মৌষলপর্ব: ৪। অর্জ্জুনের দ্বারকায় গমন ও প্রত্যাবর্ত্তন

দারুক হস্তিনাপুরে গিয়ে দ্বারকার ঘটনাবলী জানালেন। ভোজ অন্ধক কুকুর ও বৃষ্ণি বংশীয় বীরগণের নিধন শুনে পাণ্ডবগণ শোকাকুল হলেন। যদুকুল ধ্বংস হয়েছে এই আশঙ্কায় অর্জ্জুন তাঁর মাতুল বসুদেবকে দেখবার জন্য তখনই যাত্রা করলেন। দ্বারকায় উপস্থিত হয়ে তিনি দেখলেন সেই নগরী পতিহীনা রমণীর ন্যায় শ্রীহীন হয়েছে। কৃষ্ণসখা অর্জ্জুনকে দেখে কৃষ্ণের ষোল হাজার স্ত্রী উচ্চকণ্ঠে রোদন করতে লাগলেন। অর্জ্জুনের চক্ষু বাষ্পাকুল হ’ল, তিনি সেই পতিপ্রহীণা নারীদের দিকে চাইতে পারলেন না, সশব্দে রোদন ক’রে ভূপতিত হলেন। রুক্মিণী সত্যভামা প্রভৃতি তাঁকে উঠিয়ে স্বর্ণময় পীঠে বসালেন এবং তাঁকে বেষ্টন ক’রে বিলাপ করতে লাগলেন।

অনন্তর অর্জুন বসুদেবের কাছে এসে দেখলেন, তিনি পুত্রশোকে সন্তপ্ত হয়ে শুয়ে আছেন। বসুদেব বললেন, অর্জুন, আমার মৃত্যু নেই; যাঁরা শত শত নৃপতি ও দৈত্যগণকে জয় করেছিলেন, সেই পুত্রদের না দেখেও আমি জীবিত আছি। যে দুজন তোমার প্রিয় শিষ্য ছিল, যারা অতিরণ ব’লে খ্যাত এবং কৃষ্ণের প্রিয়তম ছিল, সেই প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিই বৃষ্ণিবংশনাশের মূল কারণ। অথবা আমি তাদের দোষ দিতে পারি না, ঋষিশাপেই আমাদের বংশ বিনষ্ট হয়েছে। তুমি ও নারদাদি মুনিগণ যাঁকে সনাতন বিষ্ণু ব’লে জানতে, আমার পুত্র সেই গোবিন্দ যদুবংশের এই বিনাশ উপেক্ষা করেছেন, তিনি জ্ঞাতিদের রক্ষা করতে ইচ্ছা করেন নি। কৃষ্ণ আমাকে ব’লে গেছেন — ‘আমি আর অর্জুন একই, অর্জুন দ্বারকায় এসে স্ত্রী ও বালকগণের রক্ষার ভার নেবেন এবং মৃতজনদের ঔর্ধ্বদেহিক ক্রিয়া করবেন; তিনি প্রস্থান করলেই দ্বারকা সমুদ্রজলে প্লাবিত হবে; আমি বলদেবের সঙ্গে কোনও নির্জন স্থানে যোগস্থ হয়ে অন্তকালের প্রতীক্ষা করব।’

তার পর বসুদেব বললেন, পার্থ, আমি আহার ত্যাগ করেছি, জীবনধারণে আমার ইচ্ছা নেই। কৃষ্ণের বাক্য অনুসারে এই রাজ্য, নারীগণ ও ধনরত্ন তোমাকে সমর্পণ করছি। অর্জুন বললেন, মাতুল, কৃষ্ণ ও বান্ধববিহীন এই পৃথিবী আমি দেখতে ইচ্ছা করি না। আমার ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীর মনের অবস্থাও অনুরূপ, কারণ আমরা ছয় জন একাত্মা। রাজা যুধিষ্ঠিরেরও প্রয়াণকাল উপস্থিত হয়েছে, অতএব আমি স্ত্রী বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে সত্বর ইন্দ্রপ্রস্থে যাব।

পরদিন প্রভাতকালে বসুদেব যোগস্থ হয়ে স্বর্গলাভ করলেন। দেবকী ভদ্রা মদিরা ও রোহিণী পতির চিতায় আরোহণ ক’রে তাঁর সহগামিনী হলেন। অর্জুন সকলের অন্তিম কার্য সম্পন্ন করলেন এবং বলরাম ও কৃষ্ণের দেহ অন্বেষণ ক’রে এনে সংস্কার করলেন। সপ্তম দিনে তিনি কৃষ্ণের ষোল হাজার পত্নী, পৌত্র বজ্র (১), এবং অসংখ্য নারী বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে যাত্রা করলেন। রথী গজারোহী ও অশ্বারোহী অনুচরগণ এবং ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি প্রজা তাঁদের সঙ্গে গেলেন। অর্জুন দ্বারকার যে যে স্থান অতিক্রম করতে লাগলেন তৎক্ষণাৎ সেই সেই স্থান সমুদ্রজলে প্লাবিত হ’ল।

(১) ভাগবতে আছে, ইনি কৃষ্ণের প্রপৌত্র, প্রদ্যুম্নের পৌত্র, অনিরুদ্ধের পুত্র।

কিছু দিন পরে তাঁরা গবাদি পশু ও ধান্য সম্পন্ন পঞ্চনদ প্রদেশের এক স্থানে এলেন। সেখানকার আভীর দস্যুগণ যাদবনারীদের দেখে লুব্ধ হয়ে যষ্টি নিয়ে আক্রমণ করলে। অর্জুন ঈষৎ হাস্য ক’রে তাদের বললেন, যদি বাঁচতে চাও তো দূর হও, নতুবা আমার শরে বিদ্ধ হয়ে সকলে মরবে। দস্যুগণ নিবৃত্ত হ'ল না দেখে অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব নিলেন এবং অতি কষ্টে জ্যারোপণ করলেন, কিন্তু কোনও দিব্যাস্ত্র স্মরণ করতে পারলেন না। তিনি এবং সহগামী যোদ্ধারা বাধা দেবার চেষ্টা করলেও দস্যুরা নারীদের হরণ করতে লাগল, কোনও কোনও নারী স্বেচ্ছায় তাদের কাছে গেল। অর্জুনের বাণ নিঃশেষ হ'লে তিনি ধনুর অগ্রভাগ দিয়ে প্রহার করতে লাগলেন, কিন্তু সেই ম্লেচ্ছ দস্যুগণ তাঁর সমক্ষেই বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় সুন্দরীদের হরণ ক'রে নিয়ে গেল। অর্জুন তাঁর দূরদৃষ্ট দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন এবং অবশিষ্ট নারীদের নিয়ে কুরুক্ষেত্রে এলেন।

কৃতবর্মার পুত্র এবং ভোজ নারীগণকে মার্ত্তিকাবত নগরে এবং সাত্যকির পুত্রকে সরস্বতী নদীর নিকটস্থ প্রদেশে রেখে অর্জুন অবশিষ্ট বালক বৃদ্ধ ও রমণীগণকে ইন্দ্রপ্রস্থে আনলেন। কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রকে তিনি ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্য দিলেন। অক্রুরের পত্নীরা প্রব্রজ্যা নিলেন। কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী গান্ধারী শৈব্যা হৈমবতী ও জাম্ববতী অগ্নিপ্রবেশ করলেন। সত্যভামা ও কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ হিমালয় অতিক্রম ক'রে কলাপ গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন। দ্বারকাবাসী পুরবাসীগণকে বজ্রের নিকট রেখে অর্জুন সজলনয়নে ব্যাসদেবের আশ্রমে এলেন।

অর্জুনকে দেখে ব্যাস বললেন, তোমাকে এমন শ্রীহীন দেখাচ্ছে কেন? তোমার গাত্রে কি কেউ নখ কেশ বস্ত্রাঞ্চল বা কলসের জল ছিটিয়েছেন? তুমি কি রজস্বলাগমণ বা ব্রহ্মহত্যা করেছ, না যুদ্ধে পরাজিত হয়েছ? অর্জুন দ্বারকার সমস্ত ঘটনা, কৃষ্ণ-বলরামের মৃত্যু, এবং দস্যুহস্তে তাঁর পরাজয়ের বিবরণ দিলেন। পরিশেষে তিনি বললেন, সেই পদ্মপলাশলোচন শঙ্খচক্রগদাধর শ্যামতনু চতুর্ভুজ পীতাম্বর পরমপুরুষ, যিনি আমার রথের অগ্রভাগে থাকতেন, সেই কৃষ্ণকে আমি দেখতে পাচ্ছি না; আর আমার জীবনধারণের ফল কি? তাঁর অদর্শনে আমি অবসন্ন হয়েছি, আমার শরীর ঘুরছে, আমি শান্তি পাচ্ছি না। মুনিসত্তম, বলুন এখন আমার কি কর্তব্য।

ব্যাস বললেন, কুরুশার্দূল, বৃষ্ণি-অন্ধক বীরগণ ব্রহ্মশাপে বিনষ্ট হয়েছেন, তাদের জন্য শোক ক'রো না। কৃষ্ণ জানতেন যে তাদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী, সেজন্য নিবারণে সমর্থ হয়েও উপেক্ষা করেছেন। তিনি পৃথিবীর ভার হরণ ক'রে দেহত্যাগ ক'রে স্বীয় ধামে গেছেন। পাণ্ডুপুত্রেরা, ভীম ও নকুল-সহদেবের সাহায্যে তুমি মহৎ দেবকার্য সাধন করেছ, যেজন্য পৃথিবীতে এসেছিলে তা সম্পন্ন ক'রে কৃতকৃত্য হয়েছ; তোমাদের কাল পূর্ণ হয়েছে, এখন প্রস্থান করাই শ্রেয়। তোমার অস্ত্রসমূহের প্রয়োজন শেষ হওয়াতেই তারা স্বস্থানে ফিরে গেছে; আবার যথাকালে তারা তোমার হস্তগত হবে। ব্যাসের উপদেশ শুনে অর্জুন হস্তিনাপুরে গেলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে সমস্ত ঘটনা জানালেন।