বনপর্ব: ৭। দ্রৌপদী-যুধিষ্ঠিরের বাদানুবাদ

একদিন সায়াহ্ন কালে পাণ্ডবগণ ও দ্রৌপদী কথোপকথন করছিলেন। দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, তুমি যখন মৃগচর্ম প'রে বনবাসের জন্য যাত্রা করেছিলে তখন দুরাত্মা দুৰ্য্যোধন দুঃশাসন কৰ্ণ আর শকুনি ছাড়া সকলেই অশ্রুপাত করেছিলেন। পূর্ব্বে তুমি সূক্ষ্ম কৌষেয় বস্ত্র পরতে, এখন তোমাকে চীরধারী দেখছি। কুণ্ডলধারী সূপকারগণ সযত্নে মিষ্টান্ন প্রস্তুত ক'রে তোমাদের খাওয়াত, এখন তোমরা বন্যজাত খাদ্যে জীবনধারণ করছ। বনবাসী ভীমসেনের দুঃখ দেখে কি তোমার ক্রোধবৃদ্ধি হয় না? বৃকোদর একাই সমস্ত কৌরবদের বধ করতে পারেন, কেবল তোমার জন্যই কষ্ট সইছেন। পুরুষব্যাঘ্র অর্জ্জুন আর নকুল-সহদেবের দুৰ্দ্দশা দেখেও কি তুমি শত্রুদের ক্ষমা করবে? দ্রুপদের কন্যা, মহাত্মা পাণ্ডুর পুত্রবধূ, ধৃষ্টদ্যুম্নের ভগিনী, পতিব্রতা বীরপত্নী আমাকে বনবাসিনী দেখেও কি তুমি সয়ে থাকবে? লোকে বলে, ক্রোধশূন্য ক্ষত্রিয় নেই, কিন্তু তোমাতে তার ব্যতিক্রম দেখছি। যে ক্ষত্রিয় যথাকালে তেজ দেখায় না তাকে সকলেই অবজ্ঞা করে। প্রাচীন ইতিহাসে আছে, একদিন বলি তাঁর পিতামহ মহাপ্রাজ্ঞ অসুরপতি প্রহ্লাদকে প্রশ্ন করেছিলেন ক্ষমা ভাল না তেজ ভাল? প্রহ্লাদ উত্তর দিলেন, বৎস, সর্ব্বদা তেজ ভাল নয়, সর্ব্বদা ক্ষমাও ভাল নয়। যে সর্ব্বদা ক্ষমা করে তার বহু ক্ষতি হয়, ভৃত্য শত্রু ও নিরপেক্ষ লোকেও তাকে অবজ্ঞা করে এবং কটুবাক্য বলে। আবার যারা কখনও ক্ষমা করে না তাদেরও বহু দোষ। যে লোক ক্রোধবশে স্থানে অস্থানে দণ্ডবিধান করে তার অর্থহানি সন্তাপ মোহ ও শত্রুলাভ হয়। অতএব যথাকালে মৃদু হবে এবং যথাকালে কঠোর হবে। যে পূর্ব্বে তোমার উপকার করেছে সে গুরুতর অপরাধ করলেও তাকে ক্ষমা করবে। যে না বুঝে অপরাধ করে সেও ক্ষমার যোগ্য, কারণ সকলেই পণ্ডিত নয়। কিন্তু যারা সজ্ঞানে অপরাধ ক'রে বলে যে না বুঝে করেছি, সেই কুটিল লোকদের অল্প অপরাধেও দণ্ড দেবে। সকলেরই প্রথম অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয় অপরাধ অল্প হলেও দণ্ডনীয়। মহারাজ, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা লোভী ও সর্বদা অপরাধী; তারা কোনও কালে ক্ষমার যোগ্য নয়, তাদের প্রতি তেজ প্রকাশ করাই তোমার কর্তব্য। যুধিষ্ঠির বললেন, দ্রৌপদী, তুমি মহাপ্রজ্ঞাবতী, জেনে রাখ যে ক্রোধ থেকে শুভাশুভ দুইই হয়। ক্রোধ সয়ে থাকলে মঙ্গল হয়। ক্রুদ্ধ লোকে পাপ করে, গুরুহত্যাও করে। তাদের অকার্য্য কিছুই নেই, তারা অবধ্যকে বধ করে, বধ্যকে পূজা করে। এই সমস্ত বিবেচনা করে আমার ক্রোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অপরের ক্রোধ দেখলেও যে ক্রুদ্ধ হয় না সে নিজেকে এবং অপরকেও মহাভয় থেকে ত্রাণ করে। ক্রোধ উৎপন্ন হলে যিনি প্রজ্ঞার দ্বারা রোধ করতে পারেন, পণ্ডিতেরা তাকেই তেজস্বী মনে করেন। মূর্খরাই সর্বদা ক্রোধকে তেজ মনে করে, মানুষের বিনাশের জন্যই রজোগুণজাত ক্রোধের উৎপত্তি। ভীষ্ম কৃষ্ণ দ্রোণ বিদুর কৃপ সঞ্জয় ও পিতামহ ব্যাস সর্বদাই শমগুণের কথা বলেন। এঁরা ধৃতরাষ্ট্রকে শান্তির উপদেশ দিলে তিনি অবশ্যই আমাকে রাজা ফিরিয়ে দেবেন, যদি লোভের বশে না দেন তবে বিনষ্ট হবেন। দ্রৌপদী বললেন, ধাতা আর বিধাতাকে নমস্কার, যাঁরা তোমার মোহ সৃষ্টি করেছেন, তার ফলে পিতৃপিতামহের বৃত্তি ত্যাগ করে তোমার মতি অন্য দিকে গেছে। জগতে কেউ ধর্ম অনিষ্ঠুরতা ক্ষমা সরলতা ও দয়ার দ্বারা লক্ষ্যলাভ করতে পারে না। তুমি বহুপ্রকার মহাযজ্ঞ করেছ তথাপি বিপরীত বুদ্ধির বশে দ্যূতক্রীড়ায় রাজ্য ধন ভ্রাতৃগণ আর আমাকেও হারিয়েছ। তুমি সরল মৃদুস্বভাব বদান্য লজ্জাশীল সত্যবাদী, তথাপি দ্যূতব্যসনে তোমার মতি হল কেন? বিধাতাই পূর্বজন্মের কর্ম অনুসারে প্রাণিগণের সুখদুঃখ বিধান করেন। কাষ্ঠময় পুত্তলিকা যেমন অঙ্গচালনা করে সেইরূপ সকল মনুষ্য বিধাতার নির্দেশেই ক্রিয়া করে। যেমন সূত্রে গ্রথিত মণি, নাসাবদ্ধ বৃষ, স্রোতে পতিত বৃক্ষ, সেইরূপ মানুষও স্বাধীনতাহীন, তাকে বিধাতার বিধানেই চলতে হয়। সর্বভূতে ব্যাপ্ত হয়ে ঈশ্বরই পাপপুণ্য করাচ্ছেন তা কেউ লক্ষ্য করে না। মানুষ যেমন অচেতন নিশ্চেষ্ট কাষ্ঠ-পাষাণ-লৌহ দ্বারাই তদ্রূপ পদার্থ ছিন্ন করে, ঈশ্বর সেইরূপ জীব দ্বারাই জীবহিংসা করেন। মহারাজ, বিধাতা প্রাণিগণকে মাতা-পিতার দৃষ্টিতে দেখেন না, তিনি রুষ্ট ইতর জনের ন্যায় ব্যবহার করেন। তোমার বিপদ আর দুর্যোধনের সমৃদ্ধি দেখে আমি বিধাতারই নিন্দা করছি যিনি এই বিষম ব্যবস্থা করেছেন। যদি লোকে পাপকর্মের ফলভোগ করে তবে ঈশ্বরও সেই পাপকর্মে লিপ্ত। আর, যদি কেউ পাপ ক'রেও ফলভোগ না করে তবে তার কারণ — সে বলবান। দুর্ব্বল লোকের জন্যই আমার শোক হচ্ছে।

যুধিষ্ঠির বললেন, যাজ্ঞসেনী, তোমার কথা সুন্দর, আশ্চর্য ও মনোহর, কিন্তু নাস্তিকের যোগ্য। আমি ধর্মের ফল অন্বেষণ করি না, দাতব্য বলেই দান করি, যজ্ঞ করা উচিত বলেই যজ্ঞ করি। ফলের আকাঙ্ক্ষা না করেই আমি যথাশক্তি গৃহাশ্রমবাসীর কর্তব্য পালন করি। যে লোক ধর্মকে দোহন করে ফল পেতে চায় এবং নাস্তিক বুদ্ধিতে যে লোক ফললাভ হবে কি হবে না এই আশঙ্কা করে, সে ধর্মের ফল পায় না। দ্রৌপদী, তুমি মাত্রা ছাড়িয়ে তর্ক করছ। ধর্মের প্রতি সন্দেহ ক'রো না, তাতে তির্য্যগতি লাভ হয়। কল্যাণী, তুমি মৃঢ় বুদ্ধির বশে বিধাতার নিন্দা ক'রো না, সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী ঋষিগণ যার কথা বলেছেন, শিষ্টজন যার আচরণ করছেন, সেই ধর্মের সম্বন্ধে সংশয়াপন্ন হয়ো না।

দ্রৌপদী বললেন, আমি ধর্মের বা ঈশ্বরের নিন্দা করি না, দুঃখার্ত হয়েই অধিক কথা বলে ফেলেছি। আরও কিছু বলছি, তুমি প্রসন্ন হয়ে শোন। মহারাজ, তুমি অবসাদগ্রস্ত না হয়ে কর্ম কর। যে লোক কেবল দৈবের ওপর নির্ভর করে, এবং যে হঠবাদী(১) তারা উভয়েই মন্দবুদ্ধি। দেবারাধনায় যা লাভ হয় তাই দৈব, নিজ কর্মের দ্বারা যে প্রত্যক্ষ ফল লাভ হয় তাই পৌরুষ। ফলসিদ্ধির তিনটি কারণ, দৈব, প্রাক্তকর্ম ও পুরুষকার। আমাদের যে মহাবিপদ উপস্থিত হয়েছে, তুমি পুরুষকার অবলম্বন করে কর্মে প্রবৃত্ত হ'লে তা নিশ্চয় দূর হবে।