স্বর্গারোহণপর্ব: ২। কুরুপাণ্ডবদিগের স্বর্গলাভ
যুধিষ্ঠির কুরুপাণ্ডবগণের নিকটে এসে দেখলেন, গোবিন্দ ব্রাহ্মী তনু ধারণ ক'রে দীপ্যমান হয়ে বিরাজ করছেন, তাঁর চক্র প্রভৃতি ঘোর অস্ত্রসমূহ পুরুষ-মূর্ত্তিতে তাঁর নিকটে রয়েছে, অর্জুন তাঁকে উপাসনা করছেন। যুধিষ্ঠিরকে দেখে কৃষ্ণার্জুন যথাবিধি অভিবাদন করলেন। তার পর যুধিষ্ঠির অন্যান্য স্থানে গিয়ে দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ কর্ণ, মরুদ্গণবেষ্টিত ভীমসেন, অশ্বিদ্বয়ের নিকটে নকুল-সহদেব, এবং সূর্য্যের ন্যায় প্রভাবশালিনী কমল-উৎপলের মাল্যধারিণী পাঞ্চালীকে দেখলেন।
ইন্দ্র বললেন, এই দ্রৌপদী অযোনিজা লক্ষ্মী, শূলপাণি তোমাদের প্রীতির নিমিত্ত এঁকে সৃষ্টি করেছিলেন। এই পাঁচ জন গন্ধর্ব্ব তোমাদের পুত্ররূপে এঁ র গর্ভে জন্মেছিলেন। এই গন্ধর্ব্বরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে দেখ, ইনিই তোমার জ্যেষ্ঠতাত ছিলেন। এই সূর্য্যতুল্য বীর তোমার অগ্রজ কর্ণ। বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় মহারথগণ, সাত্যকি প্রভৃতি ভোজবংশীয় বীরগণ, এবং সুভদ্রাপুত্র চন্দ্রকান্তি অভিমন্যু — এঁরা সকলেই দেবগণের মধ্যে রয়েছেন। এই দেখ তোমার পিতা পাণ্ডু ও মাতা কুন্তী-মাদ্রী, এঁরা বিমানযোগে সর্বদা আমার কাছে আসেন। বসুগণের মধ্যে ভীষ্ম এবং বৃহস্পতির পার্শ্বে তোমার গুরু দ্রোণকে দেখ। অন্যান্য রাজা ও যোদ্ধারা গন্ধর্ব যক্ষ ও সাধ্যগণের সঙ্গে রহিয়াছেন।
জনমেজয় প্রশ্ন করিলেন, দ্বিজোত্তম, আপনি যাঁদের কথা বলিলেন তাঁরা কত কাল স্বর্গবাস করিয়াছিলেন? কর্মফলভোগ শেষ হ’লে তাঁরা কোন্ গতি পেয়েছিলেন? বৈশম্পায়ন বলিলেন, অগাধবুদ্ধি সর্বজ্ঞ ব্যাসদেবের নিকট আমি যেমন শুনেছি তাই বলছি। — ভীষ্ম বসুগণে, দ্রোণ বৃহস্পতির শরীরে, কৃতবর্মা মরুদ্গণে, প্রদ্যুম্ন সনৎকুমারে, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী কুবেরলোকে, পাণ্ডু কুন্তী ও মাদ্রী ইন্দ্রলোকে, এবং বিরাট দ্রুপদ ভূরিশ্রবা উগ্রসেন কংস অক্রূর বসুদেব শাম্ব প্রভৃতি বিশ্বদেবগণে প্রবেশ করেছেন। চন্দ্রপুত্র বর্চ্চা অভিমন্যু রূপে জন্মেছিলেন, তিনি চন্দ্রলোকে গেছেন। কর্ণ সূর্যের, শকুনি দ্বাপরের, এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন পাবকের শরীরে গেছেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা রাক্ষসের অংশে জন্মেছিলেন, তাঁরা অস্ত্রাঘাতে পূত হয়ে স্বর্গলাভ করেছেন। বিদুর ও যুধিষ্ঠির ধর্মে লীন হয়েছেন। বলরামরূপী ভগবান অনন্তদেব রসাতলে প্রবেশ করেছেন। দেবদেব নারায়ণের অংশে যিনি জন্মেছিলেন সেই বাসুদেব নারায়ণের সহিত যুক্ত হয়েছেন। তাঁর ষোল হাজার পত্নী কালক্রমে সরস্বতী নদীতে প্রাণত্যাগ করে অপ্সরার রূপে নারায়ণের কাছে গেছেন। ঘটোৎকচ প্রভৃতি দেবলোক ও রাক্ষসলোক লাভ করেছেন। কর্মফলভোগ শেষ হ’লে এ’দের অনেকে সংসারে প্রত্যাবর্তন করবেন।
রাজা জনমেজয় বৈশম্পায়নের মুখে মহাভারতকথা শুনে অতিশয় বিস্মিত হলেন। তাঁর যজ্ঞ সমাপ্ত হ’ল, সর্পগণের মুক্তিতে আস্তীক মুনি প্রীত হলেন। ব্রাহ্মণগণ দক্ষিণা পেয়ে তুষ্ট হয়ে চ’লে গেলেন, নিমন্ত্রিত রাজারাও প্রস্থান করলেন। তার পর জনমেজয় যজ্ঞস্থান তক্ষশিলা থেকে হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।