আদিপর্ব: ১৩। যযাতির জরা
শর্মিষ্ঠার দেবকুমারতুল্য একটি পুত্র হ'ল। দেবযানী তাঁকে বললেন, তুমি কামের বশে এ কি পাপ করলে? শর্মিষ্ঠা বললেন, একজন ধর্মাত্মা বেদজ্ঞ ঋষি আমার কাছে এসেছিলেন, তাঁরই বরে আমার পুত্র হয়েছে, আমি অন্যায় কিছু করি নি। দেবযানী প্রশ্ন করলেন, সেই ব্রাহ্মণের নাম গোত্র বংশ কি? শর্মিষ্ঠা বললেন, তিনি তপস্যার তেজে সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান, তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করবার শক্তি আমার ছিল না। দেবযানী বললেন, তুমি যদি বর্ণজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ থেকেই অপত্যলাভ ক'রে থাক তবে আর আমার ক্রোধ নেই। কালক্রমে যদু ও তুর্বসু নামে দেবযানীর দুই পুত্র এবং দ্রুহ্যু, অনু ও পুরু নামে শর্মিষ্ঠার তিন পুত্র হ'ল। একদিন দেবযানী যযাতির সঙ্গে উপবনে বেড়াতে বেড়াতে দেখলেন, দেবকুমারতুল্য কয়েকটি বালক নির্ভয়ে খেলা করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, বৎসগণ, তোমাদের নাম কি, বংশ কি, পিতা কে? বালকরা যযাতি আর শর্মিষ্ঠার দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে বললে, এই আমাদের পিতা মাতা। এই ব'লে তারা রাজার কাছে এল, কিন্তু দেবযানী সঙ্গে থাকায় রাজা তাদের আদর করলেন না, তারা কাঁদতে কাঁদতে শর্মিষ্ঠার কাছে এল। দেবযানী শর্মিষ্ঠাকে বললেন, তুমি আমার অধীন হয়ে অসুর স্বভাবের বশে আমারই অপ্রিয় কার্য করেছ, আমাকে তোমার ভয় নেই। শর্মিষ্ঠা উত্তর দিলেন, আমি ন্যায় আর ধর্ম অনুসারে চলেছি, তোমাকে ভয় করি না। এই রাজর্ষিকে তুমি যখন পতিরূপে বরণ করেছিলে তখন আমিও করেছিলাম। যিনি আমার সখীর পতি, ধর্মানুসারে তিনি আমারও পতি। তখন দেবযানী বললেন, রাজা, তুমি আমার অপ্রিয় কার্য করেছ, আর আমি এখানে থাকব না। এই ব'লে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সাশ্রুলোচনে শুক্রাচার্যের কাছে চললেন, রাজাও পিছু পিছু গেলেন। দেবযানী বললেন, অধর্মের কাছে ধর্ম পরাজিত হয়েছে, যে নীচ সে উপরে উঠেছে, শর্মিষ্ঠা আমাকে অতিক্রম করেছে। পিতা, রাজা যযাতি শর্মিষ্ঠার গর্ভে তিন পুত্র উৎপাদন করেছেন আর দুর্ভাগা আমাকে দুই পুত্র দিয়েছেন। ইনি ধৰ্ম্মজ্ঞ বলে খ্যাত, কিন্তু আমার মর্যাদা লঙ্ঘন করেছেন।
শুক্র ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিলেন, মহারাজ, তুমি ধৰ্ম্মজ্ঞ হয়ে অধৰ্ম্ম করেছ আমার উপদেশ গ্রাহ্য কর নি, অতএব দুর্জ্জয় জরা তোমাকে আক্রমণ করবে। শাপ প্রত্যাহারের জন্য যযাতি বহু অনুনয় করলে শুক্র বললেন, আমি মিথ্যা বলি না, তবে তুমি ইচ্ছা করলে তোমার জরা অন্যকে দিতে পারবে। যযাতি বললেন, আপনি অনুমতি দিন, যে পুত্র আমাকে তার যৌবন দেবে সেই রাজ্য পাবে এবং পুণ্যবান কীৰ্ত্তিমান হবে। শুক্র বললেন, তাই হবে।
যযাতি রাজধানীতে এসে জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুকে বললেন, বৎস, আমি শুক্রের শাপে জরাগ্রস্ত হয়েছি কিন্তু যৌবনভোগে এখনও তৃপ্ত হই নি। আমার জরা নিয়ে তোমার যৌবন আমাকে দাও, সহস্র বৎসর পরে আবার তোমাকে যৌবন দিয়ে নিজের জরা ফিরিয়ে নেব। যদু উত্তর দিলেন, জরায় অনেক কষ্ট, আমি নিরানন্দ শ্বেতশ্মশ্রু, লোলচৰ্ম্ম দুৰ্ব্বলদেহ অকর্ম্মণ্য হয়ে যাব, যুবক সহচররা আমাকে অবজ্ঞা করবে। আমার চেয়ে প্রিয়তর পুত্র আপনার আরও তো আছে, তাদের বলুন। যযাতি বললেন, আত্মজ হয়েও যখন আমার অনুরোধ রাখলে না তখন তোমার সন্তান রাজ্যের অধিকারী হবে না।
তার পর যযাতি একে একে তুৰ্ব্বসু, দ্রুহ্য এবং অনুকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু কেউ জরা নিয়ে যৌবন দিতে সম্মত হলেন না। যযাতি তাঁদের এইরূপ শাপ দিলেন — তুৰ্ব্বসুর বংশলোপ হবে, তিনি অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছ জাতির রাজা হবেন, দ্রুহ্য কখনও অভীষ্ট লাভ করবেন না, তিনি অতি দুর্গম দেশে গিয়ে ভোজ উপাধি নিয়ে বাস করবেন; অনু জরান্বিত হবেন, তাঁর সন্তান যৌবনলাভ করেই মরবে, তিনি অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়াহীন হবেন।
যযাতির কনিষ্ঠ পুত্র পুরু পিতার অনুরোধ শুনে তখনই বললেন, মহারাজ আপনার আজ্ঞা পালন করব, আমার যৌবন নিয়ে অভীষ্ট সুখ ভোগ করুন, আপনার জরা আমি নেব। যযাতি প্রীত হয়ে বললেন, বৎস, তোমার রাজ্যে সকল প্রজা সর্ব বিষয়ে সমৃদ্ধি লাভ করবে।
পুরুর যৌবন পেয়ে যযাতি অভীষ্ট বিষয় ভোগ, প্রজাপালন এবং বহুবিধ ধৰ্ম্মকর্ম্মের অনুষ্ঠান করতে লাগলেন। সহস্র বৎসর অতীত হলে তিনি পুরুকে বললেন, পুত্র, তোমার যৌবন লাভ ক’রে আমি ইচ্ছানুসারে বিষয় ভোগ করেছি।—
ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি।
হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব ভূয় এবাভিবর্দ্ধতে॥
যৎ পৃথিৱ্যাং ব্রীহির্যবং হিরণ্যং পশবঃ স্ত্রিয়ঃ।
একস্যাপি ন পর্যাপ্তং তস্মাৎ তৃষ্ণাং পরিত্যজেৎ॥
— কাম্য বস্তুর উপভোগে কখনও কামনার শান্তি হয় না, ঘৃতসংযোগে অগ্নির ন্যায় আরও বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীতে যত ধান্য যব হিরণ্য পশু ও স্ত্রী আছে তা একজনের পক্ষেও পর্যাপ্ত নয়, অতএব বিষয়তৃষ্ণা ত্যাগ করা উচিত।
তারপর যযাতি বললেন, পুরু, আমি প্রীত হয়েছি, তোমার যৌবন ফিরে নাও, আমার রাজ্যও নাও। তখন ব্রাহ্মণাদি প্রজারা বললেন, মহারাজ, যদু আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, শুক্রের দৌহিত্র এবং দেবযানীর গর্ভজাত, তাঁর পর আরও তিন পুত্র আছেন; এঁদের অতিক্রম ক'রে কনিষ্ঠকে রাজ্য দিতে চান কেন? যযাতি বললেন, যদু প্রভৃতি আমার আজ্ঞা পালন করে নি, পুরু করেছে; শুক্রাচার্য্যের বর অনুসারে আমার অনুগত পুত্রই রাজ্য পাবে। প্রজারা রাজার কথার অনুমোদন করলেন।
পুরুকে রাজ্যে দিয়ে যযাতি বনে বাস করতে লাগলেন এবং কিছুকাল পরে সুরলোকে গেলেন। তিনি ইন্দ্রকে বলেছিলেন, দেবতা মানুষ গন্ধর্ব আর ঋষিদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তপস্যায় আমার সমান। এই আত্মপ্রশংসার ফলে তিনি ইন্দ্রের আজ্ঞায় স্বর্গচ্যুত হলেন। যযাতি ভূতলে না প'ড়ে কিছুকাল অন্তরীক্ষে অষ্টক, প্রতর্দ্দন, বসুমনা ও শিবি এই চারজন রাজর্ষির সঙ্গে বিবিধ ধর্ম্মালাপ করলেন। এঁরা যযাতির দৌহিত্র(১)। অনন্তর যযাতি পুনর্বার স্বর্গলোকে গেলেন।