বনপর্ব: ৮। ভীম-যুধিষ্ঠিরের বাদানুবাদ — ব্যাসের উপদেশ
ভীম অসহিষ্ণু ও ক্রুদ্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ধর্ম অর্থ ও কাম ত্যাগ ক'রে কেন আমরা তপোবনে বাস করব? উচ্ছিষ্টভোজী শৃগাল যেমন সিংহের কাছ থেকে মাংস হরণ করে সেইরূপ দুর্যোধন আমাদের রাজ্য হরণ করেছে। রাজা, আপনি প্রতিজ্ঞা পালন করছেন, অল্প একটু ধর্মের জন্য রাজ্য বিসর্জন দিয়ে দুঃখ ভোগ করছেন। আমরা আপনার শাসন মেনে নিয়ে বন্ধুদের দুঃখিত এবং শত্রুদের আনন্দিত করছি। ধার্তরাষ্ট্রগণকে বধ করি নি এই অন্যায় কার্য্যের জন্য আমরা দুঃখ পাচ্ছি। সর্বদা ধর্ম ধর্ম করে আপনি কি ক্লীবের দশা পান নি? যাতে নিজের ও মিত্রবর্গের দুঃখ উৎপন্ন হয় তা ধর্ম নয়, ব্যসন ও কুপথ। কেবল ধর্মে বা কেবল অর্থে বা কেবল কামে আসক্ত হওয়া ভাল নয়, তিনটিরই সেবা করা উচিত। শাস্ত্রকাররা বলেছেন, পূর্বাহ্নে ধর্মের, মধ্যাহ্নে অর্থের এবং সায়াহ্নে কামের চর্চা করবে। আরও বলেছেন, প্রথম বয়সে কামের, মধ্য বয়সে অর্থের, এবং শেষ বয়সে ধর্মের আচরণ করবে। যারা মুক্তি চান তাঁদের পক্ষেই ধর্ম-অর্থ-কাম বর্জন করা বিধেয়, গৃহবাসীর পক্ষে এই ত্রিবর্গের সেবাই শ্রেয়। মহারাজ, আপনি হয় সন্ন্যাস নিন না হয় ধর্ম-অর্থ-কামের চর্চা করুন, এই দুইএর মধ্যবর্তী অবস্থা আতুরের জীবনের ন্যায় দুঃখময়। জগতের মূল ধর্ম ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই, কিন্তু বহু অর্থ থাকলেই ধর্মকার্য করা যায়। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে বল আর উৎসাহই ধর্ম, ভিক্ষা বা বৈশ্য-শূদ্রের বৃত্তি বিহিত নয়। আপনি ক্ষত্রিয়োচিত দৃঢ়হৃদয়ে শৈথিল্য ত্যাগ ক'রে বিক্রম প্রকাশ করুন, ধুরন্ধররের ন্যায় ভার বহন করুন। কেবল ধর্মান্ধ হ'লে কোনও রাজাই রাজ্য ধন ও লক্ষ্মী লাভ করতে পারেন না। বলবানরা কপটতার দ্বারা শত্রু জয় করেন, আপনিও তাই করুন। কৃষক যেমন অল্পপরিমাণ বীজের পরিবর্তে বহু শস্য পায়, বুদ্ধিমান সেইরূপ অল্প ধর্ম বিসর্জন দিয়ে বৃহৎ ধর্ম লাভ করেন। আমরা যদি কৃষ্ণ প্রভৃতি মিত্রগণের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করি তবে অবশ্যই রাজ্য উদ্ধার করতে পারব।
যুধিষ্ঠির বললেন, তুমি আমাকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করছ তার জন্য তোমার দোষ দিতে পারি না, আমার অন্যায় কর্মের ফলেই তোমাদের বিপদ হয়েছে। আমি দুর্যোধনের রাজ্য জয় করবার ইচ্ছায় দ্যূতক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হয়েছিলাম, কিন্তু আমার সরলতার সুযোগে ধূর্ত শকুনি শঠতার দ্বারা আমাকে পরাস্ত করেছিল। দুর্যোধন আমাদের দাস করেছিল, দ্রৌপদীই তা থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন। দ্বিতীয়বার দ্যূতক্রীড়ায় যে পণ নির্ধারিত হয়েছিল তা আমি মেনে নিয়েছিলাম, সেই প্রতিজ্ঞা এখন লঙ্ঘন করতে পারি না। তুমি দ্যূতসভায় আমার বাহু দণ্ড করতে চেয়েছিলে, অর্জুন তোমাকে নিরস্ত করেন। সেই সময়ে তুমি তোমার লৌহগদা পরিষ্কার করছিলে, কিন্তু তখনই কেন তা প্রয়োগ করলে না? আমার প্রতিজ্ঞার সময়ে কেন আমাকে বাধা দিলে না? উপযুক্ত কালে কিছু না করে এখন আমাকে ভর্ৎসনা ক'রে লাভ কি? লোকে বীজরোপণ করে যেমন ফলের প্রতীক্ষা করে, তুমিও সেইরূপ ভবিষ্যৎ সুখোদয়ের প্রতীক্ষায় থাক।
ভীম বললেন, মহারাজ, যদি তের বৎসর প্রতীক্ষা করতে হয় তবে তার মধ্যেই আমাদের আয়ু শেষ হবে। শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতম্মন্যের ন্যায় আপনার বুদ্ধি শাস্ত্রের অনুসরণ করে নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি ব্রাহ্মণের ন্যায় দয়ালু হয়ে পড়েছেন, ক্ষত্রিয়কুলে কেন আপনি জন্মেছেন? আমরা তের মাস বনে বাস করেছি, ভেবে দেখুন তের বৎসর কত বহুৎ। মনীষীরা বলেন, সোমলতার প্রতিনিধি যেমন পৃতিকা (পঁই শাক), সেইরূপ বৎসরের প্রতিনিধি মাস। আপনি তের মাসকেই তের বৎসর গণ্য করুন। যদি এইরূপ গণনা অন্যায় মনে করেন তবে একটা সাধুস্বভাব ষণ্ডকে প্রচুর আহার দিয়ে তৃপ্ত করুন, তাতেই পাপমুক্ত হবেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, উত্তমরূপে মন্ত্রণা আর বিচার ক'রে যদি বিক্রম প্রয়োগ করা হয় তবেই সিদ্ধিলাভ হয়, দৈবও তাতে অনুকূল হন। কেবল বলদর্পে চঞ্চল হয়ে কর্ম আরম্ভ করা উচিত নয়। দুর্যোধন ও তার ভ্রাতারা দুর্ধর্ষ এবং অস্ত্র-প্রয়োগে সুশিক্ষিত। আমরা দিগ্বিজয়কালে যেসকল রাজাদের উৎপীড়িত করেছি তাঁরা সকলেই কৌরবপক্ষে আছেন। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ পক্ষপাতহীন, কিন্তু অন্নদাতা ধৃতরাষ্ট্রের ঋণ শোধ করবার জন্য তাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত হবেন। কোপনস্বভাব সর্বশাস্ত্রবিশারদ অজেয় অভেদ্যকবচধারী কর্ণও আমাদের উপর বিদ্বেষ-যুক্ত। এই সকল পুরুষশ্রেষ্ঠকে জয় না ক'রে তুমি দুর্যোধনকে বধ করতে পারবে না।
যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে ভীমসেন বিষণ্ণ হয়ে চুপ ক'রে রইলেন। এমন সময় মহাযোগী ব্যাস সেখানে উপস্থিত হলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে অন্তরালে নিয়ে গিয়ে বললেন, ভরতসত্তম, তোমাকে আমি প্রতিস্মৃতি নামে বিদ্যা দিচ্ছি, তার প্রভাবে অর্জুন কার্যসিদ্ধি করবে। অস্ত্রলাভ করবার জন্য সে ইন্দ্র রুদ্র বরুণ কুবের ও যমের নিকট যাক। তোমরাও এই বন ত্যাগ করে অন্য বনে যাও, এক স্থানে দীর্ঘকাল থাকা তপস্বীদের উদ্বেগজনক, তাতে উদ্ভিদ-মৃগাদিরও ক্ষয় হয়। এই বলে ব্যাস অন্তর্হিত হলেন। যুধিষ্ঠির প্রতিস্মৃতি মন্ত্র লাভ করে অমাত্য ও অনুচরদের সঙ্গে কাম্যকবনে গিয়ে বাস করতে লাগলেন।