আশ্রমবাসিকপর্ব: ৬। ধৃতরাষ্ট্র-সকাশে যুধিষ্ঠিরাদি
ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি বনে গেলে পুরবাসিগণ শোকার্ত হয়ে বলতে লাগলেন, পুত্রহীন বৃদ্ধ কুরুরাজ এবং মহাভাগা গান্ধারী ও কুন্তী নির্জন বনে কি ক’রে বাস করছেন? পুত্রগণ ও রাজশ্রী ত্যাগ ক’রে কুন্তী কেন দুষ্কর তপস্যা করতে গেলেন?
কুন্তীর বিরহে পাণ্ডবগণ কাতর হয়ে কালযাপন করতে লাগলেন, কোনও বিষয়ে তাঁরা মন দিতে পারলেন না। কয়েক দিন পরে তাঁরা স্থির করলেন যে বনে গিয়ে সকলকে দেখে আসবেন, দ্রৌপদীও গমনের জন্য উৎসুক হলেন। যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞায় রথ হস্তী অশ্ব ও সৈন্য সজ্জিত হ’ল, বহু পুরবাসী তাঁর সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হ’ল। পাঁচ দিন নগরের বহির্ভাগে বাস ক’রে ষষ্ঠ দিনে যুধিষ্ঠির সদলে যাত্রা করলেন। কৃপাচার্য সৈন্যদলের নেতা হয়ে চললেন; যুধিষ্ঠির ও অর্জুন রথে, ভীম হস্তীতে, নকুল-সহদেব অশ্বে, এবং দ্রৌপদী প্রভৃতি নারীগণ শিবিকায় যাত্রা করলেন। নগর ও গ্রামবাসী প্রজাগণ বিবিধ যানে যুধিষ্ঠিরের অনুগমন করলেন। যযুৎসু ও ধৌম্য পুররক্ষার জন্য হস্তিনাপুরে রইলেন।
পাণ্ডবগণ যমুনা পার হয়ে কুরুক্ষেত্রে এসে শতযূপ ও ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রম দেখতে পেলেন এবং যান থেকে নেমে বিনীতভাবে পদব্রজে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। যুধিষ্ঠির সজলনয়নে তাপসগণকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের জ্যেষ্ঠতাত কুরুবংশপতি কোথায়? তাঁরা বললেন, মহারাজ, তিনি পুষ্প ও জল আনতে এবং যমুনায় স্নান করতে গেছেন। পাণ্ডবগণ সত্বর যমুনার দিকে চললেন এবং কিছুদূর গিয়ে দেখলেন, গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রকে নিয়ে কুন্তী আগে আগে আসছেন। সহদেব উচ্চৈঃস্বরে রোদন ক’রে কুন্তীর পায়ে পড়লেন। তার পর পাণ্ডবগণ ধৃতরাষ্ট্রাদিকে প্রণাম ক’রে তাঁদের জলপূর্ণ কলস বয়ে নিয়ে আশ্রমের দিকে চললেন।
নানা স্থান থেকে তাপসগণ পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী প্রভৃতিকে দেখতে এলেন। সঞ্জয় এইপ্রকারে তাঁদের পরিচয় দিলেন। — যাঁর দেহ বিশুদ্ধ স্বর্ণের ন্যায় গৌরবর্ণ, মহাসিংহের ন্যায় সবল, যাঁর নাসিকা উন্নত এবং চক্ষু দীর্ঘ ও তাম্রবর্ণ, ইনি কুরুরাজ যুধিষ্ঠির। এই মত্তগজেন্দ্রগামী তপ্তকাঞ্চনবর্ণ দীর্ঘবাহু স্থূলস্কন্ধ পুরুষ বৃকোদর। এঁর পার্শ্বে যে মহাধনুর্ধর শ্যামবর্ণ আয়তলোচন হস্তিযূথপতুল্য যুবা রয়েছেন, ইনি অর্জুন। কুন্তীর নিকটে বিষ্ণু ও মহেন্দ্রের ন্যায় অনুপম রূপবান ও বলবান যে দুজন রয়েছেন, এঁরা নকুল-সহদেব। এই নীলোৎপলবর্ণা মধ্যবয়স্কা পদ্মপলাশাক্ষী মূর্তিমতী লক্ষ্মীর ন্যায় নারী কৃষ্ণা। এঁর পার্শ্বে যে কনকবর্ণা চন্দ্রপ্রভার ন্যায় রূপবতী রমণী রয়েছেন ইনি চক্রপাণি কৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রা; এই সুবর্ণগৌরাঙ্গী নাগকন্যা উলূপী, এবং আর্দ্র মধুক পুষ্পের ন্যায় যাঁর কান্তি, ইনি রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা; এঁরা অর্জুনের ভার্যা। যিনি কৃষ্ণের সহিত স্পর্ধা করতেন সেই রাজসেনাপতি শল্যের ভগিনী এই নীলোৎপলবর্ণা রমণী ভীমসেনের পত্নী (কালী)। এই চম্পকগৌরী জরাসন্ধকন্যা সহদেবের পত্নী। এঁর নিকটে যে ইন্দীবরশ্যামবর্ণা রমণী ভূমিতে ব’সে আছেন, ইনি নকুলের পত্নী (ধৃষ্টকেতুর ভগিনী করেণুমতী)। এই প্রতপ্তকাঞ্চনবর্ণা সুন্দরী যিনি পুত্রকে কোলে নিয়ে আছেন, ইনি বিরাটকন্যা উত্তরা; দ্রোণ প্রভৃতি এঁর পতি অভিমন্যুকে রথহীন অবস্থায় বধ করেছিলেন। এই এক শত নারী, যাঁরা শুক্ল উত্তরীয় ধারণ ক’রে আছেন, যাঁদের সীমন্তে অলঙ্কার নেই, এঁরা ধৃতরাষ্ট্রের অনাথা পুত্রবধূ।