আদিপর্ব: ৯। জনমেজয়ের সর্পসত্র
মন্ত্রীদের কাছে পিতার মৃত্যুবিবরণ শুনে জনমেজয় অত্যন্ত দুঃখে অশ্রুবিমোচন করতে লাগলেন, তার পর জলস্পর্শ করে বললেন, যে দুরাত্মা তক্ষক আমার পিতার প্রাণহিংসা করেছে তার উপর আমি প্রতিশোধ নেব। তিনি পুরোহিতদের প্রশ্ন করলেন, আপনারা এমন ক্রিয়া জানেন কি যাতে তক্ষককে সবান্ধবে প্রদীপ্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা যায়? পুরোহিতরা বললেন, মহারাজ, সর্পসত্র নামে এক মহাযজ্ঞ আছে, আমরা তার পদ্ধতি জানি।
রাজার আজ্ঞায় যজ্ঞের আয়োজন হ'তে লাগল। যজ্ঞস্থান মাপবার সময় একজন পুরাণকথক সূত বললে, কোনও ব্রাহ্মণ এই যজ্ঞের ব্যাঘাত করবেন। জনমেজয় দ্বারপালকে বললেন, আমার অজ্ঞাতসারে কেউ যেন এখানে না আসে। অনন্তর যথাবিধি সর্পসত্র আরম্ভ হ'ল। কৃষ্ণবসনধারী যাজকগণ ধূমে রক্তলোচন হয়ে সর্পগণকে আহ্বান ক'রে অগ্নিতে আহুতি দিতে লাগলেন। নানাজাতীয় নানাবর্ণ অসংখ্য সর্প অগ্নিতে পড়ে বিনষ্ট হ'ল।
তক্ষক নাগ আশ্রয়ের জন্য ইন্দ্রের কাছে গেল। ইন্দ্র বললেন, তোমার ভয় নেই, এখানেই থাক। স্বজনবর্গের মৃত্যুতে কাতর হয়ে বাসুকি তাঁর ভগিনীকে বললেন, কল্যাণী, তুমি তোমার পুত্রকে বল যেন আমাদের সকলকে রক্ষা করে। তখন জরৎকারু আস্তীককে পূর্ব ইতিহাস জানিয়ে বললেন, হে অমরতুল্য পুত্র, তুমি আমার ভ্রাতা ও আত্মীয়বর্গকে যজ্ঞাগ্নি থেকে রক্ষা কর। আস্তীক বললেন, তাই হবে, আমি নাগরাজ বাসুকিকে তাঁর মাতৃদত্ত শাপ থেকে রক্ষা করব।
আস্তীক যজ্ঞস্থানে গেলেন, কিন্তু দ্বারপাল তাঁকে প্রবেশ করতে দিলে না। তখন তিনি স্তুতি করতে লাগলেন — পরীক্ষিৎপুত্র জনমেজয়, তুমি ভরতবংশের প্রধান, তোমার এই যজ্ঞ প্রয়াগে অনুষ্ঠিত চন্দ্র, বরুণ ও প্রজাপতির যজ্ঞের তুল্য; আমাদের প্রিয়জনের যেন মঙ্গল হয়। ইন্দ্রের শত যজ্ঞ, যম রন্তিদেব কুবের ও দাশরথি রামের যজ্ঞ, এবং যথার্থব্রত কৃষ্ণদ্বৈপায়ন প্রভৃতির যজ্ঞ যেরূপ, তোমার এই যজ্ঞও সেইরূপ; আমাদের প্রিয়জনের যেন মঙ্গল হয়। তৌমীর তুল্য প্রজাপালক রাজা জীবলোকে নেই, তুমি বরুণ ও ধর্মরাজের তুল্য। তুমি যমের ন্যায় ধর্মজ্ঞ, কৃষ্ণের ন্যায় সর্বগুণসম্পন্ন।
আস্তীকের স্তুতি শুনে জনমেজয় বললেন, ইনি অল্পবয়স্ক হলেও বৃদ্ধের ন্যায় কথা বলছেন, এঁকে বর দিতে চাই। রাজার সদস্যগণ বললেন, এই ব্রাহ্মণ সম্মান ও বরলাভের যোগ্য, কিন্তু যাতে তক্ষক শীঘ্র আসে আগে সেই চেষ্টা করুন। আগন্তুক ব্রাহ্মণকে রাজা বর দিতে চান দেখে সর্পসত্রের হোতা চণ্ডভার্গব প্রীত হলেন না। তিনি বললেন, এই যজ্ঞে এখনও তক্ষক আসে নি। ঋষিগণ বললেন, আমরা বুঝতে পারছি তক্ষক ভয় পেয়ে ইন্দ্রের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তখন রাজার অনুরোধে হোতৃগণ ইন্দ্রকে আহ্বান করলেন। ইন্দ্র বিমানে চড়ে যজ্ঞস্থানে যাত্রা করলেন, তক্ষক তাঁর উত্তরীয়ে লুকিয়ে রইল। জনমেজয় ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, তক্ষক যদি ইন্দ্রের কাছে থাকে তবে ইন্দ্রের সঙ্গেই তাঁকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করুন।
ইন্দ্র যজ্ঞস্থানের নিকটে এসে ভয় পেলেন এবং তক্ষককে ত্যাগ ক'রে পালিয়ে গেলেন। তক্ষক মন্ত্রপ্রভাবে মোহগ্রস্ত হয়ে আকাশপথে যজ্ঞাগ্নির অভিমুখে আসতে লাগল। ঋষিগণ বললেন, মহারাজ, ওই তক্ষক ঘুরতে ঘুরতে আসছে, তার মহাগর্জন শোনা যাচ্ছে। আপনার কার্য্যসিদ্ধি হয়েছে, এখন ওই ব্রাহ্মণকে বর দিতে পারেন। রাজা আস্তীককে বললেন, বালক, তুমি সূপণ্ডিত, তোমার অভিপ্ৰেত বর চাও। আস্তীক তক্ষকের উদ্দেশ্যে বললেন, তিষ্ঠ তিষ্ঠ তিষ্ঠ; তক্ষক আকাশে স্থির হয়ে রইল। তখন আস্তীক রাজাকে বললেন, জনমেজয়, এই যজ্ঞ এখনই নিবৃত্ত হ'ক, অগ্নিতে আর যেন সর্প না পড়ে। জনমেজয় অপ্রীত হয়ে বললেন, ব্রাহ্মণ, সুবর্ণ রজত ধেনু যা চাও দেব, কিন্তু আমার যজ্ঞ যেন নিবৃত্ত না হয়। রাজা এইরূপে বার বার অনুরোধ করলেও আস্তীক বললেন, আমি আর কিছুই চাই না, আপনার যজ্ঞ নিবৃত্ত হ'ক, আমার মাতৃকুলের মঙ্গল হ'ক। তখন সদস্যগণ সকলে রাজাকে বললেন, এই ব্রাহ্মণকে বর দিন।
আস্তীক তাঁর অভীষ্ট বর পেলেন, যজ্ঞ সমাপ্ত হ'ল, রাজাও প্রীতিলাভ ক'রে ব্রাহ্মণগণকে বহু অর্থ দান করলেন। তিনি আস্তীককে বললেন, তুমি আমার অশ্বমেধ যজ্ঞে সদসরূপে আবার এসো। আস্তীক সম্মত হয়ে মাতুলালয়ে ফিরে গেলেন। সর্পগণ আনন্দিত হয়ে বর দিতে চাইলে আস্তীক বললেন, প্রসন্নচিত্ত ব্রাহ্মণ বা অন্য ব্যক্তি যদি রাত্রিতে বা দিবসে এই ধর্ম্মাখ্যান পাঠ করে তবে তোমাদের কাছ থেকে তার যেন কোনও বিপদ না হয়। সর্পগণ প্রীত হয়ে বললে, ভাগিনেয়, আমরা তোমার কামনা পূর্ণ করব।
আস্তীকঃ সর্পসত্রে বঃ পন্নগান্ যোহভ্যবারয়ৎ।
তং স্মরন্তং মহাভাগাঃ ন মাং হিংসিতুমর্হথ॥
সর্পাপসর্প ভদ্রং তে গচ্ছ সর্প মহাবিষ।
জনমেজয়স্য যজ্ঞান্তে আস্তীকবচনং স্মর॥
আস্তীকস্য বচঃ শ্ৰুত্বা যঃ সর্পো ন নিবর্ততে।
শতধা ভিদ্যতে মূর্ধা শিংশপফলং যথা ॥ (৯)
— হে মহাভাগ সর্পগণ, যিনি সর্পসত্রে তোমাদের রক্ষা করেছিলেন সেই আস্তীককে স্মরণ করছি, আমার হিংসা করো না। সর্প, সরে যাও, তোমার ভাল হোক; মহাবিষ সর্প, চলে যাও, জনমেজয়ের যজ্ঞের পর আস্তীকের বাক্য স্মরণ কর। আস্তীকের কথায় যে সর্প নিবৃত্ত হয় না তার মস্তক শিমূল (২) ফলের ন্যায় শতধা বিদীর্ণ হয়।