বনপর্ব: ১৮। নল-দময়ন্তীর পুনর্ম্মিলন
ঋতুপর্ণ সায়ংকালে বিদর্ভরাজপুর কুণ্ডিন নগরে প্রবেশ করিলেন। নল-চালিত রথের মেঘগর্জনের ন্যায় ধ্বনি শুনে দময়ন্তী অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয় মহীপতি নল এখানে আসছেন। আজ যদি তাঁর চন্দ্রবদন না দেখতে পাই, যদি তাঁর বাহুদ্বয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারি, তবে আমি নিশ্চয় মরব। দময়ন্তী জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাসাদের উপরে উঠে ঋতুপর্ণ বার্ষ্ণেয় ও বাহুককে দেখতে পেলেন।
ঋতুপর্ণ স্বয়ম্বরের কোনও আয়োজন দেখতে পেলেন না। বিদর্ভরাজ ভীম কিছুই জানতেন না, তিনি ঋতুপর্ণকে সসম্মানে সম্বর্ধনা ক’রে তাঁর আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ঋতুপর্ণ দেখলেন, কোনও রাজা বা রাজপুত্র স্বয়ম্বরের জন্য আসেন নি; অগত্য তিনি বিদর্ভরাজকে বললেন, আপনাকে অভিবাদন করতে এসেছি। রাজা ভীমও বিস্মিত হয়ে ভাবলেন, শত যোজনের অধিক পথ অতিক্রম ক’রে কেবল অভিবাদনের জন্য এ’র আসবার কারণ কি?
রাজভৃত্যগণ ঋতুপর্ণকে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট গৃহে নিয়ে গেল, বার্ষ্ণেয়ও তাঁর সঙ্গে গেল। বাহুকরূপী নল রথশালায় রথ নিয়ে গিয়ে অশ্বদের যথাবিধি পরিচর্যা ক’রে রথেতেই বসলেন। দময়ন্তী নলকে না দেখে শোকার্তা হলেন, তিনি কেশিনী নামে এক দূতীকে বললেন, তুমি জেনে এস ওই হ্রস্ববাহু বিরূপ রথচালকটি কে?
দময়ন্তীর উপদেশ অনুসারে কেশিনী নলের কাছে গিয়ে কুশলপ্রশ্ন ক’রে বললে, দময়ন্তী জানতে চান আপনারা অযোধ্যা থেকে কেন এখানে এসেছেন। আপনি কে, আপনাদের সঙ্গে যে তৃতীয় লোকটি এসেছে সেই বা কে? নল উত্তর দিলেন, দময়ন্তীর দ্বিতীয়বার স্বয়ম্বর হবে শুনে রাজা ঋতুপর্ণ এখানে এসেছেন। আমি অশ্ববিদ্যার বিশারদ সৈন্ধব্য রাজা আমাকে সারথি করেছেন, আমি তাঁর আহারও প্রস্তুত করি। তৃতীয় লোকটির নাম বার্ষ্ণেয়, পূর্বে সে নলের সারথি ছিল, নল রাজ্যত্যাগ করার পর থেকে সে রাজা ঋতুপর্ণের আশ্রয়ে আছে। কেশিনী বললে, বাহুক, নল কোথায় আছেন বার্ষ্ণেয় কি তা জানে? নল বললেন, সে বা অন্য কেউ নলের সংবাদ জানে না, তাঁর রূপ নষ্ট হয়েছে, তিনি আত্মগোপন ক’রে বিচরণ করছেন। কেশিনী বললে, যে ব্রাহ্মণ অযোধ্যায় গিয়েছিলেন তাঁর কথার উত্তরে আপনি যা বলেছিলেন দময়ন্তী পুনর্বার তা আপনার নিকট শুনতে চান। নল অশ্রুপূর্ণনয়নে বাষ্পগদগদস্বরে পূর্ববৎ বললেন, সতী কুলস্ত্রী বিপদে পড়লেও নিজের ক্ষমতার নিজেকে রক্ষা করেন। পক্ষী যার বস্ত্র হরণ করেছিল সেই মোহগ্রস্ত বিপদাপন্ন ক্ষুধার্ত পতি পরিত্যাগ ক'রে চলে গেলেও সতী নারী ক্রুদ্ধ হন না।
কেশিনীর কাছে সমস্ত শুনে দময়ন্তী অনুমান করলেন, বাহুকই নল। তিনি কেশিনীকে বললেন, তুমি আবার বাহুকের কাছে গিয়ে তাঁর আচরণ ও কার্যের কৌশল লক্ষ্য কর। তিনি চাইলেও তাঁকে জল দিও না। কেশিনী পুনর্বার গেল এবং ফিরে এসে বললে, এমন শুদ্ধাচার মানুষ আমি কখনও দেখি নি। ইনি অনুচ্চ দ্বারে প্রবেশকালে নত হন না, দ্বারই তাঁর জন্য উচ্চ হয়ে যায়। ঋতুপর্ণের ভোজনের জন্য আমাদের রাজা বিবিধ পশুমাংস পাঠিয়েছেন, মাংস ধোবার জন্য কলসও সেখানে আছে। বাহুকের দৃষ্টিপাতে কলস জলপূর্ণ হয়ে গেল। মাংস ধুয়ে উনুনে চড়িয়ে বাহুক এক মুষ্টি তৃণ সূর্যকিরণে ধরলেন, তখনই তৃণ প্রজ্বলিত হ'ল। তিনি অগ্নি স্পর্শ করলে দগ্ধ হন না, পুষ্প মর্দন করলে তা বিকৃত হয় না, আরও সুগন্ধ ও বিকশিত হয়। দময়ন্তী বললেন, ‘কেশিনী, তুমি আবার যাও, তাঁকে না জানিয়ে তাঁর রাঁধা মাংস কিছু নিয়ে এস। কেশিনী মাংস আনলে দময়ন্তী তা খেয়ে বুঝলেন যে নলই তা রেঁধেছেন। তখন তিনি তাঁর পুত্রকন্যাকে কেশিনীর সঙ্গে বাহুকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। নল ইন্দ্রসেন ও ইন্দ্রসেনাকে কোলে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তার পর কেশিনীকে বললেন, এই বালক-বালিকা আমার পুত্র-কন্যার সদৃশ সেজন্য আমি কাঁদছি। ভদ্রে, আমরা অন্য দেশের অতিথি, তুমি বার বার এলে লোকে দোষ দেবে, অতএব তুমি যাও।
দময়ন্তী তাঁর মাতাকে বললেন, আমি বহু পরীক্ষায় বুঝেছি যে বাহুকই নল, কেবল তাঁর রূপের জন্য আমার সংশয় আছে। এখন আমি নিজেই তাঁকে দেখতে চাই, আপনি পিতাকে জানিয়ে বা না জানিয়ে আমাকে অনুমতি দিন। পিতা মাতার সম্মতিক্রমে দময়ন্তী নলকে তাঁর গৃহে আনালেন। কাষায়বসনা জটাধারিণী মলিনাঙ্গী দময়ন্তী সরোদনে বললেন, বাহুক, নিদ্রিত পত্নীকে বনে পরিত্যাগ ক'রে চলে গেছেন এমন কোনও ধর্মজ্ঞ পুরুষকে জান কি? পুণ্যশ্লোক নল ভিন্ন আর কে সন্তানবতী পতিব্রতা ভার্যাকে বিনা দোষে ত্যাগ করতে পারে? নল বললেন, কল্যাণী, যার জন্য আমার রাজ্য নষ্ট হয়েছে সেই কলির প্রভাবেই আমি তোমাকে ত্যাগ করেছিলাম। তোমার অভিশাপে দগ্ধ হয়ে কলি আমার দেহে বাস করছিল, এখন আমি তাকে জয় করেছি, সেই পাপ দূর হয়েছে। কিন্তু তুমি দ্বিতীয় পতি বরণে প্রবৃত্ত হয়েছ কেন? দময়ন্তী কৃতাঞ্জলি হয়ে কম্পিতদেহে বললেন, নিষধরাজ, আমার দোষ দিতে পার না, দেবগণকে বর্জন ক'রে আমি তোমাকেই বরণ করেছিলাম। তোমার অন্বেষণে আমি সর্বত্র লোক পাঠিয়েছিলাম। ব্রাহ্মণ পর্ণাদের মুখে তোমার বাক্য শুনেই তোমাকে আনাবার জন্য আমি স্বয়ংবর রূপ উপায় অবলম্বন করেছি। যদি আমি পাপ ক'রে থাকি তবে বায়ু, সূর্য চন্দ্র আমার প্রাণ হরণ করুন।
অন্তরীক্ষ থেকে বায়ু বললেন, নল, এ'র কোনও পাপ নেই, আমরা তিন বৎসর এ'র সাক্ষী ও রক্ষী হয়ে আছি। তুমি ভিন্ন কেউ একদিনে শত যোজন পথ অতিক্রম করতে পারে না, তোমাকে আনাবার জন্যই ইনি অসাধারণ উপায় স্থির করেছিলেন। তখন পুষ্পবৃষ্টি হ'ল, দেবদুন্দুভি বাজতে লাগল; নাগরাজ কর্কেটকের বস্ত্র পরিধান ক'রে নল তাঁর পূর্বরূপ ফিরে পেলেন, দময়ন্তী তাঁকে আলিঙ্গন ক'রে রোদন করতে লাগলেন। অর্ধশুকাতশস্য ভূমি জল পেয়ে যেমন হয়, সেইরূপ দময়ন্তী ভর্তাকে পেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন।