আদিপর্ব: ১২। দেবযানী, শর্ম্মিষ্ঠা ও যযাতি
কচ ফিরে এলে দেবতারা আনন্দিত হয়ে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখলেন, তার পর ইন্দ্র অসুরগণের বিরুদ্ধে অভিযান করলেন। এক রমণীয় বনে কতকগুলি কন্যা জলকেলি করছে দেখে ইন্দ্র বায়ুর রূপ ধরে তাদের বস্ত্রগুলি মিশিয়ে দিলেন। সেই কন্যাদের মধ্যে অসুরপতি বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা ছিলেন, তিনি ভ্রমক্রমে দেবযানীর বস্ত্র পরলেন।
দেবযানী বললেন, অসুরী, আমার শিষ্যা হয়ে তুই আমার কাপড় নিলি কেন? তুই সদাচারহীনা, তোর ভাল হবে না। শর্মিষ্ঠা বললেন, তোর পিতা বিনীত হয়ে নীচে বসে স্তুতিপাঠকের ন্যায় আমার পিতার স্তব করেন। তুই যাচকের কন্যা, আমি দাতার কন্যা!—
আদ্যস্বস্ব বিদুষ্বস্ব দৄহূ কুপাস্য যাচকি।
অনাস্বাধা সায়ুরধারা রিক্তা ক্ষুদ্যাসি ভিক্ষুকি।
লপ্স্যসে প্রতিবোধারং ন হি ত্বাং গণয়াম্যহম্।। (১)
—যাচকী, যতই বিলাপ কর, গড়াগড়ি দে, বিবাদ কর বা রাগ দেখা, তোর অস্ত্র নেই আমার অস্ত্র আছে। ভিক্ষুকী, তুই নিঃস্ব হয়ে ক্ষোভ করছিস। আমি তোকে গ্রাহ্য করি না, ঝগড়া করবার জন্য তুই নিজের সমান লোক পাবি।
দেবযানী নিজের বস্ত্র নেবার জন্য টানতে লাগলেন, তখন শর্মিষ্ঠা ক্রোধে অধীর হয়ে তাঁকে এক কূপের মধ্যে ঠেলে ফেলে দিলেন এবং ম'রে গেছে মনে ক'রে নিজের ভবনে চ'লে গেলেন। সেই সময়ে মৃগয়ায় শ্রান্ত ও পিপাসিত হয়ে রাজা যযাতি অশ্বারোহণে সেই কূপের কাছে এলেন। তিনি দেখলেন, কূপের মধ্যে অগ্নিশিখার ন্যায় এক কন্যা রয়েছে। রাজা তাঁকে সম্বদ্ধ করাতে দেবযানী নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনাকে সংকুলোদ্ভব শান্ত বীর্যবান দেখছি, আমার দক্ষিণ হস্ত ধ’রে আপনি আমাকে তুলুন। যযাতি দেবযানীকে উদ্ধার ক’রে রাজধানীতে চ’লে গেলেন।
দেবযানীর দাসীর মুখে সংবাদ পেয়ে শুক্র তখনই সেখানে এলেন। তিনি কন্যাকে আলিঙ্গন ক'রে বললেন, বোধ হয় তোমার কোনও পাপ ছিল তারই এই প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। দেবযানী বললেন, প্রায়শ্চিত্ত হ’ক বা না হ’ক, শর্মিষ্ঠা ক্রোধে রক্তচক্ষু হয়ে আমাকে কি বলেছে শুনুন। — তুই স্তুতিকারী যাচকের কন্যা, আর আমি দাতার কন্যা — তোর পিতা যার স্তুতি করেন। পিতা, শর্মিষ্ঠার কথা যদি সত্য হয় তবে তার কাছে নতি স্বীকার করব এই কথা তার সখীকে আমি বলেছি। শুক্র বললেন, তুমি স্তাবক আর যাচকের কন্যা নও, তুমি যাঁর কন্যা তাকেই সকলে স্তব করে, বৃষপর্বা ইন্দ্র আর রাজা যযাতি তা জানেন। যিনি সজ্জন তাঁর পক্ষে নিজের গুণবর্ণনা কষ্টকর, সেজন্য আমি কিছু বলতে চাই না। কন্যা, ওঠ, আমরা ক্ষমা ক’রে নিজের গৃহে যাই, সাধুজনের ক্ষমাই শ্রেষ্ঠ গুণ। ক্ষমার দ্বারা ক্রোধকে যে নিরস্ত করতে পারে সে সর্ব জগৎ জয় করে। দেবযানী বললেন, পিতা, আমি ও সব কথা জানি, কিন্তু পণ্ডিতেরা বলেন নীচ লোকের কাছে অপমানিত হওয়ার চেয়ে মরণ ভাল। অস্ত্রাঘাতে যে ক্ষত হয় তা সারে কিন্তু বাক্ক্ষত সারে না।
তখন শুক্র ক্রুদ্ধ হয়ে দানবরাজ বৃষপর্বার কাছে গিয়ে বললেন, রাজা, পাপের ফল সদ্য দেখা যায় না, কিন্তু যে বার বার পাপ করে সে সমূলে বিনষ্ট হয়। আমার নিষ্পাপ ধর্মজ্ঞ শিষ্য কচকে তুমি বধ করিয়েছিলে, তোমার কন্যা আমার কন্যাকে বহু কটূ কথা ব’লে কূপে ফেলে দিয়েছে। তোমার রাজ্যে আমরা আর বাস করব না। বৃষপর্বা বললেন, যদি আমার প্ররোচনায় কচ নিহত হয়ে থাকে বা দেবযানীকে শর্মিষ্ঠা কটূ কথা ব’লে থাকে, তবে আমার যেন অসদ্গতি হয়। আপনি প্রসন্ন হ’ন, যদি চ’লে যান তবে আমরা সমুদ্রে প্রবেশ করব। শুক্র বললেন, দেবযানী আমার অত্যন্ত প্রিয়, তার দুঃখ আমি সইতে পারি না। তোমরা তাকে প্রসন্ন কর।
বৃষপর্বা সবান্ধবে দেবযানীর কাছে গিয়ে তাঁর পায়ে প’ড়ে বললেন, দেবযানী প্রসন্ন হও, তুমি যা চাইবে তাই দেব। দেবযানী বললেন, সহস্র কন্যার সহিত শর্মিষ্ঠা আমার দাসী হ’ক, পিতা আমার বিবাহ দিলে তারা আমার সঙ্গে যাবে। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্যের রোষ নিবারণের জন্য শর্মিষ্ঠা দাসীত্ব স্বীকার করলেন।
দীর্ঘকাল পরে একদিন বরবর্ণিনী দেবযানী শর্মিষ্ঠা ও সহস্র দাসীর সঙ্গে বনে বিচরণ করছিলেন এমন সময় রাজা যযাতি মৃগের অন্বেষণে পিপাসিত ও শ্রান্ত হয়ে আবার সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন, রত্নভূষিত দিব্য আসনে সুহাসিনী দেবযানী ব’সে আছেন, রূপে অতুলনীয়া স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা আর একটি কন্যা কিঞ্চিৎ নিম্ন আসনে ব’সে দেবযানীর পদসেবা করছেন। যযাতির প্রশ্নের উত্তরে দেবযানী নিজেদের পরিচয় দিলেন। যযাতি বললেন, অসুররাজকন্যা কি ক’রে আপনার দাসী হলেন জানতে আমার কৌতূহল হচ্ছে, এমন সর্বাঙ্গসুন্দরী আমি পূর্বে কখনও দেখি নি। আপনার রূপ এঁর রূপের তুল্য নয়। দেবযানী উত্তর দিলেন, সবই দৈবের বিধানে ঘটে, এঁর দাসীত্বও সেই কারণে হয়েছে। আকার বেশ ও কথাবার্তায় আপনাকে রাজা বোধ হচ্ছে, আপনি কে? যযাতি বললেন, আমি রাজা যযাতি, মৃগয়া করতে এসেছিলাম, এখন অনুমতি দিন ফিরে যাব।
দেবযানী বললেন, শর্মিষ্ঠা আর এই সমস্ত দাসীর সঙ্গে আমি আপনার অধীন হচ্ছি, আপনি আমার ভর্তা ও সখা হ’ন। যযাতি বললেন, সুন্দরী, আমি আপনার যোগ্য নই, আপনার পিতা ক্ষত্রিয় রাজাকে কন্যাদান করবেন না। দেবযানী বললেন, ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় পরস্পরের সংসৃষ্ট, আপনি পূর্বেই আমার পাণিগ্রহণ করেছেন, আমিও আপনাকে বরণ করেছি। দেবযানী তখন তাঁর পিতাকে ডাকিয়ে এনে বললেন, পিতা, এই রাজা যযাতি আমার পাণি গ্রহণ ক’রে কূপ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আপনাকে প্রণাম করছি, এ'র হস্তে আমাকে সম্প্রদান করুন, আমি অন্য পতি বরণ করব না।
শুক্র বললেন, প্রণয় ধর্মের অপেক্ষা রাখে না তাই তুমি যযাতিকে বরণ করেছ। কচের শাপে তোমার স্ববর্ণে বিবাহ হতে পারে না। যযাতি, তোমাকে এই কন্যা দিলাম, এঁকে তোমার মহিষী কর। আমার বরে তোমার বর্ণসংকরজনিত পাপ হবে না। বৃষপর্বার কন্যা এই কুমারী শর্মিষ্ঠাকে তুমি সসম্মানে রেখো, কিন্তু এঁকে শয্যায় ডেকো না।
দেবযানী শর্মিষ্ঠা আর দাসীদের নিয়ে যযাতি তাঁর রাজধানীতে গেলেন। দেবযানীর অনুমতি নিয়ে তিনি অশোক বনের নিকট শর্মিষ্ঠার জন্য পৃথক গৃহ নির্মাণ করিয়ে দিলেন এবং তাঁর অন্নবস্ত্রাদির উপযুক্ত ব্যবস্থা করলেন। সহস্র দাসীও শর্মিষ্ঠার কাছে রইল।
কিছুকাল পরে দেবযানীর একটি পুত্র হ'ল। শর্মিষ্ঠা ভাবলেন আমার পতি নেই, বৃথা যৌবনবতী হয়েছি: আমিও দেবযানীর ন্যায় নিজেই পতি বরণ করব। একদা যযাতি বেড়াতে বেড়াতে অশোক বনে এসে পড়লেন। শর্মিষ্ঠা তাঁকে সম্বর্ধনা ক'রে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, মহারাজ, আমার রূপ কুল শীল আপনি জানেন, আমি প্রার্থনা করছি আমার ঋতুরক্ষা করুন। যযাতি বললেন, তুমি সর্ব বিষয়ে অনিন্দিতা তা আমি জানি, কিন্তু তোমাকে শয্যায় আহ্বান করতে শুক্রাচার্য্যের নিষেধ আছে। শর্মিষ্ঠা বললেন, > ন নর্মযুক্তং বচনং হিনস্তি
> ন স্ত্রীষু রাজন্ ন বিবাহকালে।
> প্রাণাত্যয়ে সর্বধনাপহারে
> পঞ্চানৃতান্যাহুরপাতকানি।।
—মহারাজ, পরিহাসে, স্ত্রীলোকের মনোরঞ্জনে, বিবাহকালে, প্রাণসংশয়ে এবং সর্বস্ব নাশের সম্ভাবনায়, এই পাঁচ অবস্থায় মিথ্যা বললে পাপ হয় না।(১)
যযাতি বললেন, আমি রাজা হয়ে যদি মিথ্যাচরণ করি তবে প্রজারাও আমার অনুসরণ ক'রে মিথ্যাকথনের পাপে বিনষ্ট হবে। শর্মিষ্ঠা বললেন, যিনি সখীর পতি তিনি নিজের পতির তুল্য, দেবযানীকে বিবাহ ক'রে আপনি আমারও পতি হয়েছেন।
পুত্রহীনার পাপ থেকে আমাকে রক্ষা করুন, আপনার প্রসাদে পুত্রবতী হয়ে আমি ধর্মাচরণ করতে চাই। তখন যযাতি শর্মিষ্ঠার প্রার্থনা পূরণ করলেন।