সভাপর্ব: ১৪। যুধিষ্ঠিরাদির দ্যূতসভায় আগমন
১৪। যুধিষ্ঠিরাদির দ্যুতসভায় আগমন
ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে বিদুর ইন্দ্রপ্রস্থে গেলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ক্ষত্তা (১), মনে হচ্ছে আপনার মনে সুখ নেই, আপনি কুশলে এসেছেন তো? বৃষ্ণি রাজার পুত্র ও প্রজারা কুশলে আছে তো? কুশল জ্ঞাপনের পর বিদুর বললেন, রাজা যুধিষ্ঠির, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র তোমাকে এই বলেছেন—তোমার ভ্রাতারা এখানে যে সভা নির্মাণ করেছেন তা তোমাদের সভারই তুল্য, এসে দেখে যাও। তুমি তোমার ভ্রাতাদের সঙ্গে এখানে এসে সহৃদ্ভাবে দ্যুতক্রীড়া কর, আমোদ কর। তোমরা এলে আমরা সকলেই আনন্দিত হব।
যুধিষ্ঠির বললেন, দ্যুত থেকে কলহ উৎপন্ন হয়, বুদ্ধিমান ব্যক্তির তা রুচিকর নয়। আপনার কি মত? বিদুর বললেন, আমি জানি যে দ্যুত অনর্থের মূল, তার নিবারণের চেষ্টাও আমি করেছিলাম, তথাপি ধৃতরাষ্ট্র আমাকে পাঠিয়েছেন। যুধিষ্ঠির, তুমি বিদ্বান, যা শ্রেয় তাই কর। যুধিষ্ঠির বললেন, শকুনির সঙ্গে খেলতে আমার ইচ্ছা নেই, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র যখন ডেকেছেন তখন আমি নিবৃত্ত হতে পারি না।
পরদিন যুধিষ্ঠির দ্রৌপদী, ভ্রাতৃগণ ও পরিজনদের নিয়ে হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ কৃপ দুর্যোধন শল্য শকুনি প্রভৃতির সঙ্গে দেখা করে ধৃতরাষ্ট্রের গৃহে গেলেন। গান্ধারী তাঁকে আশীর্বাদ করলেন, ধৃতরাষ্ট্রও পাণ্ডবদের মস্তকাঘ্রাণ করলেন। দ্রৌপদীর অত্যুজ্জ্বল বেশভূষা দেখে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রবধূরা বিশেষ সন্তুষ্ট হলেন না। পাণ্ডবগণ সুখে রাত্রিযাপন করে পরদিন প্রাতঃকৃত্যের পর দ্যুতসভায় প্রবেশ করলেন।
শকুনি বললেন, রাজা যুধিষ্ঠির, সভায় সকলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন, এখন খেলা আরম্ভ হোক। যুধিষ্ঠির বললেন, দ্যুতক্রীড়া শঠতাময় ও পাপজনক, তাতে ক্ষত্রোচিত পরাক্রম নেই, নীতিসংগতও নয়। শঠতায় গৌরব নেই, শকুনি, আপনি অন্যায়ভাবে আমাদের জয় করবেন না। শকুনি বললেন, যে পূর্বেই জানে পাশা ফেললে কোন্ সংখ্যা পড়বে, যে শঠতার প্রণালী বোঝে, এবং যে অক্ষ-ক্রীড়ায় নিপুণ সে সমস্তই সইতে পারে। যুধিষ্ঠির, নিপুণ দ্যূতকরের হাতে বিপক্ষের পরাজয় হয়, সে কারণে আমাদেরই পরাজয়ের আশঙ্কা আছে, তথাপি আমরা খেলব। যুধিষ্ঠির বললেন, আমি শঠতার দ্বারা সুখ বা ধন লাভ করতে চাই না, ধূর্ত দ্যূতকারের শঠতা প্রশংসনীয় নয়। শকুনি বললেন, যুধিষ্ঠির, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ও বিদ্বানরাও শঠতার দ্বারা পরস্পরকে জয় করতে চেষ্টা করেন, এপ্রকার শঠতা নিন্দনীয় নয়। তবে তোমার যদি আপত্তি বা ভয় থাকে তবে খেলো না। যুধিষ্ঠির বললেন, আহ্বান করলে আমি নিবৃত্ত হই না, এই আমার ব্রত। এই সভায় কার সঙ্গে আমার খেলা হবে? পণ কে দেবে? দুর্যোধন উত্তর দিলেন, মহারাজ, আমিই পণের জন্য ধনরত্ন দেব, আমার মাতুল শকুনি আমার হয়ে খেলবেন। যুধিষ্ঠির বললেন, একজনের পরিবর্তে অন্যের খেলা রীতিবিরুদ্ধ মনে করি। যাই হ’ক, যা ভাল বোঝ তাই কর।
১৫। দ্যূতক্রীড়া এই সময়ে ধৃতরাষ্ট্র এবং তাঁর পশ্চাতে অপ্রসন্নমনে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ ও বিদুর সভায় এসে আসন গ্রহণ করলেন। তার পর খেলা আরম্ভ হ’ল। যুধিষ্ঠির বললেন, রাজা দুর্যোধন, সাগরের আবর্ত থেকে উৎপন্ন এই মহামূল্য মণি যা আমার স্বর্ণহারে আছে তাই আমার পণ। তোমার পণ কি? দুর্যোধন উত্তর দিলেন, আমার অনেক মণি আর ধন আছে, সে সমস্তই আমার পণ। তখন শকুনি তাঁর পাশা ফেললেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বললেন, এই জিতলাম।
যুধিষ্ঠির বললেন, শকুনি, আপনি কপট ক্রীড়ায় আমার পণ জিতে নিলেন। যাই হ’ক, সহস্র সুবর্ণে পূর্ণ আমার অনেক মঞ্জুষা আছে, এবারে তাই আমার পণ। শকুনি পুনর্বার পাশা ফেলে বললেন, জিতেছি। তার পর যুধিষ্ঠির বললেন, সহস্র রথের সমমূল্য ব্যাঘ্রচর্মাবৃত কিঙ্কিণীজালমণ্ডিত সর্ব উপকরণ সমেত ওই উত্তম রথ যাতে আমি এখানে এসেছি, এবং তার কুমুদসদৃশ আটটি অশ্ব আমার পণ। এই কথা শুনেই শকুনি পূর্ববৎ শঠতা অবলম্বন ক’রে পাশা ফেলে বললেন, জিতেছি।
তার পর যুধিষ্ঠির পর পর এইসকল পণ রাখলেন। — সালংকারা নৃত্য-গীতাদিনিপুণা এক লক্ষ তরুণী দাসী; কর্মকুশল উষ্ণীষকুণ্ডলধারী স্নাতকব্রতী এক লক্ষ যুবক দাস; এক হাজার উত্তম হস্তী; স্বর্ণধ্বজ ও পতাকায় শোভিত এক হাজার রথ যার প্রত্যেক রথী যুদ্ধকালে এবং অন্য কালেও সহস্র মুদ্রা মাসিক বেতন পান; গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ অর্জুনকে যেসকল বিচিত্রবর্ণ অশ্ব দিয়েছিলেন; দশ হাজার রথ ও দশ হাজার শকট; ষাট হাজার বিশালবক্ষা বীর সৈনিক যারা দুগ্ধ পান করে এবং শালিতণ্ডুলের অন্ন খায়; স্বর্ণমুদ্রায় পূর্ণ চার শত ধনভাণ্ড। এ সমস্তই শকুনি শঠতার দ্বারা জয় করলেন।