আদিপর্ব: ১৪। দুষ্মন্ত-শকুন্তলা
পুরুর বংশে দুষ্মন্ত(২) নামে এক বীর্য্যবান রাজা জন্মগ্রহণ করেন, তিনি পৃথিবীর সর্ব প্রদেশ শাসন করতেন। তাঁর দুই পুত্র হয়, লক্ষণার গর্ভে জনমেজয় এবং শকুন্তলার গর্ভে ভরত। ভরতবংশের যশোরাশি বহুবিতত। একদা দুষ্মন্ত প্রভূত সৈন্য ও বাহন নিয়ে গহন বনে মৃগয়া করতে গেলেন। বহু পশু বধ ক'রে তিনি একাকী অপর এক বনে ক্ষুৎপিপাসার্ত ও শ্রান্ত হয়ে উপস্থিত হলেন। এই বন অতি রমণীয়, নানাবিধ কুসুমিত বৃক্ষে সমাকীর্ণ এবং ঝিল্লী ভ্রমর ও কোকিলের রবে মুখরিত। রাজা মালিনী নদীর তীরে কণ্ব মুনির মনোহর আশ্রম দেখতে পেলেন, সেখানে হিংস্র জন্তুরাও শান্তভাবে বিচরণ করছে।
অনুচরদের অপেক্ষা করতে বলে দুষ্মন্ত আশ্রমে প্রবেশ করে দেখলেন, ব্রাহ্মণরা বেদপাঠ এবং বহুবিধ শাস্ত্রের আলোচনা করছেন। মহর্ষি কণ্বকে দেখা না পেয়ে তাঁর কুটিরের নিকটে এসে দুষ্মন্ত উচ্চকণ্ঠে বললেন, এখানে কে আছেন? রাজার বাক্য শুনে লক্ষ্মীর ন্যায় রূপবতী তাপসবেশধারিণী একটি কন্যা বেরিয়ে এলেন এবং দুষ্মন্তকে স্বাগত জানিয়ে আসন পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে সংবর্ধনা করলেন। তারপর মধুর স্বরে কুশলপ্রশ্ন করে বললেন, কি প্রয়োজন বলুন, আমার পিতা ফল আহরণ করতে গেছেন, একটু অপেক্ষা করুন, তিনি শীঘ্রই আসবেন।
এই সুনিতম্বিনী চারুহাসিনী রূপযৌবনবতী কন্যাকে দুষ্মন্ত বললেন, আপনি কে, কার কন্যা, এখানে কোথা থেকে এলেন? কন্যা উত্তর দিলেন, মহারাজ, আমি ভগবান কণ্বের দুহিতা। রাজা বললেন, তিনি তো ঊর্ধ্বরেতা তাপসী, আপনি তাঁর কন্যা কিরূপে হলেন? কন্যা বললেন, ভগবান কণ্ব এক ঋষিকে আমার জন্মবৃত্তান্ত বলেছিলেন, আমি তা শুনেছিলাম। সেই বিবরণ আপনাকে বলছি, শুনুন।—
পূর্বকালে বিশ্বামিত্র ঘোর তপস্যা করছেন দেখে ইন্দ্র ভীত হয়ে মেনকাকে পাঠিয়ে দেন। মেনকা বিশ্বামিত্রের কাছে এসে তাঁকে অভিবাদন করে নৃত্য করতে লাগলেন, সেই সময়ে তাঁর সূক্ষ্ম শুভ্র বসন বায়ু হরণ করলেন। সর্বাঙ্গসুন্দরী বিবস্ত্রা মেনকাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বামিত্র তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। মেনকার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল, তিনি গর্ভবতী হলেন এবং একটি কন্যা প্রসব করেই তাকে মালিনী নদীর তীরে ফেলে ইন্দ্রসভায় চলে গেলেন। সিংহব্যাঘ্রসমাকুল জনহীন বনে সেই শিশুকে পক্ষীরা রক্ষা করতে লাগল। মহর্ষি কণ্ব স্নান করতে গিয়ে শিশুকে দেখতে পেলেন এবং গৃহে এনে তাকে দুহিতার ন্যায় পালন করলেন। শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষী কর্তৃক রক্ষিত সেজন্য তার নাম শকুন্তলা হল। আমিই সেই শকুন্তলা। শরীরদাতা প্রাণদাতা ও অন্নদাতাকে ধর্মশাস্ত্রে পিতা বলা হয়। মহারাজ, আমাকে মহর্ষি কণ্বের দুহিতা বলে জানবেন।
দুষ্মন্ত বললেন, কল্যাণী, তোমার কথায় জানলাম তুমি রাজপুত্রী, তুমি আমার ভার্যা হও। এই সুবর্ণমালা, বিবিধ বস্ত্র, কুণ্ডল, নানাদেশজাত মণিরত্ন, বক্ষের অলঙ্কার এবং মৃগচর্ম তুমি নাও, আমার সমস্ত রাজ্য তোমারই, তুমি আমার ভার্যা হও। তুমি গান্ধর্বরীতিতে আমাকে বিবাহ কর, এইরূপ বিবাহই শ্রেষ্ঠ।
শকুন্তলা বললেন, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমার পিতা ফিরে এলেই আপনার হাতে আমাকে সম্প্রদান করবেন। তিনিই আমার প্রভু ও পরম দেবতা, তাঁকে অমান্য করে অধর্ম্মানুসারে পতিবরণ করতে পারি না। দুষ্মন্ত বললেন, বরবর্ণিনী, ধর্ম্মানুসারে তুমি নিজেই নিজেকে দান করতে পার। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে গান্ধর্ব্ব বা রাক্ষস বিবাহ অথবা এই দুইএর মিশ্রিত রীতিতে বিবাহ ধর্ম্মসঙ্গত, অতএব তুমি গন্ধর্ব্ব বিধানে আমার ভার্য্যা হও। শকুন্তলা বললেন, তাই যদি ধৰ্ম্মসঙ্গত হয় তবে আগে এই অঙ্গীকার করুন যে আমার পুত্র যুবরাজ হবে এবং আপনার পরে এই পুত্রই রাজা হবে।
কিছুমাত্র বিচার না করে দুষ্মন্ত উত্তর দিলেন, তুমি যা বললে তাই হবে। মনস্কাম সিদ্ধ হলে তিনি শকুন্তলাকে বার বার বললেন, সুহাসিনী, আমি চতুরঙ্গিণী সেনা পাঠাব, তারা তোমাকে আমার রাজধানীতে নিয়ে যাবে। এইরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং কণ্ব শুনে কি বলবেন তা ভাবতে ভাবতে দুষ্মন্ত নিজের পুরীতে ফিরে গেলেন।
কণ্ব আশ্রমে ফিরে এলে শকুন্তলা লজ্জায় তাঁর কাছে গেলেন না, কিন্তু মহর্ষি দিব্যদৃষ্টিতে সমস্ত জেনে প্রীত হয়ে বললেন, ভদ্রে, তুমি আমার অনুমতি না নিয়ে আজ যে পুরুষসংসর্গ করেছ তাতে তোমার ধর্ম্মের হানি হয় নি। নির্জ্জনে বিনা মন্ত্রপাঠে সকাম পুরুষের সকামা স্ত্রীর সঙ্গে যে মিলন তাকেই গন্ধর্ব্ব বিবাহ বলে, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে তাই শ্রেষ্ঠ। শকুন্তলা, তোমার পতি দুষ্মন্ত মহাত্মা এবং পুরুষশ্রেষ্ঠ, তোমার যে পুত্র হবে সে সাগরবেষ্টিতা সমগ্র পৃথিবী ভোগ করবে। শকুন্তলা কণ্বের আনীত ফলাদির বোঝা নামিয়ে রেখে তাঁর পা ধুইয়ে দিলেন এবং তাঁর শ্রান্তি দূর হলে বললেন, আমি স্বেচ্ছায় দুষ্মন্তকে পতিত্বে বরণ করেছি, আপনি মন্ত্রিসহ সেই রাজার প্রতি অনুগ্রহ করুন। শকুন্তলার প্রার্থনানুসারে কণ্ব বর দিলেন, পুরুবংশীয়গণ ধর্ম্মিষ্ঠ হবে, কখনও রাজ্যচ্যুত হবে না।
তিন বৎসর পরে (১) শকুন্তলা একটি সুন্দর মহাবলশালী অগ্নিতুল্য দ্যুতিমান পুত্র প্রসব করলেন। এই পুত্র কণ্বের আশ্রমে পালিত হতে লাগল এবং ছয় বৎসর বয়সেই সিংহ ব্যাঘ্র বরাহ মহিষ হস্তী প্রভৃতি ধরে এনে আশ্রমস্থ বৃক্ষে বেঁধে রাখত। সকল জন্তুকেই সে দমন করত সেজন্য আশ্রমবাসীরা তার নাম দিলেন সর্বদমন। তার অসাধারণ বলবিক্রম দেখে কণ্ব বললেন, এর যুবরাজ হবার সময় হয়েছে। তার পর তিনি শিষ্যদের বললেন, নারীরা দীর্ঘকাল পিতৃগৃহে বাস করলে নিন্দা হয়, তাতে সুনাম চরিত্র ও ধর্মও নষ্ট হতে পারে। অতএব তোমরা শীঘ্রই শকুন্তলা আর তার পুত্রকে দুষ্মন্তের কাছে দিয়ে এস।
শকুন্তলাকে রাজভবনে পৌঁছিয়ে দিয়ে শিষ্যরা ফিরে গেলেন। শকুন্তলা দুষ্মন্তের কাছে গিয়ে অভিবাদন করে বললেন, রাজা, এই তোমার পুত্র, আমার গর্ভে জন্মেছে। কণ্বের আশ্রমে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলে তা স্মরণ কর, একে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত কর। পূর্বকথা স্মরণ হলেও রাজা বললেন, আমার কিছু মনে পড়ছে না, দুষ্ট তাপসী, তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমার ধর্ম অর্থ বা কামের কোনও সম্বন্ধ হয় নি, তুমি যাও বা থাক যা বা ইচ্ছা করতে পার।
লজ্জায় ও দুঃখে কেন সংজ্ঞাহীন হয়ে শকুন্তলা স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ হল, ওষ্ঠ কাঁপতে লাগল, ভ্রু কুঁচকে তিনি যেন রাজাকে দগ্ধ করতে লাগলেন। তিনি তাঁর ক্রোধ ও তেজ দমন ক’রে বললেন, মহারাজ, তোমার স্মরণ থাকলেও প্রাকৃত জনের ন্যায় কেন বলছ যে মনে নেই? তুমি সত্য বল, মিথ্যা বলে নিজেকে অপমানিত ক’রো না। আমি তোমার কাছে যাচিকা হয়ে এসেছি, যদি আমার কথা না শোন তবে তোমার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হবে। আমাকে যদি পরিত্যাগ কর তবে আমি আশ্রমে ফিরে যাব, কিন্তু এই বালক তোমার আত্মজ, একে ত্যাগ করতে পার না।
দুষ্মন্ত বললেন, তোমার গর্ভে আমার পুত্র হয়েছিল তা আমার মনে নেই। নারীরা মিথ্যা কথাই বলে থাকে। তোমার জননী মেনকা অসতী ও নির্দয়া, ব্রাহ্মণ্যলোভী তোমার পিতা বিশ্বামিত্র কামুক ও নির্দয়। তুমি নিজেও ভ্রষ্টার ন্যায় কথা বলছ। দুষ্ট তাপসী, দূর হও। শকুন্তলা বললেন, মেনকা দেবতাদের মধ্যে গণ্যা। রাজা, তুমি ভূমিতে চল, আমি অন্তরীক্ষে চলি, ইন্দ্রকুবেরাদির গৃহে যেতে পারি। যে নিজে দুর্জন সে সজ্জনকে দুর্জন বলে, এর চেয়ে হাস্যকর কিছু নেই। যদি তুমি মিথ্যারই অনুরক্ত হও তবে আমি চ’লে যাচ্ছি, তোমার সঙ্গে আমার মিলন সম্ভব হবে না। দুষ্মন্ত, তোমার সাহায্য না পেলেও আমার পুত্র হিমালয়-ভূষিত চতুঃসাগরবেষ্টিত এই পৃথিবীতে রাজত্ব করবে। এই ব’লে শকুন্তলা চলে গেলেন।
তখন দুষ্মন্ত অন্তরীক্ষ থেকে এই দৈববাণী শুনলেন— শকুন্তলা সত্য বলেছেন, তুমিই তাঁর পুত্রের পিতা, তাকে ভরণপোষণ কর, তার নাম ভরত হোক। রাজা হৃষ্ট হয়ে পুরোহিত ও অমাত্যদের বললেন, আপনারা দৈবদূতের কথা শুনেছেন, আমি নিজেও ঐ বালককে পুত্র বলে জানি, কিন্তু যদি কেবল শকুন্তলার কথায় তাকে নিতাম তবে লোকে দোষ দিত। তারপর দুষ্মন্ত তাঁর পুত্র ও ভার্যা শকুন্তলাকে আনন্দিতমনে গ্রহণ করলেন। তিনি শকুন্তলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, দেবী, তোমার সতীত্ব প্রতিপাদনের জন্যই আমি এইরূপ ব্যবহার করেছিলাম, নতুবা লোকে মনে করত তোমার সঙ্গে আমার অসৎ সম্বন্ধ হয়েছিল। এই পুত্রকে রাজ্য দেব তা পূর্বেই স্থির করেছি। প্রিয়ে, তুমি ক্রোধবশে আমাকে যেসব অপ্রিয় কথা বলেছ তা আমি ক্ষমা (১) করলাম।