মৌষলপর্ব: ৩। বলরাম ও কৃষ্ণের দেহত্যাগ

বলরামের নিকটে এসে কৃষ্ণ দেখলেন, তিনি নির্জন স্থানে বৃক্ষমূলে ব'সে চিন্তা করছেন। কৃষ্ণ দারুককে বললেন, তুমি সত্বর হস্তিনাপুরে গিয়ে যাদবগণের নিধনসংবাদ অর্জুনকে জানাও এবং তাঁকে শীঘ্র এখানে নিয়ে এস। দারুক তখনই যাত্রা করলেন। তার পর কৃষ্ণ বজ্রকে বললেন, তুমি নারীদের রক্ষা করতে যাও, যেন দস্যুরা তাঁদের আক্রমণ না করে। বজ্র যাত্রার উপক্রম করতেই এক বাঘের মুদ্গর সহসা নিপাতিত হয়ে তাঁর প্রাণহরণ করলে। তখন কৃষ্ণ তাঁর অগ্রজকে বললেন, আমি নারীদের রক্ষার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি, আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করুন।

কৃষ্ণ তাঁর পিতা বসুদেবের কাছে গিয়ে বললেন, ধনঞ্জয়ের না আসা পর্যন্ত আপনি নারীদের রক্ষা করুন। বলরাম বনমধ্যে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমি তাঁর কাছে যাচ্ছি। আমি কুরুপাণ্ডবযুদ্ধে এবং এখানে বহু লোকের নিধন দেখেছি।

যাদবশূন্য এই পুরীতে আমি থাকতে পারব না, বনবাসী হয়ে বলরামের সঙ্গে তপস্যা করব। এই ব’লে কৃষ্ণ বসুদেবের চরণবন্দনা করলেন এবং নারী ও বালকদের ক্রন্দন শুনে বললেন, সব্যসাচী এখানে আসছেন, তিনি তোমাদের দুঃখমোচন করবেন।

বনে এসে কৃষ্ণ দেখলেন, বলরাম সেখানে ব’সে আছেন, তাঁর মুখ থেকে একটি শ্বেতবর্ণ সহস্রশীর্ষ রক্তমুখ মহানাগ নির্গত হয়ে সাগরে প্রবেশ করছেন। সাগর, দিব্য নদী সকল, বাসুকি কর্কোটক তক্ষক প্রভৃতি নাগগণ, এবং স্বয়ং বরুণ প্রত্যুদ্গমন ক’রে স্বাগতপ্রশ্ন ও পাদ্য-অর্ঘ্যাদি দ্বারা সেই মহানাগের সংবর্ধনা করলেন।

অগ্রজ বলদেবের দেহত্যাগ দেখে কৃষ্ণ সেই বনে কিছুক্ষণ বিচরণের পর ভূমিতে উপবেশন করলেন এবং গান্ধারী ও দুর্ব্বসার শাপের বিষয় চিন্তা করতে লাগলেন। অনন্তর তাঁর প্রয়াণকাল আগত হয়েছে এই বিবেচনায় তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাম সংযম এবং মহাযোগ আশ্রয় ক’রে শয়ান হলেন। সেই সময়ে জরা নামে এক ব্যাধ মৃগ মনে ক’রে তাঁর পদতল শরবিদ্ধ করলে। তার পর সে নিকটে এসে যোগমগ্ন পীতাম্বর চতুর্ভুজ কৃষ্ণকে দেখে ভয়ে তাঁর চরণে পতিত হ’ল। মহাত্মা কৃষ্ণ ব্যাধকে আশ্বাস দিলেন এবং নিজ কান্তি দ্বারা আকাশ ব্যাপ্ত ক’রে ঊর্ধ্বে স্বকীয় লোকে প্রয়াণ করলেন। দেবতারা ঋষি চারণ সিদ্ধ গন্ধর্ব প্রভৃতি সেই ঐশ্বর্যের অর্চনা করলেন, মুনিশ্রেষ্ঠগণ ঋক্ মন্ত্র উচ্চারণ করলেন, এবং ইন্দ্র তাঁকে সানন্দে অভিনন্দন করলেন।