আশ্বমেধিকপর্ব: ২। মরুত্ত ও সংবর্ত্ত
ব্যাসদেব বললেন, সত্যযুগে মনু দণ্ডধর রাজা ছিলেন, তাঁর প্রপৌত্র ইক্ষ্বাকু। ইক্ষ্বাকুর শত পুত্র হয়েছিল, সকলকেই তিনি রাজপদে অভিষিক্ত করেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র বিংশের পৌত্র খনীনেত্র সকলকে উৎপীড়িত করতেন সেজন্য প্রজারা তাঁকে অপসারিত ক'রে তাঁর পুত্র সুবর্চকে রাজা করেছিল। সুবর্চ পরম ধার্মিক ও প্রজারঞ্জক ছিলেন, কিন্তু কালক্রমে তাঁর কোষ ও অশ্বগজাদি ক্ষয় পাওয়ায় সামন্তরাজগণ তাঁকে নির্যাতিত করতে লাগলেন। তখন তিনি ভরে হস্তে ফুৎকার দিয়ে সৈন্যদল সৃষ্টি ক'রে বিপক্ষ রাজগণকে পরাস্ত করলেন। এই কারণে তিনি করন্ধম (১) নামে খ্যাত হন। ত্রেতাযুগের প্রারম্ভে তাঁর অবীক্ষিত নামে একটি সর্বগুণান্বিত পুত্র হয়েছিল। অবীক্ষিতের পুত্র মহাবলশালী দ্বিতীয় বিষ্ণু স্বরূপ রাজচক্রবর্তী মরুত্ত। ধর্মাত্মা মরুত্ত হিমালয়ের উত্তরপথ মেরু পর্বতে এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছিলেন। তাঁর আজ্ঞায় স্বর্ণকারগণ স্বর্ণময় কুণ্ড পাত্র স্থালী ও আসন এত প্রস্তুত করেছিল যে তার সংখ্যা হয় না।
বৃহস্পতি ও সংবর্ত দুজনেই মহর্ষি অঙ্গিরার পুত্র, কিন্তু তাঁরা পৃথক থাকতেন এবং পরস্পর স্পর্দ্ধা করতেন। বৃহস্পতির উৎপীড়নে সংবর্ত সর্বস্ব ত্যাগ করে দিগম্বর হয়ে বনে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। এই সময়ে অসুরবিজয়ী ইন্দ্র বৃহস্পতিকে নিজের পুরোহিত করলেন। মহর্ষি অঙ্গিরা করন্ধমের কুল-পুরোহিত ছিলেন। করন্ধমের পৌত্র মহারাজ মরুত্তের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ইন্দ্র বৃহস্পতিকে বললেন, আমি ত্রিলোকের অধীশ্বর, আর মরুত্ত কেবল পৃথিবীর রাজা; আপনি আমাদের দুজনের পৌরোহিত্য করতে পাবেন না। বৃহস্পতি বললেন, দেবরাজ, আশ্বস্ত হও, আমি প্রতিজ্ঞা করছি মর্ত্যবাসী মরুত্তের পৌরোহিত্য করব না।
মরুত্ত তাঁর যজ্ঞের আয়োজন করে বৃহস্পতির কাছে এসে বললেন, ভগবান, আপনি পূর্বে আমাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তদনুসারে আমি যজ্ঞের সমস্ত উপকরণ সংগ্রহ করেছি; আমি আপনার যজমান, আপনি আমার যজ্ঞ সম্পাদন করুন। বৃহস্পতি বললেন, মহারাজ, আমি দেবরাজ ইন্দ্রকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে মনুষ্যের যাজন করব না, অতএব তুমি অন্য কাউকেও পৌরোহিত্যে বরণ কর। মরুত্ত লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরে গেলেন এবং পথে দেবর্ষি নারদকে দেখতে পেলেন। নারদ তাঁকে বললেন, মহারাজ, অঙ্গিরার কনিষ্ঠ পুত্র ধর্মাত্মা সংবর্ত দিগম্বর হয়ে উন্মত্তের ন্যায় বিচরণ করছেন, মহেশ্বরের দর্শন কামনায় তিনি এখন বারাণসীতে আছেন। তুমি সেই পুরীর দ্বারদেশে একটি মৃতদেহ রাখ; সংবর্ত সেই মৃতদেহ দেখে যেখানেই যান তুমি তাঁর অনুগমন করবে এবং কোনও নির্জন স্থানে কৃতাঞ্জলি হয়ে তাঁর শরণ নেবে। তিনি জিজ্ঞাসা করলে বলবে — নারদ আপনার সন্ধান বলেছেন। যদি তিনি আমাকে অন্বেষণ করতে চান তবে বলবে যে নারদ অগ্নিপ্রবেশ করেছেন।
নারদের উপদেশ অনুসারে মরুত্ত বারাণসীতে গেলেন এবং পুরীর দ্বারদেশে একটি শব রাখলেন। সেই সময়ে সংবর্ত সেখানে এলেন এবং শব দেখেই ফিরলেন। মরুত্ত কৃতাঞ্জলি হয়ে তাঁর অনুসরণ করে এক নির্জন স্থানে উপস্থিত হলেন। রাজাকে দেখে সংবর্ত তাঁর গাত্রে ধূলি কর্দম শ্লেষ্মা ও নিষ্ঠীবন নিক্ষেপ করতে লাগলেন, তথাপি রাজা নিরস্ত হলেন না। পরিশেষে সংবর্ত বললেন, সত্য বল কে তোমাকে আমার সন্ধান দিয়েছে। মরুত্ত বললেন, আপনি আমার গুরুপুত্র, আমি আপনার পরম ভক্ত; দেবর্ষি নারদ আপনার সন্ধান দিয়েছেন। সংবৰ্ত্ত বললেন, নারদ জানেন যে আমি যাজ্ঞিক; তিনি এখন কোথায়? মরুত্ত বললেন, তিনি অগ্নিপ্রবেশ করেছেন। সংবৰ্ত্ত তুষ্ট হয়ে বললেন, আমি তোমার যজ্ঞ করতে পারি। তার পর তিনি কঠোর বাক্যে ভর্ৎসনা ক'রে বললেন, আমি বায়ুরোগগ্রস্ত বিকৃতবেশধারী অস্থিরমতি; আমাকে দিয়ে যজ্ঞ করাতে চাও কেন? আমার অগ্রজ বৃহস্পতির কাছে যাও, তিনি আমার সমস্ত যজমান দেবতা ও গৃহস্থিত সামগ্রী নিয়েছেন, এখন আমার শরীর ভিন্ন নিজের কিছু নেই। তিনি আমার পূজনীয়, তাঁর অনুমতি বিনা আমি তোমার যজ্ঞ করতে পারব না।
মরুত্ত জানালেন যে বৃহস্পতি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তখন সংবৰ্ত্ত বললেন, আমি তোমার যজ্ঞ সম্পাদন করব, কিন্তু তাতে ইন্দ্র ও বৃহস্পতি তোমার উপর ক্রুদ্ধ হবেন। তুমি প্রতিজ্ঞা কর যে আমাকে পরিত্যাগ করবে না। মরুত্ত শপথ করলে সংবৰ্ত্ত বললেন, হিমালয়ের পৃষ্ঠে মুঞ্জবান নামে একটি পৰ্বত আছে, শূলপাণি মহেশ্বর উমার সহিত সেখানে বিহার করেন; রুদ্র সাধ্য প্রভৃতি গণদেব এবং ভূত পিশাচ গন্ধৰ্ব যক্ষ রাক্ষসাদি তাঁকে উপাসনা করেন। সেই পৰ্বতের চতুপার্শ্বে সূৰ্যরশ্মির ন্যায় দীপ্যমান সুবর্ণের আকর আছে। তুমি সেখানে গিয়ে মহাদেবের শরণাপন্ন হও, তিনি প্রসন্ন হ'লে তুমি সেই সুবর্ণ লাভ করবে।
সংবৰ্ত্তের উপদেশ অনুসারে মরুত্ত মুঞ্জবান পৰ্বতে গেলেন এবং মহাদেবকে তুষ্ট ক'রে সেই সুবর্ণরাশি নিয়ে যজ্ঞের আয়োজন করতে লাগলেন। তাঁর আদেশে শিল্পিগণ বহু সুবর্ণময় আধার নির্মাণ করলে। মরুত্তের সমৃদ্ধির সংবাদ পেয়ে বৃহস্পতি সন্তপ্ত হলেন, তাঁর শরীর কৃশ ও বিবর্ণ হ'তে লাগল। তিনি ইন্দ্রকে বললেন, যে উপায়ে হ'ক সংবৰ্ত্ত ও মরুত্তকে দমন কর। ইন্দ্রের আদেশে বৃহস্পতিকে সঙ্গে নিয়ে অগ্নিদেব যজ্ঞস্থলে এসে মরুত্তকে বললেন, মহারাজ, ইন্দ্র তোমার প্রতি তুষ্ট হয়েছেন, তাঁর আদেশে আমি বৃহস্পতিকে এনেছি, ইনিই যজ্ঞ সম্পাদন করে তোমাকে অমরত্ব দেবেন। মরুত্ত বললেন, সংবৰ্ত্তই আমার যাজন করবেন; আমি কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করছি, বৃহস্পতি দেবরাজের পুরোহিত, আমার ন্যায় মানুষের যাজন করা তাঁর শোভা পায় না। অগ্নি মরুত্তকে প্রলোভিত করবার বহু চেষ্টা করলেন; তখন সংবৰ্ত্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, অগ্নি, তুমি চ'লে যাও, আবার যদি বৃহস্পতিকে নিয়ে এখানে আস তবে তোমাকে ভস্ম করব।
অগ্নি ফিরে এলে ইন্দ্র তাঁর কথা শুনে বললেন, তুমিই তো সকলকে দগ্ধ কর, তোমাকে সংবর্ত কি ক'রে ভস্ম করবেন? তোমার কথা অশ্রদ্ধেয়। তার পর ইন্দ্র গন্ধর্বরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে মরুত্তের কাছে পাঠালেন। ধৃতরাষ্ট্র নিজের পরিচয় দিয়ে মরুত্তকে বললেন, মহারাজ, তুমি যদি বৃহস্পতিকে পুরোহিত না কর তবে ইন্দ্র তোমাকে বজ্রপ্রহার করবেন; ওই শোন, তিনি আকাশে সিংহনাদ করছেন। সংবর্ত মরুত্তকে বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাক, আমি সন্তম্ভনী বিদ্যা দ্বারা তোমার ভয় নিবারণ করব। এই বলে সংবর্ত মন্ত্রপাঠ ক'রে ইন্দ্রাদি দেবগণকে আহ্বান করলেন।
অনন্তর ইন্দ্র প্রভৃতি যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন, মরুত্ত ও সংবর্ত তাঁদের যথোচিত সংবর্ধনা করলেন। মরুত্ত বললেন, দেবরাজ, আপনাকে নমস্কার করছি, আপনার আগমনে আমার জীবন সফল হ'ল। ইন্দ্র বললেন, মহারাজ, তোমার গুরু মহাতেজা সংবর্তকে আমি জানি, এঁর আহ্বানেই আমি ক্রোধ ত্যাগ ক'রে এখানে এসেছি। সংবর্ত বললেন, দেবরাজ, যদি প্রীত হয়ে থাকেন তবে আপনিই এই যজ্ঞের বিধান দিন এবং যজ্ঞভাগ নির্দেশ করুন। তখন ইন্দ্রের আদেশে দেবগণ অতি বিচিত্র ও সমৃদ্ধ যজ্ঞশালা নির্মাণ করলেন; মহাসমারোহে মরুত্তের যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হ'ল। ইন্দ্র বললেন, মরুত্ত, আমরা তোমার পুজায় তুষ্ট হয়েছি; এখন ব্রাহ্মণগণ অগ্নির জন্য লোহিতবর্ণ, বিশ্বদেবগণের জন্য বিবিধবর্ণ, এবং অন্যান্য দেবগণের জন্য উচ্ছিষ্ম (উৎ-শিষ্ম) নীলবর্ণ (কৃষ্ণবর্ণ) পবিত্র বৃষ বধ করুন। যজ্ঞ সমাপ্ত হ'লে মরুত্ত ব্রাহ্মণগণকে রাশি রাশি সুবর্ণ দান করলেন। তার পর তিনি প্রভূত বিত্ত কোষমধ্যে রক্ষা ক'রে গুরুর আদেশে স্বভবনে ফিরে এলেন এবং সসাগরা পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন।
এই ইতিহাস শেষ ক'রে ব্যাস বললেন, যুধিষ্ঠির, তুমি মরুত্তের সঞ্চিত সুবর্ণরাশি নিয়ে এসে যজ্ঞ ক'রে দেবগণকে তৃপ্ত কর।