বিরাটপর্ব: ১৩। দ্রোণ-দুর্য্যোধনাদির বিতর্ক — ভীষ্মের উপদেশ
উত্তরের রথে যে সিংহধ্বজ ছিল তা নামিয়ে ফেলে অর্জ্জুন বিশ্বকর্ম্মানির্ম্মিত দৈবী মায়া ও কাঞ্চনময় ধ্বজ বসালেন, যার উপরে সিংহলাঙ্গুল বানর ছিল। অগ্নিদেবের আদেশে কয়েকজন ভূতও সেই ধ্বজে অধিষ্ঠিত হ’ল। তার পর শমীবৃক্ষ প্রদক্ষিণ ক'রে অর্জুন রথারোহণে উত্তর দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁর মহাশঙ্খের শব্দ শুনে রথের অশ্বসকল নতজানু হয়ে বসে পড়ল, উত্তরও সসম্ভ্রম হলেন। অর্জুন রশ্মি টেনে অশ্বদের উঠালেন এবং উত্তরকে আলিঙ্গন ক'রে আশ্বস্ত করলেন।
অর্জুনের রথের শব্দ শুনে এবং নানাপ্রকার দুর্লক্ষণ দেখে দ্রোণ বললেন, দুর্যোধন, আজ তোমার সৈন্যদল অর্জুনের বাণে প্রপীড়িত হবে, তারা যেন এখনই পরাভূত হয়েছে, কেউ যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করছে না, বহু যোদ্ধার মুখ বিবর্ণ দেখছি। তুমি গরুগুলিকে নিজ রাজ্যে পাঠিয়ে দাও, আমরা ব্যূহ রচনা করে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করি।
দুর্যোধন বললেন, দ্যুতসভায় এই পণ ছিল যে পরাজিত পক্ষ বার বৎসর বনবাস এবং এক বৎসর অজ্ঞাতবাস করবে। এখনও তের বৎসর পূর্ণ হয় নি অথচ অর্জুন উপস্থিত হয়েছে, অতএব পাণ্ডবদের আবার বার বৎসর বনবাস করতে হবে। হয়তো লোভের বশে পাণ্ডবরা তাদের ভ্রম বুঝতে পারে নি। অজ্ঞাতবাসের কিছুদিন এখনও অবশিষ্ট আছে কি না অথবা পূর্ণকাল অতিক্রান্ত হয়েছে কি না তা পিতামহ ভীষ্ম বলতে পারেন। ত্রিগর্ত সেনা সপ্তমীর দিন অপরাহ্ণে গোধন হরণ করবে এই স্থির ছিল। হয়তো তারা তা করেছে, অথবা পরাজিত হয়ে বিরাটের সঙ্গে সন্ধি করেছে। যে লোক আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসছে সে বোধ হয় বিরাটের কোনও যোদ্ধা কিম্বা স্বয়ং বিরাট। বিরাট বা অর্জুন যিনিই আসুন, আমরা যুদ্ধ করব। আচার্য দ্রোণ আমাদের সৈন্যের পশ্চাতে থাকুন, ইনি আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন আর অর্জুনের প্রশংসা করছেন। আচার্যরা দয়ালু হন, সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা করেন। এঁরা রাজভবনে আর যজ্ঞসভাতেই শোভা পান, লোকসভায় বিচিত্র কথা বলতে পারেন; পরের ছিদ্র অন্বেষণে, মানুষের চরিত্র বিচারে এবং খাদ্যের দোষগুণ নির্ণয়ে এঁরা নিপুণ। এই পণ্ডিতদের পশ্চাতে রেখে আপনারা শত্রুবধের উপায় স্থির করুন।
কর্ণ বললেন, মৎস্যরাজ বা অর্জুন যিনিই আসুন আমি শরাঘাতে নিরস্ত করব। জামদগ্ন্য পরশুরামের কাছে যে অস্ত্র পেয়েছি তার দ্বারা এবং নিজের বলে আমি ইন্দ্রের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে পারি। অর্জুনের ধ্বজাস্থিত বানর আজ আমার অস্ত্রের আঘাতে নিহত হবে, ভূতগণ আর্তনাদ ক'রে পালাবে। আজ অর্জুনকে রথ থেকে নিপাতিত ক'রে আমি দুর্যোধনের হৃদয়ের শল্য সমূলে উৎপাটিত করব।
কৃপ বললেন, রাধেয়, তুমি নিষ্ঠুরপ্রকৃতি, সর্বদাই যুদ্ধ করতে চাও, তার ফল কি হবে তা ভাব ফল কি হবে তা ভাব না। শাস্ত্রে অনেক প্রকার নীতির উল্লেখ আছে, তার মধ্যে যুদ্ধকেই প্রাচীন পণ্ডিতগণ সর্বাপেক্ষা পাপজনক বলেছেন। দেশ কাল যদি অনুকূল হয় তবেই বিক্রমপ্রকাশ বিধেয়। অর্জুনের সঙ্গে এখন আমাদের যুদ্ধ করা উচিত নয়। কর্ণ, অর্জুন যেসব কর্ম করেছেন তার তুল্য তুমি কি করেছ? আমরা প্রতারণা করে তাঁকে তের বৎসর নির্বাসনে রেখেছি, সেই অর্জুন এখন পাশমুক্ত হয়েছে, সে কি আমাদের শেষ করবে না? আমরা সকলে মিলিত হয়ে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু কর্ণ, তুমি একাকী সাহস ক'রো না।
অশ্বত্থামা বললেন, কর্ণ, আমরা গোধন হরণ ক'রে এখনও মৎস্যরাজ্যের সীমা পার হই নি, হস্তিনাপুরেও যাই নি, অথচ তুমি গর্বপ্রকাশ করছ। তোমার প্ররোচনায় দুর্যোধন পাণ্ডবদের সম্পত্তি হরণ করেছে, কিন্তু তুমি কি কখনও দ্বৈরথ-যুদ্ধে তাঁদের একজনকেও জয় করেছ? কোন্ যুদ্ধে তুমি কৃষ্ণকে জয় করেছ— তোমার প্ররোচনায় যাঁকে একবস্ত্রে রজস্বলা অবস্থায় সভায় আনা হয়েছিল? মানুষ এবং কীট-পিপীলিকাদি পর্যন্ত সকল প্রাণীই যথাশক্তি ক্ষমা করে, কিন্তু দ্রৌপদীকে যে কষ্ট দেওয়া হয়েছে তার ক্ষমা পাণ্ডবগণ কখনই করবেন না। ধর্মজ্ঞরা বলেন, শিষ্য পুত্রের চেয়ে কম নয়, এই কারণেই অর্জুন আমার পিতা দ্রোণের প্রিয়। দুর্যোধন, তোমার জন্যই দ্যূতক্রীড়া হয়েছিল, তুমিই দ্রৌপদীকে সভায় আনিয়েছিলে, ইন্দ্রপ্রস্থরাজ্য তুমিই হরণ করেছ, এখন তুমিই অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ কর। তোমার মাতুল ক্ষত্রধর্মবিশারদ দ্যূতধূর্তকার এই শকুনিও যুদ্ধ করুন। কিন্তু শোনো, অর্জুনের গাণ্ডীব অলক্ষ্যক্ষেপণ করে না, তীক্ষ্ণ নিশিত বাণই ক্ষেপণ করে, আর সেইসকল বাণ মধ্যপথে থেমে যায় না। আচার্য (দ্রোণ) যদি ইচ্ছা করেন তবে যুদ্ধ করুন, আমি ধনঞ্জয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করব না। যদি মৎস্যরাজ এখানে আসতেন তবে তাঁর সঙ্গে আমি যুদ্ধ করতাম।
ভীষ্ম বললেন, আচার্যপুত্র (অশ্বত্থামা), কর্ণ যা বলেছেন, তার উদ্দেশ্য তোমাকে যুদ্ধে উত্তেজিত করা। তুমি ক্ষমা কর, এ সময়ে নিজেদের মধ্যে ভেদ হওয়া ভাল নয়, আমাদের মিলিত হয়েই যুদ্ধ করতে হবে।
অশ্বত্থামা বললেন, গুরুদেব (দ্রোণ) কারও উপর আক্রোশের বশে অর্জুনের প্রশংসা করেন নি, —
শত্রোরপি গুণা বাচ্যা দোষা বাচ্যা গুরোরপি।
সর্বথা সর্বযত্নেন পুত্রে শিষ্যে হিতং বদেৎ॥
— শত্রুরও গুণ বলা উচিত, গুরুরও দোষ বলা উচিত, সর্বপ্রকারে সর্বপ্রযত্নে পুত্র ও শিষ্যকে হিতবাক্য বলা উচিত।
দুর্যোধন আচার্যের নিকট ক্ষমা চাইলেন। কর্ণ ভীষ্ম ও কৃপের অনুরোধে দ্রোণ প্রসন্ন হয়ে বললেন, অজ্ঞাতবাস শেষ না হলে অর্জুন আমাদের দর্শন দিতেন না। আজ গোধন উদ্ধার না ক’রে তিনি নিবৃত্ত হবেন না। আপনারা এমন মন্ত্রণা দিন যাতে দুর্যোধনের অযশ না হয় কিংবা ইনি পরাজিত না হন।
জ্যোতিষ গণনা ক’রে ভীষ্ম বললেন, তের বৎসর পূর্ণ হয়েছে এবং তা নিশ্চিতভাবে জেনেই অর্জুন এসেছেন। পাণ্ডবগণ ধর্মজ্ঞ, তাঁরা লোভী নন, অন্যায় উপায়ে তাঁরা রাজ্যলাভ করতে চান না। দুর্যোধন, যুদ্ধে একান্তসিদ্ধি হয় এমন আমি কদাপি দেখি নি, এক পক্ষের জীবন বা মৃত্যু, জয় বা পরাজয় অবশ্যই হয়। অর্জুন এসে পড়লেন, এখন যুদ্ধ করবে কিম্বা ধর্মসম্মত কার্য করবে তা সত্বর স্থির কর।
দুর্যোধন বললেন, পিতামহ, আমি পাণ্ডবদের রাজ্য ফিরিয়ে দেব না, অতএব যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হ’ন। ভীষ্ম বললেন, তা হলে আমি যা ভাল মনে করি তা বলছি শোন। — তুমি সৈন্যের এক-চতুর্থ ভাগ নিয়ে হস্তিনাপুরে যাও, আর এক-চতুর্থাংশ গরু নিয়ে চলে যাক। অবশিষ্ট অর্দ্ধ ভাগ সৈন্য নিয়ে আমরা অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করব।
দুর্যোধন একদল সৈন্য নিয়ে যাত্রা করলেন, গরু নিয়ে আর একদল সৈন্য গেল। তার পর দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ কর্ণ ও ভীষ্ম ব্যূহ রচনা ক’রে থাকলেন সৈন্যের মধ্যভাগে, বাম পার্শ্বে, দক্ষিণ পার্শ্বে, সম্মুখে ও পশ্চাতে অবস্থান করলেন।