর নিকটে সমবেত হয়েছিলেন তাঁরা ক্ষণকাল চিত্রার্পিতের ন্যায় নিশ্চল হয়ে রইলেন। তার পর মহর্ষি ব্যাস শরশয্যাশায়ী ভীষ্মকে বললেন, গঙ্গানন্দন, কুরুরাজ যুধিষ্ঠির এখন প্রকৃতিস্থ হয়েছেন; তুমি অনুমতি দাও, ইনি তাঁর ভ্রাতৃগণ, কৃষ্ণ ও উপস্থিত রাজগণের সঙ্গে হস্তিনাপুরে ফিরে যাবেন। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে মধুরবাক্যে বললেন, মহারাজ, তুমি এখন অমাত্যগণের সঙ্গে নগরে যাও, তোমার মনস্তাপ দূর হ'ক। তুমি শ্রদ্ধাসহকারে যযাতির ন্যায় বহু যজ্ঞ ক'রে প্রচুর দক্ষিণা দাও, দেবগণ ও পিতৃগণকে তৃপ্ত কর, প্রজাগণের মনোরঞ্জন এবং সুহৃদ্গণের সম্মান কর। পক্ষীরা যেমন ফলবান বৃক্ষ আশ্রয় করে, তোমার সুহৃদ্গণ সেইরূপ তোমাকে আশ্রয় করুন। সূর্যের উত্তরায়ণ আরম্ভ হ'লে আমার মৃত্যুকাল উপস্থিত হবে, তখন তুমি আবার এসো। যুধিষ্ঠির সম্মত হলেন এবং ভীষ্মকে অভিবাদনের পর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে অগ্রবর্তী ক'রে সকলের সঙ্গে হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন।