বনপর্ব: ১৭। পিন্দালয়ে দময়ন্তী — নল- ঋতুপর্ণের বিদর্ভযাত্রা
বিদর্ভরাজ ভীম তাঁর কন্যা ও জামাতার অন্বেষণের জন্য বহু ব্রাহ্মণ নিযুক্ত করলেন। তাঁরা প্রচুর পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি পেয়ে নানা দেশে নল-দময়ন্তীকে খুঁজতে লাগলেন। সুদদেব নামে এক ব্রাহ্মণ চেদি দেশে এসে রাজভবনে যজ্ঞকালে দময়ন্তীকে দেখতে পেলেন। সুদদেব নিজের পরিচয় দিয়ে দময়ন্তীকে তাঁর পিতা মাতা ও পুত্রকন্যার কুশল জানালেন। ভ্রাতার প্রিয় সখা সুদদেবকে দেখে দময়ন্তী কাঁদতে লাগলেন। সুনন্দার কাছে সংবাদ পেয়ে রাজমাতা তখনই সেখানে এলেন এবং সুদদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্রাহ্মণ, ইনি কার ভার্যা, কার কন্যা? আত্মীয়দের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন কেন? আপনিই বা এঁকে জানলেন কি ক’রে? সুদদেব নল-দময়ন্তীর ইতিহাস বিবৃত ক’রে বললেন, দেবী, এঁর অন্বেষণে আমরা সর্বত্র ভ্রমণ করেছি, এখন আপনার আলয়ে এঁকে পেলাম। এঁর অতুলনীয় রূপ এবং ভ্রূ দু’র মধ্যে যে পদ্মাকৃতি জটুল রয়েছে তা দেখেই ধূমাবৃত অগ্নির ন্যায় এঁকে আমি চিনেছি।
সুনন্দা দময়ন্তীর ললাটের মল মুছিয়ে দিলেন, তখন সেই জটুল মেঘমুক্ত চন্দ্রের ন্যায় সুস্পষ্ট হ’ল। তা দেখে রাজমাতা ও সুনন্দা দময়ন্তীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। রাজমাতা অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, তুমি আমার ভগিনীর কন্যা, এই জটুল দেখে চিনেছি। দশার্ণরাজ সুদামা তোমার মাতার ও আমার পিতা, তোমার জন্মকালে দশার্ণদেশে পিতৃগৃহে আমি তোমাকে দেখেছিলাম। দময়ন্তী, তোমার পক্ষে আমার গৃহ তোমার পিতৃগৃহেরই সমান। দময়ন্তী আনন্দিত হয়ে মাতৃম্বসাকে প্রণাম করে বললেন, আমি অপরিচিত থেকেও আপনার কাছে সুখে বাস করেছি, এখন আরও সুখে থাকতে পারব। কিন্তু মাতা, পুত্রকন্যার বিচ্ছেদে আমি শোকার্ত হয়ে আছি, অতএব আজ্ঞা দিন আমি বিদর্ভ দেশে যাব।
রাজমাতা তাঁর পুত্রের অনুমতি নিয়ে বিশাল সৈন্যদল সহ দময়ন্তীকে মনুষ্যবাহিত যানে বিদর্ভরাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন। রাজা ভীম আনন্দিত হয়ে সহস্র গো, গ্রাম ও ধন দান ক’রে সুদদেবকে তুষ্ট করলেন। দময়ন্তী তাঁর জননীকে বললেন, যদি আমার জীবন রক্ষা করতে চান তবে আমার পতিকে আনবার চেষ্টা করুন। রাজার আজ্ঞায় ব্রাহ্মণগণ চতুর্দিকে যাত্রা করলেন। দময়ন্তী তাঁদের বলে দিলেন, আপনারা সকল রাজ্যে জনসংসদে এই কথা বার বার বলবেন — ‘দ্যূতকার, বস্ত্রার্ধ ছিন্ন করে নিদ্রিতা প্রিয়াকে অরণ্যে ফেলে কোথায় গেছ? সে এখনও অর্ধবস্ত্রে আবৃত হয়ে তোমার জন্য রোদন করছে। রাজা, দয়া কর, প্রতিবাক্য বল।’ আপনারা এইরূপ বললে কোনও লোক যদি উত্তর দেন তবে ফিরে এসে আমাকে জানাবেন, কিন্তু কেউ যেন আপনাদের চিনতে না পারে।
দীর্ঘকাল পরে পর্ণাদ নামে এক ব্রাহ্মণ ফিরে এসে বললেন, আমি ঋতুপর্ণ রাজার সভায় গিয়ে আপনার বাক্য বলেছি, কিন্তু তিনি বা কোনও সভাসদ উত্তর দিলেন না। তার পর আমি বাহুক নামক এক রাজভৃত্যের কাছে গেলাম। সে রাজার সারথি, কুরূপ, খর্ববাহু, দ্রুত রথচালনায় নিপুণ, সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত করতেও জানে। সে বহুবার নিঃশ্বাস ফেলে ও রোদন ক'রে আমার কুশল জিজ্ঞাসা করলে, তার পর বললে, সতী কুলস্ত্রী বিপদে পড়লেও নিজের ক্ষমতায় নিজেকে রক্ষা করেন। পক্ষী যার বসন হরণ করেছিল, সেই মোহগ্রস্ত বিপদাপন্ন ক্ষুধার্ত পতি পরিত্যাগ ক'রে চ'লে গেলেও সতী নারী ক্রুদ্ধ হন না। এই বার্তা শুনে দময়ন্তী তাঁর জননীকে বললেন, আপনি পিতাকে কিছু জানাবেন না। এখন সুদেব শীঘ্র ঋতুপর্ণের রাজধানী অযোধ্যায় যান এবং নলকে আনবার চেষ্টা করুন।
দময়ন্তী পর্ণাদকে পারিতোষিক দিয়ে বললেন, বিপ্র, নল এখানে এলে আমি আবার আপনাকে ধনদান করব। পর্ণাদ কৃতার্থ হয়ে চ'লে গেলে দময়ন্তী সুদেবকে বললেন, আপনি সত্বর অযোধ্যায় গিয়ে রাজা ঋতুপর্ণকে বলুন — ভীম রাজার কন্যা দময়ন্তীর পুনর্বার স্বয়ম্বর হবে, কল্য সূর্যোদয়কালে তিনি দ্বিতীয় পতি বরণ করবেন, কারণ নল জীবিত আছেন কিনা জানা যাচ্ছে না। বহু রাজা ও রাজপুত্র স্বয়ম্বর সভায় যাচ্ছেন, আপনিও যান।
সুদেবের বার্তা শুনে ঋতুপর্ণ নলকে বললেন, বাহুক, আমি একদিনের মধ্যে বিদর্ভরাজ্যে দময়ন্তীর স্বয়ম্বরে যেতে ইচ্ছা করি। নল দুঃখার্ত হয়ে ভাবলেন, আমার সঙ্গে মিলিত হবার জন্যই কি তিনি এই উপায় স্থির করেছেন? আমি হীনমতি অপরাধী, তাঁকে প্রতারিত করেছি, হয়তো সেজন্যই তিনি এই নৃশংস কর্মে প্রবৃত্ত হয়েছেন। না, তিনি কখনও এমন করবেন না, বিশেষত তাঁর যখন সন্তান রয়েছে। ঋতুপর্ণকে নল বললেন যে তিনি একদিনেই বিদর্ভনগরে পৌঁছবেন। তার পর তিনি অশ্বশালায় গিয়ে কয়েকটি সিন্ধুদেশজাত কৃশকায় অশ্ব বেছে নিলেন। তা দেখে রাজা কিঞ্চিৎ রুষ্ট হয়ে বললেন, বাহুক, এইসকল ক্ষীণজীবী অশ্ব নিচ্ছ কেন, আমাকে কি প্রতারিত করতে চাও? নল উত্তর দিলেন, মহারাজ, এই অশ্ব- গুলির ললাট মস্তক পার্শ্ব প্রভৃতি স্থানে দশটি রোমাবর্ত আছে, দ্রুতগমনে এরাই শ্রেষ্ঠ। তবে আপনি যদি অন্য অশ্ব উপযুক্ত মনে করেন, তাই নেব। ঋতুপর্ণ বললেন, বাহুক, তুমি অশ্বতত্ত্বজ্ঞ, যে অশ্ব ভাল মনে কর তাই নাও। তখন নল নিজের নির্বাচিত চারটি অশ্ব রথে যুক্ত করলেন।
ঋতুপর্ণ রথে উঠলে নল সারথি বার্ষ্ণেয়কে তুলে নিলেন এবং মহাবেগে রথ চালালেন। বার্ষ্ণেয় ভাবলে, এই বাহুক কি ইন্দ্রের সারথি মাতলি না স্বয়ং নল রাজা? বয়সে নলের তুল্য হলেও এ আকৃতিতে বিরূপ ও খর্ব। বাহুকের রথচালনা দেখে ঋতুপর্ণ বিস্মিত ও আনন্দিত হলেন। সহসা তাঁর উত্তরীয় উড়ে যাওয়ায় তিনি বললেন, রথ থামাও, বার্ষ্ণেয় আমার উত্তরীয় নিয়ে আসুক। নল বললেন, আমরা এক যোজন ছাড়িয়ে এসেছি, এখন উত্তরীয় পাওয়া অসম্ভব। ঋতুপর্ণ বিশেষ প্রীত হলেন না। তিনি এক বিভীতক (বহেড়া) বৃক্ষ দেখিয়ে বললেন, বাহুক, সকলে সব বিষয় জানে না, তুমি আমার গণনার শক্তি দেখ। — এই বৃক্ষ থেকে ভূমিতে পতিত পত্রের সংখ্যা এক শ এক, ফলের সংখ্যাও তাই। এই শাখার পাঁচ কোটি পত্র আর দুই হাজার পঁচানব্বই ফল আছে, তুমি গণনা করে দেখ। রথ থামিয়ে নল বললেন, মহারাজ আপনি গর্ব করছেন, আমি এই বৃক্ষ কেটে ফেলে পত্র ও ফল গণনা করব। রাজা বললেন, এখন বিলম্ব করার সময় নয়। নল বললেন, আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, আর যদি যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকেন তবে সম্মুখের পথ ভাল আছে, বার্ষ্ণেয় আপনাকে নিয়ে যাক। ঋতুপর্ণ অনুনয় করে বললেন, বাহুক, তোমার তুল্য সারথি পৃথিবীতে নেই, আমি তোমার শরণাপন্ন, গমনে বিঘ্ন করো না। যদি আজ সূর্যাস্তের পূর্বে বিদর্ভদেশে যেতে পার তবে তুমি যা চাইবে তাই দেব। নল বললেন, আমি পত্র আর ফল গণনা করে বিদর্ভে যাব। রাজা অনিচ্ছায় বললেন, আমি শাখার এক অংশের পত্র ও ফলের সংখ্যা বলছি, তাই গণনা করে সন্তুষ্ট হও। নল শাখা কেটে গণনা করে বিস্মিত হয়ে বললেন, মহারাজ, আপনার শক্তি অতি অদ্ভুত, আমাকে এই বিদ্যা শিখিয়ে দিন, তার পরিবর্তে আপনি আমার বিদ্যা অশ্বহৃদয় নিন।
ঋতুপর্ণ অশ্বহৃদয় শিখে নলকে অক্ষহৃদয় দান করলেন। তৎক্ষণাৎ কলি কর্কটক-বিষ বমন করতে করতে নলের দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং অন্যের অদৃশ্য হয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে রুদ্ধ নলকে বললেন, নৃপতি, আমাকে অভিশাপ দিও না, আমি তোমাকে পরমা কীর্তি দান করব। যে লোক তোমার নাম কীর্তন করবে তার কলিভয় থাকবে না। এই বলে তিনি বিভীতক বৃক্ষে প্রবেশ করলেন। কলির প্রভাব থেকে মুক্ত নলের সন্তাপ দূর হল, কিন্তু তখনও তিনি বিরূপ হয়ে রইলেন।