বিরাটপর্ব: ১২। উত্তরগোগ্রহ — উত্তর ও বৃহন্নলা

বিরাট যখন ত্রিগার্তসেনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে যান সেই সময়ে ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতির সঙ্গে দুর্যোধন মৎস্যদেশে উপস্থিত হলেন এবং গোপালকদের তাড়িয়ে দিয়ে ষাট হাজার গরু হরণ (১) করলেন। গোপগণের অধ্যক্ষ রথে চড়ে দ্রুতবেগে রাজধানীতে এল এবং বিরাটের পুত্র ভূমিঞ্জয় বা উত্তরকে সংবাদ দিয়ে বললে, রাজপুত্র, আপনি শীঘ্র এসে গোধন উদ্ধার করুন, মহারাজ আপনাকেই এই শূন্য রাজধানীর রক্ষক নিযুক্ত করে গেছেন।

(১) এই গোহরণ বা গোগৃহ বিরাট রাজ্যের উত্তরে হয়েছিল।

উত্তর বললেন, যদি অশ্বচালনে দক্ষ কোনও সারথি পাই তবে এখনই ধনুর্বাণ নিয়ে যুদ্ধে যেতে পারি। আমার যে সারথি ছিল সে পূর্বে এক মহাযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তুমি শীঘ্র একজন সারথি দেখ। উপযুক্ত অশ্বচালক পেলে আমি দুর্যোধন ভীষ্ম কর্ণ কৃপ দ্রোণ প্রভৃতিকে বিনষ্ট করে মুহূর্তমধ্যে গরু উদ্ধার করে আনব। আমি সেখানে ছিলাম না বলেই কৌরবরা গোধন হরণ করেছে। কৌরবরা আজ আমার বিক্রম দেখে ভাববে, স্বয়ং অর্জুন আমাদের আক্রমণ করলেন নাকি?

দ্রৌপদী উত্তরের মুখে বার বার এইরূপ কথা এবং অর্জুনের উল্লেখ সইতে পারলেন না। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, রাজপুত্র, বৃহন্নলা পূর্বে অর্জুনের সারথি ও শিষ্য ছিলেন, তিনি অস্ত্রবিদ্যায় অর্জুনের চেয়ে কম নন। আপনার কনিষ্ঠা ভগিনী উত্তরা যদি বলেন তবে বৃহন্নলা নিশ্চয় আপনার সারথি হবেন। ভ্রাতার অনুরোধে উত্তরা তখনই নৃত্যশালায় গিয়ে অর্জুনকে সকল ঘটনা জানিয়ে বললেন, বৃহন্নলা, তুমি আমার ভ্রাতার সারথি হয়ে যাও, তোমার উপর আমার প্রীতি আছে সেজন্য একথা বলছি, যদি না শোন তবে আমি জীবন ত্যাগ করব। অর্জুন উত্তরের কাছে গিয়ে বললেন, যুদ্ধস্থানে সারথ্য করতে পারি এমন কি শক্তি আমার আছে? আমি কেবল নৃত্য-গীত-বাদ্য জানি। উত্তর বললেন, তুমি গায়ক বাদক নর্তক যাই হও, শীঘ্র আমার রথে উঠে অশ্বচালনা কর।

অর্জুন তখন উত্তরার সম্মুখে অনেক প্রকার কৌতুকজনক কর্ম করলেন। তিনি উলটো ক'রে কবচ পরতে গেলেন, তা দেখে কুমারীরা হেসে উঠল। তখন উত্তর স্বয়ং তাঁকে মহামূল্য কবচ পরিয়ে দিলেন। যাত্রাকালে উত্তরা ও তাঁর সখীরা বললেন, বৃহন্নলা, তুমি ভীষ্ম-দ্রোণাদিকে জয় করে আমাদের পুত্তলিকার জন্য বিচিত্র সূক্ষ্ম কোমল বস্ত্র এনো। অর্জুন সহাস্যে বললেন, উত্তর যদি জয়ী হন তবে নিশ্চয় সুন্দর সুন্দর বস্ত্র আনব।

অর্জুন বায়ুবেগে রথ চালালেন। কিছুদূর গিয়ে শ্মশানের নিকটে এসে উত্তর দেখতে পেলেন, বহুধ্বজসমন্বিত বনের ন্যায় বিশাল কৌরবসৈন্য ব্যূহ রচনা ক'রে রয়েছে, সাগরগর্জনের ন্যায় তাদের শব্দ হচ্ছে। ভয়ে রোমাঞ্চিত ও উদবিগ্ন হয়ে উত্তর বললেন, আমি কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করব না, ওদের মধ্যে অনেক মহাবীর আছেন যাঁরা দেবগণেরও অজেয়। আমার পিতা সমস্ত সৈন্য নিয়ে গেছেন, আমার সৈন্য নেই, আমি বালক, যুদ্ধে অনভিজ্ঞ। বৃহন্নলা, তুমি ফিরে চল।

অর্জুন বললেন, রাজপুত্র, তুমি যাত্রা করবার সময় স্ত্রী আর পুরুষদের কাছে অনেক গর্ব করেছিলে, এখন পশ্চাৎপদ হচ্ছ কেন? তুমি যদি অপহৃত গোধন উদ্ধার না ক'রে ফিরে যাও তবে সকলেই উপহাস করবে। সৈরিন্ধ্রী আমার সারথ্য কর্মের প্রশংসা করেছেন, আমি কৃতকার্য না হয়ে ফিরব না। উত্তর বললেন, কৌরবরা সংখ্যায় অনেক, তারা আমাদের ধন হরণ করুক, স্ত্রীপুরুষেও আমাকে উপহাস করুক। এই বলে উত্তর রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন এবং মান দর্প ও ধনুর্বাণ ত্যাগ করে বেগে পালালেন। অর্জুন তাঁকে ধরবার জন্য পিছনে ছুটলেন।

রক্তবর্ণ বস্ত্র প'রে দীর্ঘ বেণী দুলিয়ে অর্জুনকে ছুটতে দেখে কয়েকজন সৈনিক হাসতে লাগল। কৌরবগণ বললেন, ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নির ন্যায় এই লোকটি কে? এর রূপ কতকটা পুরুষের কতকটা স্ত্রীর মত। এর মস্তক গ্রীবা বাহু ও গতি অর্জুনের তুল্য। বোধ হয় বিরাটের পুত্র আমাদের দেখে ভয়ে পালাচ্ছে আর অর্জুন তাকে ধরতে যাচ্ছেন।

অর্জুন এক শ পা গিয়ে উত্তরের চুল ধরলেন। উত্তর কাতর হয়ে বললেন, কল্যাণী সুমধ্যমা বৃহন্নলা, তুমি কথা শোন, রথ ফেরাও, বেঁচে থাকলেই মানুষের মঙ্গল হয়। আমি তোমাকে শত স্বর্ণমুদ্রা, স্বর্ণে গ্রথিত আটটি বৈদূর্য মণি, স্বর্ণধ্বজযুক্ত অশ্বসমেত একটি রথ এবং দশটি মত্ত মাতঙ্গ দেব, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। অর্জুন সহাস্যে উত্তরকে রথের কাছে টেনে এনে বললেন, তুমি যদি না পার তবে আমিই যুদ্ধ করব, তুমি আমার সারথি হও। ভয়ার্ত্ত উত্তর নিতান্ত অনিচ্ছায় রথে উঠলেন এবং অর্জ্জুনের নির্দ্দেশে শমীবৃক্ষের দিকে রথ নিয়ে চললেন।

কৌরবপক্ষীয় বীরগণকে দ্রোণাচার্য্য বললেন, নানাপ্রকার দুর্লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, বায়ু বালুকাবর্ষণ করছে, আকাশ ভস্মের ন্যায় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়েছে, অস্ত্রসকল কোষ থেকে স্খলিত হচ্ছে। তোমরা ব্যূহিত হয়ে আত্মরক্ষা কর, গোধন রক্ষা কর, মহাধনুর্ধর পার্থই ক্লীববেশে আসছেন তাতে সন্দেহ নেই।

কর্ণ বললেন, আপনি সর্বদা অর্জ্জুনের প্রশংসা আর আমাদের নিন্দা করেন, অর্জ্জুনের শক্তি আমার বা দুর্যোধনের ষোল ভাগের এক ভাগও নয়। দুর্যোধন বললেন, ওই লোক যদি অর্জ্জুন হয় তবে আমাদের কার্য্য সিদ্ধ হয়েছে, আমরা জানতে পেরেছি সেজন্য পাণ্ডবদের আবার দ্বাদশ বৎসর বনে যেতে হবে। আর যদি অন্য কেউ হয় তবে তীক্ষ্ণ শরে ওকে ভূপাতিত করব।

শমীবৃক্ষের কাছে এসে অর্জ্জুন উত্তরকে বললেন, তুমি শীঘ্র এই বৃক্ষে উঠে পাণ্ডবদের ধনু শর ধ্বজ ও কবচ নামিয়ে আন। তোমার ধনু আমার আকর্ষণ সইতে পারবে না, শত্রুর হস্তী বিনষ্ট করতেও পারবে না। উত্তর বললেন, শুনেছি এই বৃক্ষে একটা মৃতদেহ বাঁধা আছে, আমি রাজপুত্র হয়ে কি ক'রে তা ছোঁব? অর্জ্জুন বললেন, ভয় পেয়ো না, ওখানে মৃতদেহ নেই, যা আছে তা ধনু প্রভৃতি অস্ত্র, তুমি স্পর্শ করলে পবিত্র হবে। তোমাকে দিয়ে আমি নিন্দিত কর্ম্ম করাব কেন? অর্জ্জুনের আজ্ঞানুসারে উত্তর শমীবৃক্ষ থেকে অস্ত্রসমূহ নামিয়ে এনে বন্ধন খুলে ফেললেন এবং সূর্য্যতুল্য দীপ্যমান সর্পাকৃতি ধনুসকল দেখে ভয়ে রোমাঞ্চিত হলেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে অর্জ্জুন বললেন, এই শতস্বর্ণবিন্দুযুক্ত সহস্রগোধাচিহ্নিত ধনু অর্জ্জুনের, এরই নাম গাণ্ডীব, খাণ্ডবদাহকালে বরুণের নিকট অর্জ্জুন এই ধনু পেয়েছিলেন। এই ধনু, যার ধারণস্থান স্বর্ণময়, ভীমের; ইন্দ্রগোপচিহ্নিত এই ধনু যুধিষ্ঠিরের; সুবর্ণসূর্য্যচিহ্নিত এই ধনু নকুলের; স্বর্ণময় পতঙ্গচিহ্নিত এই ধনু সহদেবের। তাঁদের বাণ তূণীর খড়্গ প্রভৃতিও এই সঙ্গে আছে।

উত্তর বললেন, মহাত্মা পাণ্ডবগণের অস্ত্রসকল এখানে রয়েছে, কিন্তু তাঁরা কোথায়? দ্রৌপদীই বা কোথায়? অর্জ্জুন বললেন, আমি পার্থ, সভাসদ কঙ্কই যুধিষ্ঠির, পাচক বল্লভ ভীম, অশ্বশালা আর গোশালার অধ্যক্ষ নকুল-সহদেব।

সৈরিন্ধ্রীই দ্রৌপদী, যাঁর জন্য কীচক মরেছে। উত্তর বললেন, আমি অর্জ্জুনের দশটি নাম শুনেছি, যদি বলতে পারেন তবে আপনার সব কথা বিশ্বাস করব। অর্জ্জুন বললেন, আমার দশ নাম বলছি শোন। — আমি সবদেশ জয় ক’রে ধন আহরণ করি সেজন্য আমি ধনঞ্জয়। যুদ্ধে শত্রুদের জয় না ক’রে ফিরি না সেজন্য আমি বিজয়। আমার রথে রজতশুভ্র অশ্ব থাকে সেজন্য আমি শ্বেতবাহন। হিমালয়পৃষ্ঠে উত্তর ও পূর্ব্ব ফল্গুনী নক্ষত্রের যোগে আমার জন্ম সেজন্য আমি ফল্গুন। দানবদের সঙ্গে যুদ্ধকালে ইন্দ্র আমাকে সূর্য্যপ্রভ কিরীট দিয়েছিলেন, সেজন্য আমি কিরীটী। যুদ্ধকালে বীভৎসু কর্ম্ম করি না সেজন্য আমার বীভৎসু নাম। বাম ও দক্ষিণ উভয় হস্তেই আমি গাণ্ডীব আকর্ষণ করতে পারি সেজন্য সব্যসাচী নাম। আমার শুভ্র (নিষ্কলঙ্ক) যশ চতুঃসমুদ্র পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত, আমার সকল কর্ম্মও শুভ্র, এজন্য অর্জ্জুন (শুভ্র) নাম। আমি শত্রুবিজয়ই এজন্য জিষ্ণু নাম। সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ বালক সকলের প্রিয়, এজন্য পিতা আমার কৃষ্ণ নাম রেখেছিলেন।

অর্জ্জুনকে অভিবাদন ক’রে উত্তর বললেন, মহাবাহু, ভাগ্যক্রমে আপনার দর্শন পেয়েছি, আমি না জেনে যা বলেছি তা ক্ষমা করুন। আমার ভয় দূর হয়েছে, আপনি রথে উঠুন, যেদিকে বলবেন সেদিকে নিয়ে যাব। কোন্ কর্ম্মের ফলে আপনি ক্লীবত্ব পেয়েছেন? অর্জ্জুন বললেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আদেশে আমি এক বৎসর ব্রহ্মচর্য্য ব্রত পালন করছি, আমি ক্লীব নই। এখন আমার ব্রত সমাপ্ত হয়েছে। অর্জ্জুন তাঁর বাহু থেকে বলয় খুলে ফেলে করতলে স্বর্ণখচিত বর্ম্ম পরলেন এবং শুভ্র বস্ত্রে কেশ বন্ধন করলেন। তার পর তিনি পূর্ব্বমুখ হয়ে সংযতচিত্তে তাঁর অস্ত্রসমূহকে স্মরণ করলেন। তারা কৃতাঞ্জলি হয়ে বললে, ইন্দ্রদত্ত, কিংকরগণ উপস্থিত। অর্জ্জুন তাদের নমস্কার ও স্পর্শ ক’রে বললেন, স্মরণ করলেই তোমরা এস।

গাণ্ডীব ধনুকে গুণ পরিয়ে অর্জ্জুন সবলে আকর্ষণ করলেন। সেই বজ্রনাদতুল্য টংকার শুনে কৌরবগণ বুঝলেন যে, অর্জ্জুনেরই এই জ্যানির্ঘোষ।