আদিপর্ব: ১১। কচ ও দেবযানী
জনমেজয়ের অনুরোধে বৈশম্পায়ন কুরুবংশের বৃত্তান্ত আদি থেকে বললেন—ব্রহ্মার পুত্র দক্ষ প্রজাপতি তাঁর পঞ্চাশটি কন্যাকে পুত্রতুল্য জ্ঞান করতেন। জ্যেষ্ঠা কন্যা অদিতি থেকে বংশানুক্রমে বিবস্বান (সূর্য), মনু, ইলা, পুরুরবা, আয়ু, নহুষ ও যযাতি উৎপন্ন হন। যযাতি দেবযানী ও শর্মিষ্ঠাকে বিবাহ করেন।
ত্রিলোকের ঐশ্বর্যের জন্য যখন দেবাসুরের বিরোধ হয় তখন দেবতারা বৃহস্পতিকে এবং অসুররা শুক্রাচার্যকে পৌরোহিত্যে বরণ করেন। এই দুই ব্রাহ্মণের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, দেবগণ যে সকল দানবকে যুদ্ধে মারতেন শুক্র বিদ্যাবলে তাদের পুনর্জীবিত করতেন। বৃহস্পতি এই বিদ্যা জানতেন না, সেজন্য দেবপক্ষের মৃত সৈন্য বাঁচাতে পারতেন না। দেবতারা বৃহস্পতির পুত্র কচকে বললেন, তুমি অসুররাজ বৃষপর্বার কাছে যাও, সেখানে শুক্রাচার্যকে দেখতে পাবে। শুক্রের প্রিয়কন্যা দেবযানীকে যদি সন্তুষ্ট করতে পার তবে তুমি নিশ্চয় মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করবে। কচ শুক্রের কাছে গিয়ে বললেন, আমি অঙ্গিরা ঋষির পৌত্র, বৃহস্পতির পুত্র, আমাকে শিষ্য করুন, সহস্র বৎসর আমি আপনার কাছে থাকব। শুক্র সম্মত হলেন। গুরু ও গুরুকন্যার সেবা করে কচ ব্রহ্মচর্য পালন করতে লাগলেন। তিনি গীত নৃত্য বাদ্য ক’রে এবং পুষ্প ফল উপহার দিয়ে প্রাপ্তযৌবনা দেবযানীকে তুষ্ট করতেন। সুগায়ক সুবেশ প্রিয়বাদী রূপবান মালাধারী পুরুষকে নারীরা স্বভাবত কামনা করে, সেজন্য দেবযানীও নির্জন স্থানে কচের কাছে গান গাইতেন এবং তাঁর পরিচর্যা করতেন।
এইরূপে পাঁচ শ বৎসর গত হ’লে দানবরা কচের অভিসন্ধি বুঝতে পারলে। একদিন কচ যখন বনে গরু চরাচ্ছিলেন তখন তারা তাঁর দেহ খণ্ড খণ্ড ক’রে কুকুরকে দিলে। কচ ফিরে এলেন না দেখে দেবযানী বললেন, পিতা, আপনার হোম শেষ হয়েছে, সূর্য অস্ত গেছে, গরুর পালও ফিরেছে, কিন্তু কচকে দেখছি না। নিশ্চয় তিনি হত হয়েছেন। আমি সত্য বলছি, কচ বিনা আমি বাঁচব না। শুক্র তখন সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে আহ্বান করলেন। কচ তখনই কুকুরদের শরীর ভেদ করে হৃষ্টচিত্তে উপস্থিত হলেন এবং দেবযানীকে জানালেন যে দানবরা তাঁকে বধ করেছিল। তার পর আবার একদিন দানবরা কচকে হত্যা করলে এবং শুক্র তাঁকে বাঁচিয়ে দিলেন।
তৃতীয় বারে দানবরা কচকে দগ্ধ ক’রে তাঁর ভস্ম সুরার সঙ্গে মিশিয়ে শুক্রকে খাওয়ালে। কচকে না দেখে দেবযানী বিলাপ করতে লাগলেন। শুক্র বললেন, অসুররা তাকে বার বার বধ করছে, আমরা কি করব। তুমি শোক ক’রো না। দেবযানী সরোদনে বললেন, পিতা, বৃহস্পতিপুত্র ব্রহ্মচারী কর্মদক্ষ কচ আমার প্রিয়, আমি তাঁকেই অনুসরণ করব। তখন শুক্র পূর্বের ন্যায় কচকে আহ্বান করলেন। গুরুর জঠরের ভিতর থেকে কচ বললেন, ভগবান, প্রসন্ন হন, আমি অভিবাদন করছি, আমাকে পুত্র জ্ঞান করুন। অসুররা আমাকে ভস্ম ক’রে সুরার সঙ্গে মিশিয়ে আপনাকে খাইয়েছে। শুক্র দেবযানীকে বললেন, তুমি কিসে সুখী হবে বল, আমার উদর বিদীর্ণ না হ’লে কচকে দেখতে পাবে না, আমি না মরলে কচ বাঁচবে না। দেবযানী বললেন, আপনার আর কচের মৃত্যু দু’হই আমার পক্ষে সমান, আপনাদের কারও মৃত্যু হ’লে আমি বাঁচব না। তখন শুক্র বললেন, বৃহস্পতির পুত্র, তুমি সিদ্ধিলাভ করেছ, দেবযানী তোমাকে স্নেহ করে। যদি তুমি কচরূপী ইন্দ্র না হও তবে আমার সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ কর। বৎস, তুমি পুত্ররূপে আমার উদর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিও, গুরুর নিকট বিদ্যা লাভ ক’রে তোমার যেন ধর্মবুদ্ধি হয়।
শুক্রের দেহ বিদীর্ণ ক’রে কচ বেরিয়ে এলেন এবং নবলব্ধ বিদ্যার দ্বারা তাঁকে পুনর্জীবিত ক’রে বললেন, আপনি বিদ্যাহীন শিষ্যের কর্ণে বিদ্যামৃত দান করেছেন, আপনাকে আমি পিতা ও মাতা জ্ঞান করি। শুক্র গাত্রোত্থান ক’রে সুরাপানের প্রতি এই অভিশাপ দিলেন— যে মন্দমতি ব্রাহ্মণ মোহবশে সুরাপান করবে সে ধর্মহীন ও ব্রহ্মহত্যাকারীর তুল্য পাপী হবে। তার পর দানবগণকে বললেন, তোমরা নির্বোধ, কচ সঞ্জীবনী বিদ্যায় সিদ্ধ হয়ে আমার তুল্য প্রভাবশালী হয়েছেন, তিনি আমার কাছেই বাস করবেন।
সহস্র বৎসর অতীত হ’লে কচ স্বর্গলোকে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। দেবযানী তাঁকে বললেন, অঙ্গিরার পৌত্র, তুমি বিদ্যা কুলশীল তপস্যা ও সংযমে অলঙ্কৃত, তোমার পিতা আমার মাননীয়। তোমার ব্রতপালনকালে আমি তোমার পরিচর্যা করেছি। এখন তোমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে, আমি তোমার প্রতি অনুরক্ত, তুমি আমাকে বিবাহ কর। কচ উত্তর দিলেন, ভদ্রে, তুমি আমার গুরুপুত্রী, তোমার পিতার তুল্যই আমার পূজনীয়, অতএব ও কথা বলো না। দেবযানী বললেন, কচ, তুমি আমার পিতার গুরুপুত্রের পুত্র, আমার পিতার পুত্র নও। তুমিও আমার পূজ্য ও মান্য। অসুররা তোমাকে বার বার বধ করেছিল, তখন থেকে তোমার উপর আমার প্রীতি জন্মেছে। তুমি জান তোমার প্রতি আমার সৌহার্দ্য অনুরাগ আর ভক্তি আছে, তুমি আমাকে বিনা দোষে প্রত্যাখ্যান করতে পার না।
কচ বললেন, দেবযানী, প্রসন্ন হও, তুমি আমার কাছে গুরুরও অধিক। চন্দ্রনিভাননী, তোমার যেখানে উৎপত্তি, শুক্রাচার্য্যের সেই দেহের মধ্যে আমিও বাস করেছি। ধর্মত তুমি আমার ভগিনী, অতএব আর ওরূপ কথা বলো না। তোমাদের গৃহে আমি সুখে বাস করেছি, এখন যাবার অনুমতি দাও, আশীর্বাদ কর যেন পথে আমার মঙ্গল হয়। মধ্যে মধ্যে ধর্মের অবিরোধে (১) আমাকে স্মরণ করো, সাবধানে আমার গুরুদেবের সেবা করো।
দেবযানী বললেন, কচ, যদি আমার প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান কর তবে তোমার বিদ্যা ফলবতী হবে না। কচ উত্তর দিলেন, তুমি আমার গুরুপুত্রী, গুরুও সম্মতি দেন নি, সেজন্যই প্রত্যাখ্যান করছি। আমি ধর্মসঙ্গত কথাই বলেছি, তথাপি তুমি কামের বশে আমাকে অভিশাপ দিলে। তোমার যে কামনা তাও সিদ্ধ হবে না, কোনও ঋষিপুত্র তোমাকে বিবাহ করবেন না। তুমি বলেছ, আমার বিদ্যা নিষ্ফল হবে; তাই হোক। আমি যাকে শিখাব তার বিদ্যা ফলবতী হবে। এই কথা বলে কচ ইন্দ্রলোকে প্রস্থান করলেন।