আশ্রমবাসিকপর্ব: ২। ভীমের আক্রোশ — ধৃতরাষ্ট্রের সংকল্প

এইরূপে পনর বৎসর কেটে গেল। ভীম অপ্রকাশ্যভাবে ধৃতরাষ্ট্রের অপ্রিয় কার্য করতেন এবং অনুচর দ্বারা তাঁর আজ্ঞা লঙ্ঘন করাতেন। একদিন ভীম তাঁর বন্ধুদের কাছে তাল ঠুকে বললেন, আমার এই চন্দনচর্চিত পরিঘতুল্য বাহুর প্রতাপেই মূঢ় দুৰ্য্যোধনাদি পুত্র ও বান্ধব সহ নিহত হয়েছে। এই নিষ্ঠুর বাক্য শুনতে পেয়ে ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত ব্যথিত হলেন, বুদ্ধিমতী গান্ধারী কালধর্ম বুঝে নীরবে রইলেন। যুধিষ্ঠির অর্জুন নকুল সহদেব কুন্তী ও দ্রৌপদী এ বিষয়ে কিছুই জানতে পারেন নি। ধৃতরাষ্ট্র বাষ্পাকুলকণ্ঠে তাঁর সুহৃদগণকে বললেন, আমার দুর্বুদ্ধির ফলেই কুরুকুল ক্ষয় পেয়েছে। পুত্রস্নেহের বশে আমি ব্যাসদেব কৃষ্ণ ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ বিদুর সঞ্জয় ও গান্ধারীর উপদেশ শুনি নি, পাণ্ডবগণকে তাদের পিতৃরাজ্য ফিরিয়ে দিই নি। এই অপরাধ সহস্র শল্যের ন্যায় আমার হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে আছে। এখন আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য আমি দিনের চতুর্থ ভাগে বা অষ্টম ভাগে যৎকিঞ্চিৎ আহার করি, গান্ধারী ভিন্ন আর কেউ তা জানেন না। আমি ও গান্ধারী মৃগচর্ম্ম পরে কুশশয্যায় শুয়ে নিত্য জপ করি। যুধিষ্ঠির শুনলে অনুতপ্ত হবেন সেজন্য এ কথা আমি কাকেও জানাই নি।

তার পর ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, বৎস, তোমার আশ্রয়ে প্রতিপালিত হয়ে আমি সুখে আছি, দান ও শ্রাদ্ধকর্ম্মাদি ক’রে পুণ্যসঞ্চয়ও করেছি; পুত্রহীনা গান্ধারীও আমাকে দেখে ধৈর্যধারণ করেছেন। যে নৃশংসগণ দ্রৌপদীর অপমান ও তোমাদের অস্বহরণ করেছিল তারা স্বধর্ম্মানুসারে যুদ্ধে হত হয়ে স্বর্গে গেছে। এখন আমার ও গান্ধারীর পক্ষে যা শ্রেয় তাই আমার করা উচিত। তুমি ধর্ম্মনিষ্ঠ এবং ধন্য তোমাকে বলছি, গান্ধারী ও আমাকে বনগমনের অনুমতি দাও। বৃদ্ধ বয়সে পুত্রদের রাজ্য দিয়ে বনে বাস করাই আমাদের কুলোচিত ধর্ম। আমি গান্ধারীর সঙ্গে বনবাসী হয়ে তোমাকে আশীর্বাদ করব, চীরবল্কল ধারণ করে বনবাসী হয়ে তপস্যা করব। সেই তপস্যার ফল তুমিও পাবে, কারণ, রাজার অধিকারে প্রজাসমূহ যে কৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হয় রাজাও তার ফলভোগী হন।

যুধিষ্ঠির বললেন, কুরুরাজ, আপনি দুঃখভোগ করলে এই রাজ্য আমার প্রীতিকর হবে না। আমাকে ধিক, আমি অতি দুর্বুদ্ধি রাজাসক্ত ও প্রমাদগ্রস্ত। আপনি অসদৃশ হ’লে আমার রাজভোগে কি প্রয়োজন? আপনি আমাদের পিতা ও পরম গুরু, আপনি চ’লে গেলে আমরা কোথায় থাকব? আপনার ঔরসপুত্ৰ যদুবংস বা আপনার মনোনীত অন্য কেউ এই রাজ্য গ্রহণ করুন, আমিই বনে যাব। অথবা আপনি স্বয়ং রাজ্যশাসন করুন, অযশ দ্বারা আমাকে দগ্ধ করবেন না। আমি রাজা নই, আপনিই রাজা। দুর্যোধনাদির কার্যের জন্য আমার মনে কিছুমাত্র ক্রোধ নেই, দৈববশেই আমরা সকলে মোহগ্রস্ত হয়েছিলাম। আমরাও আপনার পুত্র, গান্ধারী ও কুন্তীকে সমান জ্ঞান করি। আমি নতশিরে প্রার্থনা করছি, আপনি মনের দুঃখ দূর করুন।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, বৎস, আমি বনে গিয়ে তপস্যা করতে ইচ্ছা করি। তুমি আমার যথোচিত সেবা করেছ, এখন বনগমনের অনুমতি দাও। ধৃতরাষ্ট্র সহসা কাঁপিতেছেন কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, বার্ধক্য ও অধিক কথা বলার ফলে আমার মন অবসন্ন ও মুখ শুষ্ক হতেছে, আমি সঞ্জয় আর কৃপাচার্যকে বলছি, এঁরা আমার হয়ে ধর্মরাজকে অনুনয় করুন। এই ব’লে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর দেহে ভর দিয়ে সংজ্ঞাহীন হলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন, হায়, যিনি শত সহস্র হস্তীর ন্যায় বলশালী, যিনি লৌহভীম চূর্ণ করেছিলেন, তিনি এখন অচেতন হয়ে অবলা স্ত্রীকে অবলম্বন করলেন। এইরূপ বিলাপ ক’রে যুধিষ্ঠির জলার্দ্র হস্ত দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের মুখ ও বক্ষ মুছিয়ে দিলেন। সংজ্ঞালাভ ক’রে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, বৎস, আমাকে আলিঙ্গন কর, তোমার স্পর্শে আমি পুনর্জীবিত হয়েছি। আজ আমি দিবসের অষ্টম ভাগে আহার করব এই স্থির করেছিলাম, এখন তার সময় হয়েছে; দুর্বলতার ফলে আমার চেতনা লুপ্ত হয়েছিল। বার বার কথা বললে আমার ক্লান্তি হয়; তুমি আর কষ্ট দিও না, আমাকে বনগমনের অনুমতি দাও।

যুধিষ্ঠির বললেন, কুরুরাজ, আপনাকে প্রীত করার জন্য আমি রাজ্য বা জীবনও ত্যাগ করতে পারি। আপনি এখন আহার করুন, বনগমনের কথা পরে হবে।