সভাপর্ব: ১৩। ধৃতরাষ্ট্র-শকুনি-দুর্য্যোধন সংবাদ

হস্তিনাপুরে এসে শকুনি ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, মহারাজ, দুর্যোধন দুর্ভাবনায় পাণ্ডুবর্ণ ও কৃশ হয়ে যাচ্ছে, কোনও শত্রু তার এই শোকের কারণ। আপনি এ বিষয়ে অনুসন্ধান করেন না কেন?

ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে বললেন, পুত্র, তোমার শোকের কারণ কি? মহৎ ঐশ্বর্য আর রাজছত্র তোমাকে আমি দিয়েছি, তোমার ভ্রাতারা আর বন্ধুরা তোমার অহিত করেন না, তুমি উত্তম বসন পরছ, সুমাংস অন্ন খাচ্ছ; উৎকৃষ্ট অশ্ব, মহার্ঘ শয্যা, মনোরমা নারীবৃন্দ, উত্তম বাসগৃহ ও বিহারস্থানও তোমার আছে; তবে তুমি দীনের ন্যায় শোক করছ কেন? দুর্যোধন উত্তর দিলেন, পিতা, আমি কাপদব্যের ন্যায় ভোজন করছি, পরিধান করছি, এবং কালের পরিবর্তন প্রতীক্ষা করে দারুণ ক্রোধ পোষণ করছি। আমাদের শত্রুরা সমৃদ্ধ হচ্ছে, আমরা হীন হয়ে যাচ্ছি, এই কারণেই আমি বিবর্ণ ও কৃশ হচ্ছি। অষ্টাশি হাজার স্নাতক গৃহস্থ এবং তাদের প্রত্যেকের তিনটি দাসী যুধিষ্ঠির পালন করেন। তাঁর ভবনে প্রত্যহ দশ হাজার লোক স্বর্ণপাত্রে উত্তম অন্ন খায়। বহু রাজা তাঁর কাছে কর নিয়ে এসেছিলেন এবং অনেক অশ্ব হস্তী উষ্ট্র স্ত্রী পট্টবস্ত্র কম্বল প্রভৃতি উপহার দিয়েছেন। শত শত ব্রাহ্মণ কর দেবার জন্য এসেছিলেন কিন্তু নিবারিত হয়ে দ্বারদেশেই অপেক্ষা করছিলেন, অবশেষে যুধিষ্ঠিরকে জানিয়ে সভায় প্রবেশ করতে পান। বহু রত্ন-ভূষিত স্বর্ণময় কলস এবং উৎকৃষ্ট শঙ্খ দিয়ে বাসুদেব যুধিষ্ঠিরকে অভিষিক্ত করেছেন, তা দেখে আমার যেন জ্বর এল। প্রত্যহ এক লক্ষ ব্রাহ্মণের ভোজন শেষ হলে একটি শঙ্খ বাজত, তার শব্দ শুনে আমার রোমাঞ্চ হত। যুধিষ্ঠিরের তুল্য ঐশ্বর্য ইন্দ্র যম বরুণ বা কুবেরেরও নেই। পাণ্ডুপুত্রদের সমৃদ্ধি দেখে আমি মনে মনে দগ্ধ হচ্ছি, আমার শান্তি নেই। মহারাজ, আমার এই অক্ষবিৎ মাতুল দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবদের ঐশ্বর্য হরণ করতে চান, আপনি অনুমতি দিন।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, মহাপ্রাজ্ঞ বিদুরের উপদেশে আমি চলি, তাঁর মত নিয়ে কর্তব্য স্থির করব। তিনি দূরদর্শী, ধর্মসঙ্গত ও উভয় পক্ষের হিতকর উপদেশই তিনি দেবেন। দুর্যোধন বললেন, মহারাজ, বিদুর আপনাকে বারণ করবেন, তার ফলে আমি নিশ্চয় মরব, আপনি বিদুরকে নিয়ে সুখে থাকুন। পুত্রের এই আর্ত বাক্য শুনে ধৃতরাষ্ট্র আদেশ দিলেন, শিল্পীরা শীঘ্র একটি মনোরম বিশাল সভা নির্মাণ করুক, তার সহস্র স্তম্ভ ও শত দ্বার থাকবে। তার পর ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, পুত্র, তুমি পৈতৃক রাজ্য পেয়েছ, ভ্রাতাদের জ্যেষ্ঠ ব’লে রাজার পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছ, তবে শোক করছ কেন?

পাণ্ডবসভায় তিনি কিরূপ বিড়ম্বনা আর উপহাস ভোগ করেছিলেন তা জানিয়ে দুর্যোধন বললেন, মহারাজ, যুধিষ্ঠিরের জন্য বিভিন্ন দেশের রাজারা যে উপহার এনেছিলেন তার বিবরণ শুনুন। কাম্বোজরাজ স্বর্ণখচিত মেষলোম-নির্ম্মিত এবং গর্তবাসী প্রাণী ও বিড়ালের লোমনিৰ্ম্মিত আবরণবস্ত্র এবং উত্তম চর্ম্ম দিয়েছেন। ত্রিগর্ত্তরাজ বহুশত অশ্ব, উষ্ট্র ও অশ্বতর দিয়েছেন। শূদ্রেরা কার্পাসিকদেশবাসিনী শতসহস্র তন্বী শ্যামা দীর্ঘকেশী দাসী দিয়েছে। ম্লেচ্ছরাজ ভগদত্ত বহু অশ্ব, লৌহময় অলঙ্কার, এবং হস্তিদন্তের মুষ্টিরদ অসি দিয়েছেন। সিংহল, ত্রিচক্ষু (১), ললাটচক্ষু (১), উষ্ণীষধারী, বস্ত্রহীন, রোমশ, নরখাদক, একপাদ (১), চীন, শক, উড্র, বর্বর, বনবাসী, হারহূণ প্রভৃতি লোকেরা নানা দিক থেকে এসেছিল, তারা বহুকাল দ্বারদেশে অপেক্ষা ক’রে তবে প্রবেশ করতে পেরেছিল। মেরু ও মন্দর পর্ব্বতের মধ্যে শৈলোদা নদীর তীরে যারা থাকে, সেই খস পারদ কুলিন্দ প্রভৃতি জাতি রাশি রাশি পিপীলিক (১) স্বর্ণ এনেছিল, পিপীলিকারা যা ভূমি থেকে তোলে। কিরাত দরদ পারদ বাহ্লীক কেরল অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্রক এবং আরও বহু দেশের লোক নানাবিধ উপহার দিয়েছে। বাসুদেব কৃষ্ণ অর্জ্জুনের সম্মানার্থে চোদ্দ হাজার উৎকৃষ্ট হস্তী দিয়েছেন। দ্রৌপদী প্রত্যহ তস্থ থেকে দেখতেন সভার আগত কুব্জ-বামন পর্য্যন্ত সকলের ভোজন হয়েছে কিনা। কেবল দুই রাষ্ট্রের লোক যুধিষ্ঠিরকে কর দেয় নি — বৈবাহিক সম্বন্ধের জন্য পাঞ্চালগণ এবং সখ্যের জন্য অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয়গণ। রাজসূয় যজ্ঞ ক’রে যুধিষ্ঠির হরিশ্চন্দ্রের ন্যায় সমৃদ্ধিলাভ করেছেন, তা দেখে আমার আর জীবনধারণের প্রয়োজন কি?

(১) মেগাস্থেনিসের ভারতবিবরণে এই সকলের উল্লেখ আছে।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, পুত্র, যুধিষ্ঠির তোমার প্রতি বিদ্বেষ করে না, তার যেমন অর্থবল ও মিত্রবল আছে তোমারও তেমন আছে। তোমার আর পাণ্ডবদের একই পিতামহ। ভ্রাতার সম্পত্তি কেন হরণ করতে ইচ্ছা কর? যদি যজ্ঞ ক’রে ঐশ্বর্য্য লাভ করতে চাও তবে ঋত্বিকরা তার আয়োজন করুন। তুমি যজ্ঞে ধনদান কর, কাম্যবস্তু ভোগ কর, স্ত্রীদের সঙ্গে বিহার কর, কিন্তু অধর্ম্ম থেকে নিবৃত্ত হও।

দুৰ্য্যোধন বলিলেন, যার নিজের বুদ্ধি নেই, কেবল বহু শাস্ত্র শুনেছে, সে শাস্ত্রার্থ বোঝে না, দৰ্বী (হাতা) যেমন সূপের (ডালের) স্বাদ বোঝে না। আপনি পরের বুদ্ধিতে চলে আমাকে ভোলাচ্ছেন কেন? বৃহস্পতি বলেছেন, রাজার আচরণ সাধারণের আচরণ থেকে ভিন্ন, রাজা সৰ্ব্বথা স্বাৰ্থচিন্তা করবেন। মহারাজ, জয়লাভ করাইবেন বৃত্তি, ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম বিচারের প্রয়োজন নেই। অমুক শত্রু, অমুক মিত্র, এরূপ কোনও লেখা প্রমাণ নাই, চিহ্নও নেই; যে লোক সন্তাপের কারণ সেই শত্রু। জাতি অনুসারে কেউ শত্রু হয় না, বৃত্তি সমান হলেই শত্রুতা হয়।

শকুনি বললেন, যুধিষ্ঠিরের যে সমৃদ্ধি দেখে তুমি সন্তপ্ত হচ্ছ তা আমি দ্যূতক্রীড়ায় হরণ করব, তাকে আহ্বান কর। আমি সদক্ষ দ্যূতজ্ঞ, সেনার সঙ্ঘর্ষ না হয়ে পাশা খেলেই অজ্ঞ পাণ্ডবদের জয় করব তাতে সন্দেহ নেই। পণই আমার ধনু, অক্ষই আমার বাণ, ক্ষেপণের দক্ষতাই আমার ধনুৰ্ব্বেদ, আসনই আমার রথ। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, আমি মহাত্মা বিদুরের মতে চলে থাকি, তাঁর সঙ্গে কথা ব’লে কৰ্ত্তব্য স্থির করব। পথে, প্রবলের সঙ্গে কলহ করা আমার মত নয়, কলহ অলোহময় অস্ত্রস্বরূপ, তাতে বিপদ উৎপন্ন হয়। দুৰ্য্যোধন বললেন, বিদুর আপনার বুদ্ধিনাশ করবেন তাতে সন্দেহ নেই, তিনি পাণ্ডবদের হিত কেমন চান তেমন আমাদের চান না। প্রাচীন কালের লোকেরাও দ্যূতক্রীড়া করেছেন, তাতে বিপদ বা যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই। দৈব যেমন আমাদের, তেমন পাণ্ডবদেরও সহায় হ’তে পারেন। আপনি মাতুল শকুনির বাক্যে সম্মত হয়ে পাণ্ডবদের দ্যূতসভায় আনবার জন্য আজ্ঞা দিন।

ধৃতরাষ্ট্র অবশেষে অনিচ্ছায় সম্মতি দিলেন এবং সংবাদ নিয়ে জানলেন যে দ্যূতসভানির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে। তখন তিনি তাঁর মুখ্য মন্ত্রী বিদুরকে বললেন, তুমি শীঘ্র গিয়ে যুধিষ্ঠিরকে ডেকে আন, তিনি ভ্রাতাদের সঙ্গে এসে আমাদের সভা দেখুন এবং সুহৃদভাবে দ্যূতক্রীড়া করুন। বিদুর বললেন, মহারাজ, আপনার আদেশে প্রশংসা করতে পারি না, দ্যূতের ফলে বংশনাশ হবে, পুত্রদের সঙ্গে কলহ হবে। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, বিদুর, দৈব যদি প্রতিকূল না হয় তবে কলহ আমাকে দঃখ দিতে পারবে না, বিধাতা সৰ্ব্বজগৎ দৈবের বশে রেখেছেন। তুমি আমার আজ্ঞা পালন কর।