আদিপর্ব: ৮। আস্তীকের জন্ম — পরীক্ষিতের মৃত্যুবিবরণ

শৌনক বললেন, কদ্রুর অভিশাপ (১) শুনে তাঁর পুত্রেরা কি করেছিল বল।

(১) ৭-পরিচ্ছেদে।

সৌতি বললেন। — ভগবান শেষ নাগ (অনন্ত, বাসুকি), কদ্রুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। ইনি মাতার অভিশাপের পর নানা পবিত্র তীর্থে গিয়ে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। ব্রহ্মা তাঁর কাছে এসে বললেন, তোমার কি কামনা তা বল। শেষ উত্তর দিলেন, আমার সহোদরগণ অতি মন্দমতি, তারা আমার বৈমাত্র ভ্রাতা গরুড়কে দ্বেষ করে। আমি পরলোকেও সহোদরদের সংসর্গ চাই না, সেজন্য তপস্যায় প্রাণ বিসর্জ্জন দেব। ব্রহ্মা বললেন, আমি তোমার ভ্রাতাদের আচরণ জানি। ভাগ্যক্রমে তোমার ধর্ম্মবুদ্ধি হয়েছে, তুমি আমার আদেশে এই শৈল-বন-সাগর-জনপদাদি-সমন্বিত চঞ্চল পৃথিবীকে নিশ্চল ক’রে ধারণ কর। শেষ নাগ পাতালে গিয়ে মস্তক দ্বারা পৃথিবী ধারণ করলেন, ব্রহ্মার ইচ্ছায় গরুড় তাঁর সহায় হলেন। পাতালবাসী নাগগণ তাঁকে বাসুকিরূপে নাগরাজপদে অভিষিক্ত করলেন।

মাতৃপ্রদত্ত শাপ খণ্ড করবার জন্য বাসুকি তাঁর ধর্ম্মিক ভ্রাতাদের সঙ্গে মন্ত্রণা করলেন। নাগগণ অনেক প্রকার উপায় নির্দেশ করলেন কিন্তু বাসুকি কোনওটিতে সম্মত হলেন না। তখন এলাপত্র নামে এক নাগ বললেন, আমাদের মাতা যখন অভিশাপ দেন তখন আমি তাঁর ক্রোড়ে ব’সে শুনেছিলাম — ব্রহ্মা দেবগণকে বলছেন, তপস্বী পরিব্রাজক জরৎকারুর ঔরসে বাসুকির ভগিনী (১) জরৎকারুর গর্ভে আস্তীক নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন, তিনিই ধর্ম্মিক সর্পগণকে রক্ষা করবেন।

(১) ইনিই মনসা দেবী।

তারপর বাসুকি বহু অন্বেষণের পর মহর্ষি জরৎকারুকে পেয়ে তাঁকে ভগিনী সম্প্রদান করলেন। সেই ধর্ম্মিক তপস্বী বাসুকির প্রদত্ত রমণীয় গৃহে সপত্নীক বাস করতে লাগলেন। তিনি ভার্যাকে বললেন, তুমি কদাচ আমার অপ্রিয় কিছু করবে না, যদি কর তবে এই বাসগৃহ আর তোমাকে ত্যাগ করব। বাসুকি-ভগিনী তাতেই সম্মত হলেন এবং শ্বেতকাকী(২)র ন্যায় পতির সেবা করে থাকাকালে গর্ভবতী হলেন। একদিন মহর্ষি তাঁর ক্রোড়ে মস্তক রেখে নিদ্রা যাচ্ছিলেন এমন সময় সূর্যাস্তকাল উপস্থিত হ’ল। পাছে সন্ধ্যাকৃত্যের কাল উত্তীর্ণ হয় এই আশঙ্কায় তিনি মৃদুস্বরে স্বামীকে জাগালেন। মহর্ষি বললেন, নিদ্রাভঙ্গ ক’রে তুমি আমার অবমাননা করেছ, তোমার কাছে আর আমি থাকব না। আমি ততক্ষণ সুপ্ত থাকি যতক্ষণ সূর্যের অস্ত হবার ক্ষমতা নেই। অনেক অনুনয় করলেও তিনি তাঁর বাক্য প্রত্যাহার করলেন না, যাবার সময় পত্নীকে ব’লে গেলেন, ভাগ্যবতী, তোমার গর্ভে অগ্নিতুল্য তেজস্বী পরম ধর্ম্মাত্মা বেদজ্ঞ ঋষি আছেন।

(২) টীকাকার নীলকণ্ঠ অর্থ করেছেন স্ত্রী-বশ।

যথাকালে বাসুকিভগিনীর দেবকুমার তুল্য এক পুত্র হ'ল। এই পুত্র চ্যবনতনয় প্রমতির কাছে বেদাধ্যয়ন করলেন। মহর্ষি জরৎকারু চ'লে যাবার সময় তাঁর পত্নীর গর্ভস্থ সন্তানকে রক্ষা ক'রে 'অস্তি' (আছে) বলেছিলেন সেজন্য তাঁর পুত্র আস্তীক নামে খ্যাত হ'লেন।

শৌনক জিজ্ঞাসা করলেন, জনমেজয় তাঁর পিতার মৃত্যুর বৃত্তান্ত জানতে চাইলে মন্ত্রীরা তাঁকে কি বলেছিলেন?

সৌতি বললেন, জনমেজয়ের মন্ত্রীরা এই ইতিহাস বলেছিলেন।—অভিমন্যু-উত্তরার পুত্র মহারাজ পরীক্ষিৎ কৃপাচার্যের শিষ্য এবং গোবিন্দের প্রিয় ছিলেন। ষাট বৎসর বয়স পর্যন্ত রাজ্য রক্ষা করার পর দুরদৃষ্টক্রমে তাঁর প্রাণনাশ হয়। তিনি প্রপিতামহ পাণ্ডুর ন্যায় মহাবীর ও ধনুর্ধর ছিলেন। একদা পরীক্ষিৎ মৃগয়া করতে গিয়ে একটি মৃগকে বাণবিদ্ধ ক'রে তার অনুসরণ করলেন এবং পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধিত হয়ে গহন বনে শমীক নামক এক মুনিকে দেখতে পেলেন। রাজা মৃগ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে মুনি উত্তর দিলেন না, কারণ তিনি তখন মৌনব্রতধারী ছিলেন। পরীক্ষিৎ ক্রুদ্ধ হয়ে একটা মৃত সর্প ধনুর অগ্রভাগ দিয়ে তুলে মুনির স্কন্ধে পরিয়ে দিলেন। মুনি কিছুই বললেন না, ক্রোধও প্রকাশ করলেন না। রাজা তখন নিজের পুরীতে ফিরে গেলেন।

শমীক মুনির শৃঙ্গী নামে এক তেজস্বী ক্রোধী পুত্র ছিলেন, তিনি তাঁর আচার্যের গৃহ থেকে ফেরবার সময় রুশ নামক এক বন্ধুর কাছে শুনলেন, রাজা পরীক্ষিৎ তাঁর তপোব্রত পিতাকে কিরূপে অপমান করেছেন। শৃঙ্গী ক্রোধে যেন প্রদীপ্ত হয়ে এই অভিশাপ দিলেন, আমার নিরপরাধ পিতার স্কন্ধে যে মৃত সর্প দিয়েছে সেই পাপীকে সপ্ত রাত্রির মধ্যে মহাবিষধর তক্ষক নাগ দগ্ধ করবে। শৃঙ্গী তাঁর পিতার নিকট গিয়ে শাপের কথা জানালেন। শমীক বললেন, বৎস, আমরা পরীক্ষিতের রাজ্যে বাস করি, তিনি আমাদের রক্ষক, তাঁর অনিষ্ট আমি চাই না। তিনি ক্ষুধিত ও শ্রান্ত হয়ে এসেছিলেন, আমার মৌনব্রত না জেনেই এই কর্ম করেছেন। পুত্র তাঁকে অভিশাপ দেওয়া উচিত হয়নি। শৃঙ্গী বললেন, পিতা, আমি যদি অন্যায়ও ক'রে থাকি তথাপি আমার শাপ মিথ্যা হবে না।

গৌরমূখ নামক এক শিষ্যকে শমীক পরীক্ষিতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। গুরুর উপদেশ অনুসারে গৌরমূখ বললেন, মহারাজ, মৌনব্রতী শমীকের স্কন্ধে আপনি মৃত সর্প রেখেছিলেন, তিনি সেই অপরাধ ক্ষমা করেছেন। কিন্তু তাঁর পুত্র ক্ষমা করেন নি, তাঁর শাপে সপ্ত রাত্রির মধ্যে তক্ষক আপনার প্রাণহরণ করবে। শমীক বার বার ব'লে দিয়েছেন আপনি যেন আত্মরক্ষায় যত্নবান হন।

পরীক্ষিৎ অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে মন্ত্রণা করলেন। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ ক'রে তিনি একটিমাত্র স্তম্ভের উপর সুরক্ষিত প্রাসাদ নির্মাণ করালেন এবং বিষচিকিৎসক ও মন্ত্রবিৎ ব্রাহ্মণগণকে নিযুক্ত করলেন। তিনি সেখানে থেকেই মন্ত্রীদের সাহায্যে রাজকার্য করতে লাগলেন, অন্য কেউ তাঁর কাছে আসতে পারত না। সপ্তম দিনে কাশ্যপ নামে এক ব্রাহ্মণ বিষচিকিৎসার জন্য রাজার কাছে যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশে তক্ষক তাঁকে বললে, আপনি এত দ্রুত কোথায় যাচ্ছেন? কাশ্যপ বললেন, আজ তক্ষক নাগ পরীক্ষিৎকে দংশন করবে, আমি গুরুর কৃপায় বিষ নষ্ট করতে পারি, রাজাকে সদ্য সদ্য নিরাময় করব। তক্ষক বললে, আমিই তক্ষক, এই বটবৃক্ষকে দংশন করছি, আপনার মন্ত্রবল দেখান।

তক্ষকের দংশনে বটবৃক্ষ জ্বলে গেল। কাশ্যপের মন্ত্রশক্তিতে ভস্মরাশি থেকে প্রথমে অঙ্কুর, তারপর দু'টি পল্লব, তারপর বহু পত্র ও শাখাপ্রশাখা উদ্ভূত হ'ল। তক্ষক বললে, তপোধন, আপনি কিসের প্রার্থী হয়ে রাজার কাছে যাচ্ছেন? ব্রাহ্মণের শাপে তাঁর আয়ু ক্ষয় পেয়েছে, আপনি তাঁর চিকিৎসায় কৃতকার্য হবেন কিনা সন্দেহ। রাজার কাছে আপনি যত ধন আশা করেন তার চেয়ে বেশী আমি দেব, আপনি ফিরে যান। কাশ্যপ ধ্যান ক'রে জানলেন যে পরীক্ষিতের আয়ু শেষ হয়েছে, তিনি তক্ষকের কাছে অভীষ্ট ধন নিয়ে চ'লে গেলেন।

তক্ষকের উপদেশে কয়েকজন নাগ তপস্বী সেজে ফল কুশ আর জল নিয়ে পরীক্ষিতের কাছে গেল। রাজা সেই সকল উপহার নিয়ে তাদের বিদায় দিলেন এবং অমাত্য-সুহৃদ্গণের সঙ্গে ফল খাবার উপক্রম করলেন। তাঁর ফলে একটি ক্ষুদ্র কৃষ্ণনয়ন তাম্রবর্ণ কীট দেখে রাজা তা হাতে ধ'রে সচিবদের বললেন, সূর্য অস্ত যাচ্ছেন, আমার দুঃখ বা ভয় নেই, শৃঙ্গীর বাক্য সত্য হ'ক, এই কীট তক্ষক হয়ে আমাকে দংশন করুক। এই ব'লে তিনি নিজের কণ্ঠদেশে সেই কীট রেখে হাসতে লাগলেন। তখন কীটরূপী তক্ষক নিজ মূর্তি ধ'রে রাজাকে বেষ্টন করলে এবং সগর্জনে তাঁকে দংশন করলে। মন্ত্রীরা ভয়ে পালিয়ে গেলেন। তার পর তাঁরা দেখলেন, পদ্মবর্ণ তক্ষক আকাশে যেন সীমন্তরেখা বিস্তার ক'রে চলেছে। বিষের অনলে রাজার গৃহ আলোকিত হ'ল, তিনি বজ্রাহতের ন্যায় প'ড়ে গেলেন।

পরীক্ষিতের মৃত্যুর পর রাজপুরোহিত এবং মন্ত্রীরা পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন ক'রে তাঁর শিশু পুত্র জনমেজয়কে রাজা করলেন। যথাকালে কাশীরাজ সুবর্ণ-বর্মার কন্যা বপুষ্টমার সঙ্গে জনমেজয়ের বিবাহ হ'ল। তিনি অন্য নারীর প্রতি মন দিতেন না, পতিব্রতা রূপবতী বপুষ্টমার সঙ্গে মহানন্দে কালযাপন করতে লাগলেন।