আশ্বমেধিকপর্ব: ৩। কামগীতা
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, সর্বপ্রকার কুটিলতাই মৃত্যুজনক এবং সরলতাই ব্রহ্মলাভের পন্থা; — জ্ঞাতব্য বিষয় শুধু এই, অন্য আলোচনা প্রলাপ মাত্র। মহারাজ, আপনার কার্য শেষ হয় নি, সকল শত্রুকেও আপনি জয় করেন নি, কারণ নিজের অভ্যন্তরস্থ অহংবুদ্ধি রূপ শত্রুকে আপনি জানতে পারছেন না। বোধ হয় সুখ-দুঃখাদির দ্বারা আকৃষ্ট হওয়াই আপনার স্বভাব। আপনি যেসকল কষ্ট ভোগ করছেন তা স্মরণ না করে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করুন। এই যুদ্ধ একাকী করতে হয়, এতে অস্ত্র অনুচর বা বন্ধুর প্রয়োজন নেই। যদি নিজের মনকে জয় করতে না পারেন তবে আপনার অতি দুরবস্থা হবে। অতএব আপনি শোক ত্যাগ ক'রে পিতৃপিতামহের অনুবর্তী হয়ে রাজ্যশাসন করুন। আমি পূরাবিৎ পণ্ডিত- গণের কথিত কামগীতা বলছি শুনুন—
কামনা বলেছেন, অন্যপন্থ উপায়ে কেউ আমাকে বিনষ্ট করতে পারে না; যে অস্ত্র দ্বারা লোকে আমাকে জয় করতে চেষ্টা করে সেই অস্ত্রই আমার প্রভাবে বিফল হয়। যজ্ঞ দ্বারা যে আমাকে জয় করতে চায় তার মনে আমি জঙ্গমস্থ ব্যক্ত জীবাত্মা রূপে প্রকাশ পাই। বেদ-বেদাঙ্গ সাধন ক'রে যে আমাকে জয় করতে চায় তার মনে স্থাবরস্থ অব্যক্ত জীবাত্মা রূপে আমি অধিষ্ঠান করি। ধৈর্য দ্বারা যে আমাকে পরাস্ত করতে চায় তার মনে আমি ভাব রূপে অবস্থান করি, সে আমার অস্তিত্ব জানতে পারে না। যে তপস্যা করে, তার মনে আমি তপ রূপেই থাকি। যে মোক্ষমার্গ অবলম্বন করে তাকে উদ্দেশ ক'রে আমি হাস্য ও নৃত্য করি। আমি সনাতন এবং সর্বপ্রাণীর অবধ্য।
তার পর কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, আপনি শোক সংবরণ করুন, নিহত বন্ধু- গণকে বার বার স্মরণ ক'রে বৃথা দুঃখভোগ করবেন না; কামনা ত্যাগ ক'রে বিবিধ- দক্ষিণাযুক্ত অশ্বমেধ যজ্ঞ করুন, তার ফলে ইহলোকে কীর্তি এবং পরলোকে উত্তম গতি লাভ করবেন।
কৃষ্ণ ব্যাস দেবস্থান নারদ প্রভৃতির উপদেশ শুনে যুধিষ্ঠিরের মন শান্ত হ'ল। তিনি বললেন, আমি মরুতের সুবর্ণরাশি সংগ্রহ ক'রে অশ্বমেধ যজ্ঞ করব। আপনাদের বাক্যে আমি আশ্বস্ত হয়েছি; ভাগ্যহীন পুরুষ আপনাদের ন্যায় উপদেষ্টা লাভ করতে পারে না।