মহাপ্রস্থানিকপর্ব: ৩। যুধিষ্ঠিরের সশরীরে স্বর্গযাত্রা
ভূমি ও আকাশ নিনাদিত ক’রে ইন্দ্র রথারোহণে অবতীর্ণ হলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি এই রথে ওঠ। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির শোকসন্তপ্ত হয়ে বললেন, সুরেশ্বর, আমার ভ্রাতারা এবং সুকুমারী দ্রুপদরাজপুত্রী এখানে প’ড়ে আছেন, তাঁদের ফেলে আমি যেতে পারি না, আপনি তাঁদেরও নিয়ে চলুন। ইন্দ্র বললেন, ভরতশ্রেষ্ঠ, তাঁরা দেহত্যাগ ক’রে আগেই স্বর্গে গেছেন; শোক ক’রো না, তুমি সশরীরে সেখানে গিয়ে তাঁদের দেখতে পাবে। যুধিষ্ঠির বললেন, এই কুকুর আমার ভক্ত, একেও আমার সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করি, নতুবা আমার পক্ষে নির্দয়তা হবে।
ইন্দ্র বললেন, মহারাজ, তুমি আমার তুল্য অমরত্ব ঐশ্বর্য্য সিদ্ধি ও স্বর্গ- সুখের অধিকারী হয়েছ, এই কুকুরকে ত্যাগ কর, তাতে তোমার নির্দয়তা হবে না। যুধিষ্ঠির বললেন, সহস্রলোচন, আমি আর্য্য হয়ে অনার্য্যের আচরণ করতে পারব না; এই ভক্ত কুকুরকে ত্যাগ ক’রে আমি দিব্য ঐশ্বর্য্যও চাই না। ইন্দ্র বললেন, যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না, ক্রোধবশ নামক দেবগণ তার যজ্ঞাদির ফল বিনষ্ট করেন। ধৰ্ম্মরাজ, তুমি এই কুকুরকে ত্যাগ কর।
যুধিষ্ঠির বললেন, মহেন্দ্র, ভক্তকে ত্যাগ করলে ব্রহ্মহত্যার তুল্য পাপ হয়, নিজের সুখের জন্য আমি এই কুকুরকে ত্যাগ করতে পারি না। প্রাণ বিসৰ্জন দিয়েও আমি ভীত অসহায় আর্ত দুর্বল ভক্তকে রক্ষা করি, এই আমার ব্রত। ইন্দ্র বললেন, কুকুরের দৃষ্টি পড়লে যজ্ঞ দান হোম প্রভৃতি নষ্ট হয়। ভ্রাতৃগণ ও প্রিয়া পত্নীকে ত্যাগ ক’রে তুমি নিজ কর্ম্মের প্রভাবে স্বর্গলোক লাভ করেছ, এখন মোহবশে এই কুকুরকে ছাড়তে চাও না কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, মৃত জনকে জীবিত করা যায় না, তাদের সঙ্গে কোনও সম্বন্ধও থাকে না। আমার ভ্রাতৃগণ ও পত্নীকে জীবিত করবার শক্তি নেই সেজন্যই ত্যাগ করেছি, তাঁদের জীবদ্দশায় ত্যাগ করি নি। আমি মনে করি, শরণাগতকে ভয় দেখানো, স্ত্রীবধ, ব্রহ্মস্বহরণ ও মিত্রবধ — এই চার কার্যে যে পাপ হয়, ভক্তকে ত্যাগ করলেও সেইরূপ হয়।
তখন কুকুররূপী ভগবান ধর্ম নিজ মূর্ত্তি গ্রহণ ক’রে বললেন, মহারাজ, তুমি উচ্চ বংশে জন্মেছ, পিতার স্বভাবও পেয়েছ; তোমার মেধা এবং সর্বভূতে দয়া আছে। পূর্বে, দ্বৈতবনে আমি একবার তোমাকে পরীক্ষা করেছিলাম, তুমি ভীমার্জ্জুনের পরিবর্তে নকুলের জীবন চেয়েছিলে, যাতে তোমার জননীর ন্যায় মাদ্রীরও একটি পুত্র থাকে (১)। স্বর্গেও তোমার সমান কেউ নেই, কারণ ভক্ত কুকুরের জন্য তুমি দেবরথ ত্যাগ করতে চেয়েছ। ভরতশ্রেষ্ঠ, তুমি সশরীরে স্বর্গারোহণ ক’রে অক্ষয় লোক লাভ করবে।
তার পর ধর্ম ইন্দ্র মরুদ্গণ প্রভৃতি দেবতা এবং দেবর্ষিগণ যুধিষ্ঠিরকে দিব্য রথে তুলে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। দেবর্ষি নারদ উচ্চস্বরে বললেন, যে রাজর্ষিগণ এখানে উপস্থিত আছেন তাঁদের সকলের কীৰ্ত্তি এই কুরুরাজ যুধিষ্ঠির আবৃত ক’রে দিয়েছেন; ইনি যশ তেজ ও সম্পদে সকলকে অতিক্রম করেছেন। আর কেউ সশরীরে স্বর্গে এসেছেন এমন শুনি নি।
যুধিষ্ঠির বললেন, আমার ভ্রাতারা যে স্থানে গেছেন তা শুভ বা অশুভ যাই হোক আমি সেখানেই যেতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, মহারাজ, এখনও তুমি মানুষের স্নেহ ত্যাগ করছ না কেন? নিজের কর্ম দ্বারা যে শুভলোক জয় করেছ সেখানেই বাস কর। তুমি পরমসিদ্ধি লাভ ক’রে এখানে এসেছ, তোমার ভ্রাতারা এখানে আসবার অধিকার পান নি। এখনও তোমার মানুষ ভাব রয়েছে কেন? এ স্বর্গ, এই দেখ দেবর্ষি ও সিদ্ধগণ এখানে রয়েছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, দেবরাজ, যেখানে আমার ভ্রাতারা আছেন, যেখানে আমার গুণবতী শ্যামাঙ্গিনী নারীশ্রেষ্ঠা পত্নী আছেন, সেখানেই আমি যাব।