বিরাটপর্ব: ১। অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণা

১। অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণা

যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা রাজ্যত্যাগ ক'রে দ্বাদশ বৎসর প্রবাসে আছি, এখন ত্রয়োদশ বৎসর উপস্থিত হয়েছে। এই শেষ বৎসর কষ্টে কাটাতে হবে। অর্জুন, তুমি এমন দেশের নাম বল যেখানে আমরা অজ্ঞাতভাবে বাস করতে পারব। অর্জুন বললেন, যক্ষরূপী ধর্ম যে বর দিয়েছেন তার প্রভাবেই আমরা অজ্ঞাতভাবে বিচরণ করতে পারব, তথাপি কয়েকটি দেশের নাম বলছি।—কুরুদেশের চারিদিকে অনেক রমণীয় দেশ আছে, যেমন পাঞ্চাল চেদি মৎস্য শূরসেন পটচ্চর দশার্ণ মল্ল শাল্ব যুগন্ধর কুন্তিরাষ্ট্র সুরাষ্ট্র অবন্তী। এদের মধ্যে কোন্টি আপনার ভাল মনে হয়? যুধিষ্ঠির বললেন, মৎস্যদেশের রাজা বিরাট বলবান ধর্মশীল বদান্য ও বৃদ্ধ, তিনি আমাদের রক্ষা করতে পারবেন, আমরা এক বৎসর বিরাটনগরে তাঁর কর্মচারী হয়ে থাকব।

অর্জুন বললেন, মহারাজ, আপনি মৃদুস্বভাব লজ্জাশীল ধার্মিক, সামান্য লোকের ন্যায় পরগৃহে কি কর্ম করবেন? যুধিষ্ঠির বললেন, বিরাট রাজা দ্যূতপ্রিয়, আমি কঙ্ক নাম নিয়ে ব্রাহ্মণরূপে তাঁর সভাসদ হব, বৈদূর্য স্বর্ণ বা হস্তিদন্ত নির্মিত পাশক, জ্যোতি রস (১) নির্মিত ফলক এবং কৃষ্ণ ও লোহিত গুটিকা নিয়ে অক্ষক্রীড়া ক'রে রাজা ও তাঁর অমাত্যবর্গের মনোরঞ্জন করব। তিনি জিজ্ঞাসা করলে বলব যে পূর্বে আমি যুধিষ্ঠিরের প্রাণসম সখা ছিলাম। বৃকোদর, বিরাটনগরে তুমি কোন্ কর্ম করবে?

(১) মণিশ্লেষ, bloodstone।

ভীম বললেন, আমি বল্লব নাম নিয়ে রাজার পাকশালার অধ্যক্ষ হব, পাককার্যে নিপুণতা দেখিয়ে তাঁর সুশিক্ষিত পাচককদের হারিয়ে দেব। তা ছাড়া আমি রাশি রাশি কাঠ বয়ে আনব, প্রয়োজন হ'লে বলবান হস্তী বা বৃষকে দমন করব। যদি কেউ আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করতে চায় তবে তাদের প্রহার ক'রে ভূপাতিত... করব, কিন্তু বধ করব না। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলব, আমি রাজা যুধিষ্ঠিরের হস্তী ও বৃষ দমন করতাম এবং তাঁর সূপকার ও মল্ল ছিলাম।

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে অর্জুন বললেন, আমি বৃহন্নলা নাম নিয়ে নপুংসক সেজে যাব, বাহুতে যে জ্যাঘর্ষণের চিহ্ন আছে তা বলয় দিয়ে ঢাকব, কানে উজ্জ্বল কুণ্ডল এবং হাতে শাঁখা পরব, চুলে বেণী বাঁধব, এবং রাজভবনের স্ত্রীদের নৃত্য-গীত-বাদ্য শেখাব। জিজ্ঞাসা করলে বলব, আমি দ্রৌপদীর পরিচারিকা ছিলাম।

নকুল বললেন, আমি অশ্বের রক্ষা ও চিকিৎসায় নিপুণ, গ্রন্থিক নাম নিয়ে আমি বিরাটরাজার অশ্বরক্ষক হব। নিজের পরিচয় এই দেব যে পূর্বে আমি যুধিষ্ঠিরের অশ্বরক্ষক ছিলাম।

সহদেব বললেন, আমি তন্তিপাল নাম নিয়ে বিরাট রাজার গোসমূহের তত্ত্বাবধায়ক হব। আমি গরুর চিকিৎসা দোহনপদ্ধতি ও পরীক্ষা জানি; সুলক্ষণ বৃষও চিনতে পারি।

যুধিষ্ঠির বললেন, আমাদের এই ভার্যা প্রাণাপেক্ষা প্রিয়া, মাতার ন্যায় পালনীয়া, জ্যেষ্ঠা ভগিনীর ন্যায় মাননীয়া। ইনি সেখানে কোন্ কর্ম করবেন? দ্রৌপদী সুকুমারী, অভিমানিনী, জন্মাবধি মাল্য গন্ধ ও বিবিধ বেশভূষায় অভ্যস্ত।

দ্রৌপদী বললেন, যে নারী স্বাধীনভাবে পরগৃহে দাসীর কর্ম করে তাকে সৈরিন্ধ্রী বলা হয়। কেশসংস্কারে নিপুণ সৈরিন্ধ্রীর রূপে আমি যাব, বলব যে পূর্বে আমি দ্রৌপদীর পরিচারিকা ছিলাম। রাজমহিষী সুদেষ্ণা আমাকে আশ্রয় দেবেন, তুমি ভেবো না। যুধিষ্ঠির বললেন, কল্যাণী, তোমার সংকল্প ভাল। মহৎ কুলে তোমার জন্ম, তুমি সাধ্বী, পাপকর্ম জান না। এমন ভাবে চলো যাতে পাপাত্মা শত্রুরা সুখী না হয়, তোমাকে কেউ যেন জানতে না পারে।

২। ধৌম্যের উপদেশ — অজ্ঞাতবাসের উপক্রম

পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী নিজ নিজ কর্ম স্থির করার পর যুধিষ্ঠির বললেন, পুরোহিত ধৌম্য দ্রুপদ রাজার ভবনে যান এবং সেখানে অগ্নিহোত্র রক্ষা করুন; তাঁর সঙ্গে সারথি, পাচক আর দ্রৌপদীর পরিচারিকারাও যাক। রথগুলি নিয়ে ইন্দ্রসেন প্রভৃতি দ্বারকায় চলে যাক। কেউ প্রশ্ন করলে সকলেই বলবে, পাণ্ডবরা কোথায় গেছেন তা আমরা জানি না।