আশ্বমেধিকপর্ব: ১১। অশ্বমেধ যজ্ঞ
মাঘ মাসের দ্বাদশী তিথিতে শুভনক্ষত্রযোগে যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের ডেকে এনে ভীমসেনকে বললেন, সংবাদ পেয়েছি অর্জুন শীঘ্রই ফিরে আসবেন। তুমি যজ্ঞস্থান নিরূপণের জন্য বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের পাঠাও। যুধিষ্ঠিরের আদেশ অনুসারে স্থান নিরূপিত হলে স্থপতিগণ শত শত প্রাসাদ গৃহ স্তম্ভ তোরণ ও পথ সমন্বিত যজ্ঞায়তন নির্মাণ করলেন। আমন্ত্রিত নরপতিগণ বহু রত্ন স্ত্রী অশ্ব ও আয়ুধ নিয়ে উপস্থিত হলেন, তাঁদের শিবিরে সাগরগর্জনের ন্যায় কোলাহল হ'তে লাগল। যজ্ঞসভায় হেতুবাদী বাগ্মী ব্রাহ্মণগণ পরস্পরকে পরাস্ত করবার জন্য তর্ক করতে লাগলেন। আমন্ত্রিত রাজারা ইচ্ছানুসারে বিচরণ ক’রে যজ্ঞের আয়োজন দেখতে লাগলেন। স্থানে স্থানে স্বর্ণভূষিত যূপকাষ্ঠ, স্থলচর জলচর পার্বত ও আরণ্য বিবিধ পশু পক্ষী ও উদ্ভিদ, অন্নের স্তূপ, দধি ও ঘৃতের হ্রদ প্রভৃতি দেখে তাঁরা বিস্মিত হলেন। এক এক লক্ষ ব্রাহ্মণভোজনের পর দুন্দুভি বাজতে লাগল; প্রতিদিন এইরূপে বহু বার দুন্দুভিধ্বনি শোনা গেল।
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, দ্বারকাবাসী একজন দূত দ্বারা অর্জুন আমাকে এই কথা ব’লে পাঠিয়েছেন। — কৃষ্ণ, তুমি রাজা যুধিষ্ঠিরকে ব’লো যেন সমাগত রাজগণের সমুচিত সৎকার হয়, এবং অর্ঘ্যদানকালে এমন কিছু না করা হয় যাতে রাজাদের বিদ্বেষের ফলে প্রজানাশ হ’তে পারে (১)। যুধিষ্ঠির বললেন, কৃষ্ণ, তোমার কথা শুনে আমি আনন্দিত হয়েছি। আমি শুনেছি অর্জুন যেখানে গেছেন সেখানেই রাজাদের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়েছে। তিনি সর্বদাই দুঃখভোগ করেন, কিন্তু আমি তাঁর দেহে কোনও অনিষ্টসূচক লক্ষণ দেখি না। কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, পুরুষসিংহ ধনঞ্জয়ের পিণ্ডিকা (পায়ের গুলি) অধিক স্থূল; এই লক্ষণের ফলে তাঁকে সর্বদা ভ্রমণ করতে হয়; এ ভিন্ন তাঁর দেহে অশুভসূচক আর কিছু আমি দেখি না। যুধিষ্ঠির বললেন, তোমার কথা ঠিক। দ্রৌপদী কৃষ্ণের দিকে অসূয়াসূচক (২) বক্র দৃষ্টিপাত করলেন, কৃষ্ণও সস্মেহে তাঁর সখীর দিকে ফিরে চাইলেন। ভীমসেন প্রভৃতি সকৌতুকে অর্জুনের ওই কথা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।
পরদিন অর্জুন যজ্ঞাশ্বসহ হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন এবং ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠির প্রভৃতিকে অভিবাদন ক’রে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন। এই সময়ে মণিপুররাজ বভ্রুবাহনও তাঁর মাতৃদ্বয়ের সহিত উপস্থিত হলেন এবং গুরুজনকে বন্দনার পর পিতামহী কুন্তীর উত্তম ভবনে গেলেন। চিত্রাঙ্গদা ও উলূপী বিনীতভাবে কুন্তী দ্রৌপদী সুভদ্রা প্রভৃতির সহিত মিলিত হলেন। বভ্রুবাহনকে কৃষ্ণ দিব্যাভরণ স্বর্ণভূষিত মহামূল্য রথ উপহার দিলেন; যুধিষ্ঠিরাদিও তাঁকে বিপুল অর্থ দিলেন।
তৃতীয় দিবসে ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে বললেন, যজ্ঞের মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে, আজ থেকে তুমি যজ্ঞ আরম্ভ কর। মহারাজ, এই যজ্ঞে তুমি ব্রাহ্মণগণকে তিন গুণ দক্ষিণা দাও, তাতে তিন অশ্বমেধের ফল পাবে এবং জ্ঞাতিবধের পাপ থেকে মুক্ত হবে। অনন্তর বেদজ্ঞ যাজকগণ যথাবিধি সকল কার্য করতে লাগলেন। বিল্ব খদির পলাশ এই তিন প্রকার কাষ্ঠের প্রত্যেকের ছয়, দেবদারুর দুই, এবং শ্লেষ্মাতক (১) কাষ্ঠের একটি যূপ নির্মিত হল। তা ছাড়া ধর্মরাজের আদেশে ভীম স্বর্ণভূষিত বহু যূপ শোভার জন্য প্রস্তুত করালেন। চারটি অগ্নিসস্থান যুক্ত আঠার হাত যজ্ঞবেদী ত্রিকোণ গরুড়াকারে নির্মিত হ'ল। ঋত্বিক্গণ নানা দেবতার উদ্দেশে বহু পশু পক্ষী বন্য ও জলচর আহরণ করলেন। তিন শত পশুর সঙ্গে যজ্ঞীয় অশ্বও যূপবদ্ধ হ'ল।
অগ্নিতে অন্যান্য পশু যথাবিধি উৎসর্গের পর ব্রাহ্মণগণ শাস্ত্রানুসারে যজ্ঞীয় অশ্ব বধ ক'রে দ্রুপদনন্দিনীকে তার নিকট বসালেন। তার পর তাঁরা অশ্বের বসা অগ্নিতে দিলেন, যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতারা সেই সর্বপাপনাশক বসার ধূম আঘ্রাণ করলেন। ষোল জন ঋত্বিক অশ্বের অঙ্গসকল অগ্নিতে আহুতি দিলেন। এইরূপে যজ্ঞ সমাপ্ত হ'লে সশিষ্য ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরের সংবর্ধনা করলেন। যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণগণকে সহস্র কোটি নিষ্ক এবং ব্যাসদেবকে বসুন্ধরা দক্ষিণা দিলেন। ব্যাস বললেন, মহারাজ, ব্রাহ্মণরা ধনার্থী, তুমি বসুন্ধরার পরিবর্তে আমাকে ধন দাও। যুধিষ্ঠির বললেন, অশ্বমেধ মহাযজ্ঞে পৃথিবী-দক্ষিণাই বিহিত; অর্জুন যা জয় করেছেন সেই পৃথিবী আমি দান করেছি, আপনারা তা ভাগ ক'রে নিন। এই পৃথিবী এখন ব্রহ্মস্ব, আমি আর তা নিতে পারি না, আমি বনপ্রবেশ করব।
দ্রৌপদী ও ভীমাদি বললেন, মহারাজ যথার্থ বলেছেন। তখন সভাস্থ সকলে রোমাঞ্চিত হলেন, অন্তরীক্ষ থেকে সাধু সাধু ধ্বনি শোনা গেল, ব্রাহ্মণগণ হৃষ্ট হয়ে প্রশংসা করতে লাগলেন। ব্যাসদেব পুনর্বার বললেন, মহারাজ, আমি তোমাকে পৃথিবী প্রত্যর্পণ করছি, তুমি তার পরিবর্তে সুবর্ণ দাও। কৃষ্ণ বললেন, ধর্মরাজ, আপনি ভগবান ব্যাসের আদেশ পালন করুন। তখন যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতারা ত্রিগুণ দক্ষিণার কোটি কোটি গুণ দান করলেন, ব্যাস তা চার ভাগ ক'রে ঋত্বিকদের মধ্যে বিতরণ করলেন। যজ্ঞায়তনে যে সমস্ত স্বর্ণময় অলঙ্কার তোরণ যূপ ঘট স্থালী ইষ্টক প্রভৃতি ছিল, যুধিষ্ঠিরের আদেশে ব্রাহ্মণগণ ভাগ ক'রে নিলেন। অবশিষ্ট দ্রব্য ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র ও ম্লেচ্ছগণকে দেওয়া হ'ল।
যজ্ঞ সমাপ্ত হ'লে ব্রাহ্মণরা প্রচুর ধন নিয়ে চ'লে গেলেন। ব্যাসদেব তাঁর অংশ কুন্তীকে দিলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের সহিত যজ্ঞান্তস্নান ক'রে সমাগত রাজগণকে বহু রত্ন হস্তী অশ্ব স্ত্রী বস্ত্র ও সুবর্ণ উপহার দিলেন এবং বভ্রুবাহনকেও বিপুল ধন দিলেন। রাজারা বিদায় নিয়ে চ'লে গেলেন। দুঃশলার বালক পৌত্রকে যুধিষ্ঠির সিন্ধুরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। কৃষ্ণ বলরাম প্রভৃতি বৃষ্ণিবংশীয় বীরগণ যথোচিত সৎকার লাভ ক'রে ধর্মরাজের আজ্ঞা নিয়ে দ্বারকায় প্রস্থান করলেন।