সভাপর্ব: ১৫। দ্যূতক্রীড়া

দ্যূতক্রীড়ায় এইরূপে যুধিষ্ঠিরের সর্বনাশ হচ্ছে দেখে বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, মহারাজ, মুমূর্ষু ব্যক্তির ঔষধে রুচি হয় না, আমার বাক্যও হয়তো আপনার অপ্রিয় হবে, তথাপি বলছি শুনুন। এই দুর্যোধন জন্মগ্রহণ ক’রেই শৃগালের ন্যায় রব করেছিল, এ ভরতবংশ ধ্বংস করবে। আপনি জানেন যে অন্ধক যাদব আর ভোজবংশীয়গণ তাঁদেরই আত্মীয় কংসকে ত্যাগ করেছিলেন, এবং তাঁদেরই নিয়োগে কৃষ্ণ কংসকে বধ করেছিলেন। আপনি আদেশ দিন, সব্যসাচী অর্জুন দুর্যোধনকে বধ করবেন, এই পাপী নিহত হ’লে কৌরবগণ সুখী হবে। আপনি শৃগালতুল্য দুর্যোধনের বিনিময়ে শার্দূলতুল্য পাণ্ডবগণকে ক্রয় করুন। কুলরক্ষার প্রয়োজনে যদি একজনকে ত্যাগ করতে হয় তবে তাই করা উচিত; গ্রামরক্ষার জন্য কুল, জনপদ রক্ষার জন্য গ্রাম এবং আত্মরক্ষার জন্য পৃথিবীও ত্যাগ করা উচিত। দ্যূত থেকে কলহ ভেদ ও দারুণ শত্রুতা হয়, দুর্যোধন তাই সৃষ্টি করছে। মত্ত বৃষ যেমন নিজের শৃঙ্গ ভগ্ন করে, দুর্যোধন তেমন নিজের রাজা থেকে মঙ্গল দূর করছে। মহারাজ, দুর্যোধনের ভয়ে আপনার খুব আনন্দ হচ্ছে, কিন্তু এ থেকেই যুদ্ধ আর সৌভ্রাত্র বিনাশ হবে। ধনের প্রতি আপনার আকর্ষণ আছে এবং তার জন্য আপনি মন্ত্রণা করেছেন তা জানি। এখন আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে এই যে কলহ সৃষ্ট হ’ল এতে আমাদের মত নেই। হে প্রতীপ ও শান্তনুর বংশধরগণ, তোমরা আমার হিতবাক্য শোন, ঘোর অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়েছে, নির্বোধের অনুসরণ করে তাতে প্রবেশ করো না। এই অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির, বৃকোদর, সব্যসাচী এবং নকুল-সহদেব যখন ক্রোধ সংবরণ করতে পারবেন না তখন তুমুল যুদ্ধসাগরে দ্বীপ রূপে কোন্ পুরুষকে আশ্রয় করবে? এই পার্বতদেশবাসী শকুনি কপটদ্যুতে পটু তা আমরা জানি, ও যেখান থেকে এসেছে সেখানেই চ’লে যাক, পাণ্ডবদের সঙ্গে তোমরা যুদ্ধ ক’রো না।

দুর্যোধন বললেন, ক্ষত্তা, আপনি সর্বদাই আমাদের নিন্দা আর মূর্খ ভেবে অবজ্ঞা করেন। আপনি নির্লজ্জ, যা ইচ্ছা তাই বলছেন। নিজেকে কর্তা ভাববেন না, আমার কিসে হিত হবে তা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি না। আমরা অনেক সয়েছি, আমাদের উত্তপ্ত করবেন না। একজনেরই শাসনকর্তা আছেন, দ্বিতীয় নেই; যিনি গর্ভস্থ শিশুকে শাসন করেন তিনিই আমার শাসক; তাঁর প্রেরণায় আমি জলস্রোতের ন্যায় চালিত হচ্ছি। তিনি পর্বত ও ভূমি বিদীর্ণ করেন তাঁর বুদ্ধিই মানুষের কার্য নিয়ন্ত্রিত করে। বলপূর্বক অন্যকে শাসন করতে গেলেই শত্রু সৃষ্টি হয়। যে লোক শত্রুর দলভুক্ত তাকে গৃহে বাস করতে দেওয়া অনুচিত। বিদুর, আপনি যেখানে ইচ্ছা চলে যান।

বিদুর বললেন, রাজপুত্র, ষাট বৎসরের পতি যেমন কুমারীর কাম্য নয়, আমিও সেইরূপ তোমার অপ্রিয়। এর পরে যদি হিতাহিত সকল বিষয়ে নিজের মনোমত মন্ত্রণা চাও তবে স্ত্রী জড় পঙ্গু ও মূঢ়দের জিজ্ঞাসা করো। প্রিয়ভাষী পাপী লোক অনেক আছে কিন্তু অপ্রিয় হিতবাক্যের বক্তা আর শ্রোতা দু’ই দুর্লভ। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, আমি সর্বদা বিচিত্রবীর্যের বংশধরদের যশ ও ধন কামনা করি। যা হবার তা হবে, আপনাকে নমস্কার করি, ব্রাহ্মণেরা আমাকে আশীর্বাদ করুন।

শকুনি বললেন, যুধিষ্ঠির, তুমি পাণ্ডবদের বহু সম্পত্তি হেরেছ, আর যদি কিছু থাকে তো বল। যুধিষ্ঠির বললেন, সুবলনন্দন, আমার ধন অসংখ্য, তাই নিয়ে আমি খেলব। এই বলে তিনি পণ করলেন — অসংখ্য অশ্ব গো ছাগ মেষ এবং পর্ণাশা ও সিন্ধু নদীর পূর্বপারের সমস্ত সম্পত্তি; নগর, জনপদ, ব্রহ্মস্ব ভিন্ন সমস্ত ধন ও ভূমি, ব্রাহ্মণ ভিন্ন সমস্ত পুরুষ। শকুনি সবই জিতে নিলেন। তখন যুধিষ্ঠির রাজপুত্রগণের কুণ্ডলাদি ভূষণ পণ করলেন এবং তাও হারলেন। তার পর তিনি বললেন, এই শ্যামবর্ণ লোহিতাক্ষ সিংহস্কন্ধ মহাবাহু যুবা নকুল আমার পণ। শকুনি নকুলকে এবং তার পর সহদেবকেও জয় করে বললেন, যুধিষ্ঠির, তোমার প্রিয় দুই মাদ্রীপুত্রকে আমি জিতেছি, বোধ হয় ভীম আর অর্জুন তোমার আরও প্রিয়।

যুধিষ্ঠির বললেন, মূঢ়, তুমি আমাদের মধ্যে ভেদ জন্মাতে চাচ্ছ। শকুনি বললেন, মত্ত লোক গর্তে পড়ে, প্রমত্ত লোক বহুভাষী হয়। তুমি রাজা এবং বয়সে বড়, তোমাকে নমস্কার করি। লোকে জুয়াখেলার সময় অনেক উৎকট কথা বলে (১)।

(১) অর্থাৎ আমার কথায় রাগ ক’রো না।

যুধিষ্ঠির বললেন, শকুনি, যিনি যুদ্ধে নৌকার ন্যায় আমাদের পার করেন, যিনি শত্রুঞ্জয়ী ও বলিষ্ঠ, পণের অযোগ্য সেই রাজপুত্র অর্জুনকে পণ রাখছি। শকুনি পাশা ফেলে বললেন, জিতেছি। যুধিষ্ঠির বললেন, বজ্রধারী ইন্দ্রের ন্যায় যিনি যুদ্ধে আমাদের নেতা, যিনি তির্যক্‌প্রেক্ষী (২) সিংহস্কন্ধ ক্রুদ্ধস্বভাব, যার তুল্য বলবান কেউ নেই, পণের অযোগ্য সেই ভীমসেনকে পণ রাখছি। শকুনি পাশা ফেলে বললেন, জিতেছি। অবশেষে যুধিষ্ঠির নিজেকেই পণ রাখলেন এবং হারলেন।

(২) যার চক্ষু বা দৃষ্টি বাঁকা।

শকুনি বললেন, রাজা, কিছু ধন অবশিষ্ট থাকতে তুমি নিজেকে পণ রেখে হারলে, এতে পাপ হয়। তোমার প্রিয়া পাঞ্চালী এখনও বিজিত হন নি, তাঁকে পণ রেখে নিজেকে মুক্ত কর। যুধিষ্ঠির বললেন, যিনি অতিখর্বা বা অতি-কৃশা নন, কৃষ্ণা বা রক্তবর্ণা নন, যিনি কৃষ্ণকুঞ্চিতকেশী, পদ্মপলাশাক্ষী, পদ্মগন্ধা, রূপে লক্ষ্মীসমা, সর্বগুণান্বিতা, প্রিয়ংবদা, সেই দ্রৌপদীকে পণ রাখছি।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের এই কথা শুনে সভা বিক্ষুব্ধ হ’ল, বৃদ্ধগণ ধিক ধিক বললেন, ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতি ঘর্মাক্ত হলেন, বিদুর মাথায় হাত দিয়ে মোহগ্রস্তের ন্যায় অধোবদনে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্র মনোভাব গোপন করতে পারলেন না, হৃষ্ট হয়ে বার বার জিজ্ঞাসা করলেন, কি জিতলে, কি জিতলে? কর্ণ দুঃশাসন প্রভৃতি আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন, অন্যান্য সদস্যগণের চক্ষু থেকে অশ্রুপাত হ’ল। শকুনি পাশা ফেলে বললেন, জিতেছি।

দুর্যোধন বিদুরকে বললেন, পাণ্ডবপ্রিয়া দ্রৌপদীকে নিয়ে আসুন, সেই অপুণ্যশীলা অন্য দাসীদের সঙ্গে গৃহমার্জনা করুক। বিদুর বললেন, তোমার মতন লোকেই এমন কথা বলতে পারে। কৃষ্ণা দাসী হ’তে পারেন না, কারণ তাঁকে পণ রাখবার সময় যুধিষ্ঠিরের স্বামিত্ব ছিল না। মূর্খ, মহাবিষ ক্রুদ্ধ সর্প তোমার মাথার উপর রয়েছে, তাদের আরও কুপিত ক’রো না, যমালয়ে যেয়ো না। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র নরকের ভয়ংকর দ্বারে উপস্থিত হয়েও তা বুঝছে না, দুঃশাসন প্রভৃতিও তার অনুসরণ করছে।