আশ্বমেধিকপর্ব: ১২। শত্রুদাতা ব্রাহ্মণ — নকুলরূপী ধর্ম্ম

বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বললেন, মহারাজ, সেই মহাযজ্ঞ সমাপ্ত হ'লে এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছিল। মহাদানের ফলে যখন ধর্মরাজের যশ সর্ব দিকে ঘোষিত হ'ল এবং আকাশ থেকে তাঁর উপর পুষ্পবৃষ্টি হ'তে লাগল তখন এক বৃহৎ নকুল যজ্ঞসভায় এল। তার চক্ষু নীল এবং পার্শ্বদেশ (১) স্বর্ণবর্ণ। সে হৃষ্টভাবে বজ্রকণ্ঠে বললে, ওহে নরপতিগণ, কুরুক্ষেত্রবাসী এক উঞ্ছজীবী বদান্য ব্রাহ্মণ যে শক্তুদান করেছিলেন তার সঙ্গে আপনাদের এই যজ্ঞের তুলনা হয় না। নকুলের এই কথা শুনে ব্রাহ্মণরা বললেন, তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? কেন এই যজ্ঞের নিন্দা করছ?

(১) পরে আছে — মস্তক।

নকুল হাস্য ক'রে বললে, দ্বিজগণ, আমি মিথ্যা বলি নি, দর্প ক'রেও বলি নি। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে এক ব্রাহ্মণ কপোতের ন্যায় উঞ্ছবৃত্তি (২) দ্বারা জীবিকানিৰ্বাহ করতেন। একদা দারুণ দুর্ভিক্ষের ফলে তাঁর সঞ্চয় শূন্য হয়ে গেলে তিনি অতি কষ্টে কিঞ্চিৎ যব সংগ্রহ ক'রে তা থেকে শক্তু প্রস্তুত করলেন। জপ আহ্নিক ও হোমের পর ব্রাহ্মণ সপরিবারে ভোজনের উপক্রম করছেন এমন সময়ে এক ক্ষুধার্ত অতিথি ব্রাহ্মণ এসে আহার চাইলেন। গৃহস্থ ব্রাহ্মণ অতিথিকে সাদরে পাদ্য অর্ঘ্য ও আসন দিয়ে নিজের শক্তুর ভাগ নিবেদন করলেন। অতিথি তা খেলেন, কিন্তু তাঁর ক্ষুণ্নিবৃত্তি হ'ল না। তখন ব্রাহ্মণের পত্নী বললেন, তুমি এঁকে আমার ভাগ দাও।

(২) শান্তিপর্ব ২৪-পরিচ্ছেদ পাদটীকা দ্রষ্টব্য।

ব্রাহ্মণ তাঁর ক্ষুধার্ত শ্রান্ত শীর্ণ বৃদ্ধা পত্নীকে বললেন, তোমার ভাগ আমি নিতে পারি না; কীট-পতঙ্গ-মৃগাদিও নিজের স্ত্রীকে পোষণ করে। ধর্ম অর্থ কাম সংসারকার্য সেবা সন্তানপালন সবই ভার্যার সাহায্যে হয়, ভার্যাকে পালন না করলে লোকে নরকে যায়। ব্রাহ্মণ শুনলেন না, নিজের শক্তু অতিথিকে দিলেন। অতিথি তা খেলেন, কিন্তু তথাপি তাঁর তৃপ্তি হ'ল না। তখন ব্রাহ্মণের পুত্র তাঁর অংশ দিতে চাইলেন। ব্রাহ্মণ বললেন, পুত্র, তোমার বয়স যদি সহস্র বৎসরও হয় তথাপি তুমি আমার দৃষ্টিতে বালক, তোমার অংশ আমি অতিথিকে দিতে পারব না। ব্রাহ্মণপুত্র আপত্তি শুনলেন না, নিজ অংশ অতিথিকে দিলেন। তথাপি তাঁর ক্ষুধা দূর হ'ল না। তখন ব্রাহ্মণের সাধ্বী পুত্রবধূ নিজ অংশ দিতে চাইলেন। ব্রাহ্মণ বললেন, কল্যাণী, তোমার দেহ শীর্ণ ও বিবর্ণ, তুমি ক্ষুধার্ত হয়ে আছ, তুমি অনাহারে থাকবে এ আমি কি ক'রে দেখব? পুত্রবধূ শুনলেন না, অগত্যা ব্রাহ্মণ তাঁর অংশও অতিথিকে দিলেন।

তখন অতিথিরূপী ধর্ম বললেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, তোমার শক্তু দান পেয়ে আমি প্রীত হয়েছি; ওই দেখ, আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে, দেব গন্ধর্ব ঋষি প্রভৃতি তোমার দান দেখে বিস্মিত হয়ে স্তব করছেন। ক্ষুধায় প্রজ্ঞা ধৈর্য ও ধর্মজ্ঞান নষ্ট হয়, কিন্তু তুমি ক্ষুধা দমন এবং স্ত্রীপুত্রাদির স্নেহ অতিক্রম ক'রে নিজ কর্ম দ্বারা স্বর্গলোক জয় করেছ। শক্তুদান ক'রে তুমি যে ফল পেয়েছ বহু শত অশ্বমেধেও তা হয় না। দিব্য যান উপস্থিত হয়েছে, তুমি এতে আরোহণ করে পত্নী পুত্র ও পুত্রবধূর সহিত ব্রহ্মলোকে যাও।

অতিথিরূপী ধর্ম এইরূপ বললে ব্রাহ্মণ সপরিবারে স্বর্গে গেলেন। তখন আমি গর্ত থেকে নির্গত হয়ে ভূলুণ্ঠিত হলাম। সিক্ত শক্তুকণার গন্ধে, দিব্য পুষ্পের মর্দনে এবং সেই সাধু ব্রাহ্মণের দান ও তপস্যার প্রভাবে আমার মস্তক কাঞ্চনময় হ'ল। আমার অবশিষ্ট দেহও ঐরূপ হবে এই আকাঙ্ক্ষায় আমি তপোবন ও যজ্ঞস্থলে সর্বদা ভ্রমণ করছি। আমি আশান্বিত হয়ে কুরুরাজের এই যজ্ঞে এসেছি, কিন্তু আমার দেহ কাঞ্চনময় হ'ল না। এই কারণেই আমি হাস্য ক'রে বলেছিলাম যে সেই উঞ্ছজীবী ব্রাহ্মণের শক্তুদানের সঙ্গে আপনাদের এই যজ্ঞের তুলনা হয় না। নকুল এই কথা ব'লে চলে গেল। সে অদৃশ্য হ'লে দ্বিজগণ নিজ নিজ গৃহে প্রস্থান করলেন।

জনমেজয় বললেন, মহর্ষি, আমি মনে করি যজ্ঞের তুল্য পুণ্যফলদায়ক কিছুই নেই; নকুল ইন্দ্রতুল্য রাজা যুধিষ্ঠিরের নিন্দা করলে কেন? বৈশম্পায়ন বললেন, একদা মহর্ষি জমদগ্নি শ্রাদ্ধের জন্য হোমধেনু দোহন ক'রে একটি পবিত্র নূতন ভাণ্ডে দুগ্ধ রেখেছিলেন। সেই সময়ে মহর্ষিকে পরীক্ষা করবার ইচ্ছায় ধর্ম্ম ক্রোধ রূপে সেই ভাণ্ডে প্রবেশ ক’রে দুগ্ধ নষ্ট করলেন। জমদগ্নি ক্রুদ্ধ হলেন না দেখে ধর্ম্ম ব্রাহ্মণরূপে আবির্ভূত হয়ে বললেন, ভৃগুশ্রেষ্ঠ, আমি পরাজিত হয়েছি; ভৃগুবংশীয়গণ অত্যন্ত ক্রোধী এই অপবাদ মিথ্যা। আমি ভীত হয়েছি, আপনি প্রসন্ন হ’ন। জমদগ্নি বললেন, ক্রোধ, তুমি আমার কাছে কোনও অপরাধ কর নি। আমি পিতৃগণের উদ্দেশ্যে এই দুগ্ধ রেখেছিলাম, তুমি তাঁদের প্রসন্ন কর। তখন ক্রোধরূপী ধর্ম্ম পিতৃগণের নিকটে গেলেন এবং তাঁদের শাপে নকুলের রূপ পেলেন। শাপমুক্তির জন্য ধর্ম্ম অনুনয় করলে পিতৃগণ বললেন, তুমি ধর্ম্মের নিন্দা কর, তা হ’লে শাপমুক্ত হবে। নকুল তপোবন ও যজ্ঞস্থানে গিয়ে ধর্ম্মের নিন্দা করতে লাগল। যুধিষ্ঠির সাক্ষাৎ ধর্ম্ম স্বরূপ, সেজন্য তাঁর যজ্ঞের নিন্দা করে নকুল পাপমুক্ত হয়েছিল।