বনপর্ব: ১৯। নলের রাজ্যোদ্ধার

পরদিন প্রভাতকালে নল রাজা সুসজ্জিত হয়ে দময়ন্তীর সঙ্গে শ্বশুর ভীম রাজার কাছে গিয়ে অভিবাদন করলেন, ভীমও পরম আনন্দে নলকে পুত্রের ন্যায় গ্রহণ করলেন। রাজধানী ধ্বজ পতাকা ও পুষ্পে অলঙ্কৃত করা হ'ল, নগরবাসীরা হর্ষধ্বনি করতে লাগল। ঋতুপর্ণ বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে নলকে বললেন, নিষধরাজ, ভাগ্যক্রমে আপনি পত্নীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হলেন। আমার গৃহে আপনার অজ্ঞাতবাসকালে যদি আমি কোনও অপরাধ ক'রে থাকি তো ক্ষমা করুন। নল বললেন, মহারাজ, আপনি কিছুমাত্র অপরাধ করেন নি, আপনি পূর্বে আমার সখা ও আত্মীয় ছিলেন, এখন আরও প্রীতিভাজন হলেন। তার পর ঋতুপর্ণ নলের নিকট অক্ষহৃদয় শিক্ষা ক'রে এবং তাঁকে অক্ষহৃদয় দান ক'রে স্বরাজ্যে প্রস্থান করলেন।

এক মাস পরে নল সসৈন্যে নিজ রাজ্যে প্রবেশ ক'রে পুষ্করকে বললেন, আমি বহু ধন উপার্জন করেছি, পুনর্বার দ্যূতক্রীড়া করব। আমার সমস্ত ধন ও দময়ন্তীকে পণ রাখছি, তুমি রাজ্য পণ রাখ। যদি দ্যূতক্রীড়ায় অসম্মত হও তবে আমার সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধ কর। পুষ্কর সহাস্যে বললেন, ভাগ্যক্রমে আপনি আবার এসেছেন, আমি আপনার ধন জয় ক'রে নেব, সুন্দরী দময়ন্তী আমার সেবা করবেন। নলের ইচ্ছা হ'ল তখনি খড়গাঘাতে পুষ্করের শিরচ্ছেদ করেন, কিন্তু ক্রোধ সংবরণ ক'রে বললেন, এখন বাক্যব্যয়ে লাভ কি, আগে জয়ী হও তার পর বলো।

এক পণেই নল পুষ্করের সর্বস্ব জয় করলেন। তিনি বললেন, মূর্খ, তুমি বৈদর্ভীকে পেলে না, নিজেই সপরিবারে তাঁর দাস হলে। আমার পূর্বের পরাজয় কলির প্রভাবে হয়েছিল, তোমার তাতে কর্তৃত্ব ছিল না। পরের দোষ তোমাতে আরোপ করব না, তুমি আমার ভ্রাতা, আমার রাজ্যের এক অংশ তোমাকে দিলাম। তোমার প্রতি আমার স্নেহ এখনও নষ্ট হবে না, তুমি শত বৎসর জীবিত থাক। এই বলে নল ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করলেন। পুণ্যশ্লোক নলকে অভিবাদন করে কৃতাঞ্জলি হয়ে পুষ্কর বললেন, মহারাজ, আপনার কীর্তি অক্ষয় হ'ক, আপনি আমাকে প্রাণ ও রাজ্য দান করলেন, আপনি অযুত বৎসর জীবিত থাকুন। এক মাস পরে পুষ্কর হৃষ্টচিত্তে নিজ রাজধানীতে চলে গেলেন। অমাত্যগণ নগরবাসী ও জনপদবাসী সকলে আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে নলকে বললেন, মহারাজ, আমরা পরম সুখ লাভ করেছি; দেবগণ যেমন দেবরাজের পূজা করেন সেইরূপ আপনার পূজা করবার জন্যই আমরা আবার আপনাকে পেয়েছি।

নলোপাখ্যান শেষ ক'রে বৃহদশ্ব বললেন, যুধিষ্ঠির, নল রাজা দ্যুতক্রীড়ার ফলে ভার্যার সঙ্গে এইরূপ দুঃখভোগ করেছিলেন, পরে আবার সমৃদ্ধিলাভও করেছিলেন। কর্কোটক নাগ, নল দময়ন্তী আর রাজর্ষি ঋতুপর্ণের ইতিহাস শুনলে কলির ভয় দূর হয়। তুমি আশ্বস্ত হও, বিষাদগ্রস্ত হয়ো না। দ্যুতের ভয় আছে, আবার কেউ দ্যুতক্রীড়ায় তোমাকে আহ্বান করবে; এই ভয় আমি দূরে করছি। আমি সমগ্র অক্ষহৃদয় জানি, তুমি তা শিক্ষা কর। এই বলে বৃহদশ্ব যুধিষ্ঠিরকে অক্ষহৃদয় দান ক'রে তীর্থভ্রমণে চলে গেলেন।