আদিপর্ব: ১০। উপরিচর বসু — পরাশর-সত্যবতী — কৃষ্ণদ্বৈপায়ন

শৌনক বললেন, বৎস সৌতি, সর্পসত্রে কর্মের অবকাশে ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়ন প্রতিদিন যে মহাভারত পাঠ করতেন তাই আমরা এখন শুনতে ইচ্ছা করি। সৌতি বললেন, জনমেজয়ের অনুরোধে ব্যাসদেবের আদেশে তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়ন যে মহাভারতকথা বলেছিলেন তা আপনারা শুনুন —

(১) চেদি দেশে উপরিচর বসু নামে পুরুবংশজাত এক রাজা ছিলেন। ইন্দ্র তাঁকে সখা গণ্য ক’রে স্ফটিকময় বিমান, অম্লান পঙ্কজের বৈজয়ন্তী মালা এবং একটি বংশনির্মিত যষ্টি দিয়েছিলেন। উপরিচর অগ্রহায়ণ মাসে উৎসব ক’রে সেই যষ্টি রাজপুরীতে এনে ইন্দ্রপূজা করতেন। পরদিন তিনি গন্ধমাল্যাদির দ্বারা অলঙ্কৃত এবং কুসুম্ভ পুষ্পে রঞ্জিত বস্ত্রে বেষ্টিত ক’রে ইন্দ্রধ্বজ উত্তোলন করতেন। সেই অবধি অন্যান্য রাজারাও এইপ্রকার উৎসব ক’রে থাকেন। উপরিচর ইন্দ্রদত্ত বিমানে আকাশে বিচরণ করতেন সেই কারণেই তাঁর এই নাম। তাঁর পাঁচ পুত্র ছিল, তাঁরা বিভিন্ন দেশে রাজবংশ স্থাপন করেন।

(১) এইখানে মহাভারতের মূল আখ্যানের আরম্ভ।

উপরিচরের রাজধানীর নিকট শুক্তিমতী নদী ছিল। কোলাহল নামক পর্বত এই নদীর গর্ভে এক পুত্র এবং এক কন্যা উৎপাদন করে। রাজা সেই পুত্রকে সেনাপতি এবং কন্যাকে মহিষী করলেন। একদিন মৃগয়া করতে গিয়ে রাজা তাঁর ঋতুস্নাতা রূপবতী মহিষী গিরিকাকে স্মরণ করে কামাবিষ্ট হলেন এবং স্খলিত শুক্র এক শোনপক্ষীকে দিয়ে বললেন, তুমি শীঘ্র গিরিকাকে দিয়ে এস। পথে অন্য এক শেনের আক্রমণের ফলে শুক্র যমুনার জলে পড়ে গেল। অদ্রিকা নামে এক অপ্সরা ব্রহ্মশাপে মৎসী হয়ে ছিল, সে শুক্র গ্রহণ করে গর্ভিণী হ'ল এবং দশম মাসে ধীবরের জালে ধৃত হল। ধীবর সেই মৎসীর উদরে একটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রী সন্তান পেয়ে রাজার কাছে নিয়ে এল। অপ্সরা তখনই শাপমুক্ত হয়ে আকাশ- পথে চলে গেল। উপরিচর ধীবরকে বললেন, এই কন্যা তোমারই হোক। পুরুষ সন্তানটি পরে মৎস্য নামে এক ধাম্মিক রাজা হয়েছিলেন।

সেই রূপগুণবতী কন্যার নাম সত্যবতী, কিন্তু সে মৎস্যজীবীদের কাছে থাকত সেজন্য তার অন্য নাম মৎস্যগন্ধা। একদিন সে যমুনায় নৌকা চালাচ্ছিল এমন সময় পরাশর মুনি তীর্থপয্যটন করতে করতে সেখানে এলেন। অতীব রূপবতী চারুহাসিনী মৎস্যগন্ধাকে দেখে মোহিত হয়ে পরাশর বললেন, সুন্দরী, এই নৌকার কর্ণধার কোথায়? সে বললে, যে ধীবরের এই নৌকা তাঁর পুত্র না থাকায় আমিই সকলকে পার করি। পরাশর নৌকায় উঠে যেতে যেতে বললেন, আমি তোমার জন্মবৃত্তান্ত জানি; কল্যাণী, তোমার কাছে বংশধর পুত্র চাচ্ছি, তুমি আমার কামনা পূর্ণ কর। সত্যবতী বললে, ভগবান, পরপারের ঋষিরা আমাদের দেখতে পাবেন। পরাশর তখন কুজঝটিকা সৃষ্টি করলেন, সবদিক তমসচ্ছন্ন হল। সত্যবতী লজ্জিত হয়ে বললে, আমি কুমারী, পিতার বশে চলি, আমার কন্যাভাব দূষিত হলে কি করে গৃহে ফিরে যাব? পরাশর বললেন, আমার প্রিয়কায্য করে তুমি কুমারীই থাকবে। পরাশরের বরে মৎস্যগন্ধার দেহ সুগন্ধময় হল, সে গন্ধবতী নামে খ্যাত হ'ল। এক যোজন দূর থেকে তার গন্ধ পাওয়া যেত সেজন্য লোকে তাকে যোজন- গন্ধাও বলত।

সত্যবতী সদ্য গর্ভধারণ করে পুত্র প্রসব করলেন। যমুনার দ্বীপে জাত এই পরাশরপুত্রের নাম দ্বৈপায়ন (১), ইনি মাতার আদেশ নিয়ে তপস্যায় রত হলেন। পরে ইনি বেদ বিভক্ত করে ব্যাস নামে বিখ্যাত হন এবং পুত্র শুক ও বৈশম্পায়নাদি শিষ্যকে চতুর্বেদ ও মহাভারত অধ্যয়ন করান। তাঁরাই মহাভারতের সংহিতাগুলি পৃথক পৃথক প্রকাশিত করেন।

(১) এর প্রকৃত নাম কৃষ্ণ, দ্বীপে জাত এজন্য উপনাম দ্বৈপায়ন।