বনপর্ব: ৪০। পরীক্ষিৎ ও মন্ডূকরাজকন্যা — শল, দল ও বামদেব
যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে মার্কণ্ডেয় ব্রাহ্মণ্যমাহাত্ম্য-বিষয়ক আরও উপাখ্যান বললেন। — অযোধ্যায় পরীক্ষিৎ নামে ইক্ষ্বাকুবংশীয় এক রাজা ছিলেন। একদিন তিনি অশ্বারোহণে মৃগয়ায় গিয়ে ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর হয়ে নিবিড় বনে এক সরোবর দেখতে পেলেন। রাজা স্নান করে অশ্বকে মৃণাল খেতে দিয়ে সরোবরের তীরে বসলেন। তিনি দেখলেন, এক পরমসুন্দরী কন্যা ফুল তুলতে তুলতে গান করছে। রাজা বললেন, ভদ্রে, তুমি কে? আমি তোমার পাণিপ্রার্থী। কন্যা বললে, আমি কন্যা: যদি প্রতিজ্ঞা কর যে আমাকে কখনও জল দেখাবে না তবেই বিবাহ হতে পারে। রাজা সম্মত হলেন এবং কন্যাকে বিবাহ ক’রে রাজধানীতে নিয়ে গেলেন। তিনি পত্নীর সঙ্গে নির্জন স্থানে বাস করতে লাগলেন।
পরিচারিকাদের কাছে কন্যার বৃত্তান্ত শুনে রাজমন্ত্রী বহুবৃক্ষশোভিত এক উদ্যান রচনা করলেন। সেই উদ্যানের এক পার্শ্বে একটি পুষ্করিণী ছিল, তার জল মুক্তাজাল দিয়ে এবং পাড় চুনের লেপে ঢাকা। মন্ত্রী রাজাকে বললেন, এই মনোরম উদ্যানে জল নেই, আপনি এখানে বিহার করুন। রাজা তাঁর মহিষীর সঙ্গে সেখানে বাস করতে লাগলেন। একদিন তাঁরা বেড়াতে বেড়াতে শ্রান্ত হয়ে সেই পুষ্করিণীর তীরে এলেন। রাজা রানীকে বললেন, তুমি জলে নাম। রানী জলে নিমগ্ন হলেন, আর উঠলেন না। রাজা তখন সেই পুষ্করিণী জলশূন্য করালেন এবং তার মধ্যে একটা ব্যাঙ দেখে আজ্ঞা দিলেন, সমস্ত মণ্ডূক বধ কর। মণ্ডূকরাজ তপস্বীর বেশে রাজার কাছে এসে বললেন, মহারাজ, বিনা দোষে ভেক বধ করবেন না। রাজা বললেন, এই দুরাত্মা আমার প্রিয়াকে খেয়ে ফেলেছে। মণ্ডূকরাজ নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমার নাম আয়ু, আপনার ভার্যা আমার কন্যা সুশোভনা। তার এই দুষ্ট স্বভাব—সে অনেক রাজাকে প্রতারণা করেছে। রাজার প্রার্থনায় আয়ু তাঁর কন্যাকে এনে দিলেন এবং তাকে অভিশাপ দিলেন, তোমার অপরাধের ফলে তোমার সন্তান ব্রাহ্মণের অনিষ্টকারী হবে।
সুশোভনার গর্ভে পরীক্ষিতের তিন পুত্র হ’ল—শল, দল, বল। যথাকালে শলকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে পরীক্ষিৎ বনে চলে গেলেন। একদিন শল রথে চড়ে মৃগয়ায় গিয়ে একটি দ্রুতগামী হরিণকে ধরতে পারলেন না। সারথি বললে, এই রথে যদি বামী নামক দুই অশ্ব জোতা হয় তবেই মৃগকে ধরতে পারবেন। মহর্ষি বামদেবের সেই অশ্ব আছে জেনে রাজা তাঁর আশ্রমে গিয়ে অশ্ব প্রার্থনা করলেন। বামদেব বললেন, নিয়ে যাও, কিন্তু কৃতকার্য হলেই শীঘ্র ফিরিয়ে দিও। রাজা সেই দুই অশ্ব রথে যোজনা করে হরিণ ধরলেন, কিন্তু রাজধানীতে গিয়ে অশ্ব ফেরত পাঠালেন না। বামদেব তাঁর শিষ্য আত্রেয়কে রাজার কাছে পাঠালে রাজা বললেন, এই দুই অশ্ব রাজারই যোগ্য, ব্রাহ্মণের অশ্বে কি প্রয়োজন? তার পর বামদেব স্বয়ং এসে অশ্ব চাইলেন। রাজা বললেন মহর্ষি, সুশিক্ষিত বৃষই ব্রাহ্মণের উপযুক্ত বাহন; আর, বেদও তো আপনাদের বহন করে। শল রাজা যখন কিছুতেই দুই অশ্ব ফেরত দিলেন না তখন বামদেবের আদেশে চারজন ঘোররূপ রাক্ষস আবির্ভূত হয়ে শলহস্তে রাজাকে মারতে গেল। রাজা উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ইক্ষ্বাকুবংশীয়গণ, আমার ভ্রাতা দল এবং সভাস্থ বৈশ্যগণ যদি আমার অনুবর্তী হন তবে এই রাক্ষসদের নিবারণ করুন; বামদেব ধর্মশীল নন, তাঁর বাণী আমি দেব না। এইরূপ বলতে বলতে শল রাক্ষসদের হাতে নিহত হলেন।
ইক্ষ্বাকুবংশীয়গণ দলকে রাজপদে অভিষিক্ত করলেন। বামদেব তাঁর কাছে অশ্ব চাইলে দল ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর সারথিকে বললেন, আমার যে বিষলিপ্ত বিচিত্র বাণ আছে তারই একটা নিয়ে এস, বামদেবকে মারব, তার মাংস কুকুররা খাবে। বামদেব বললেন, রাজা, সেনজিৎ নামে তোমার যে দশবৎসরবয়স্ক পুত্র আছে তাকেই তোমার বাণ বধ করুক। দলের বাণ অন্তঃপুরে গিয়ে রাজপুত্রকে বধ করলে। রাজা আর একটা বাণ আনতে বললেন, কিন্তু তাঁর হাত বামদেবের শাপে অবশ হয়ে গেল। রাজা বললেন, সকলে দেখুন, বামদেব আমাকে স্তম্ভিত করেছেন, আমি তাঁকে শরাঘাতে মারতে পারছি না, অতএব তিনি দীর্ঘায়ু হয়ে জীবিত থাকুন। বামদেব বললেন, রাজা, তোমার মহিষীকে বাণ দিয়ে স্পর্শ কর, তা হলে পাপমুক্ত হবে। রাজা দল তা করলে মহিষী বললেন, এই নৃশংস রাজাকে আমি প্রতিদিন সদুপদেশ দিই, ব্রাহ্মণগণকেও সত্য ও প্রিয় বাক্য বলি, তার ফলে আমি পুণ্যলোক লাভ করব। মহিষীর উপর তুষ্ট হয়ে বামদেব বর দিলেন, তার ফলে দল পাপমুক্ত হয়ে শুভাশীর্বাদ লাভ করলেন এবং অশ্ব ফিরিয়ে দিলেন।