উদ্যোগপর্ব: ১১। কৃষ্ণের হস্তিনাপুরে গমন
শরৎকালের অন্তে কার্তিক মাসে একদিন প্রভাতকালে শুভ মুহূর্তে কৃষ্ণ স্নানাহ্নিক ক’রে সূর্য ও অগ্নির উপাসনা করলেন। তার পর তিনি শুভযাত্রার জন্য বৃষস্পর্শ, ব্রাহ্মণদের অভিবাদন এবং অগ্নি প্রদক্ষিণ ক’রে শিনির পৌত্র সাত্যকিকে বললেন, শঙ্খ চক্র গদা তূণীর শক্তি ও অন্যান্য সর্বপ্রকার অস্ত্র আমার রথে রাখ, কারণ শত্রুকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। কৃষ্ণের পরিচারকগণ তাঁর রথ প্রস্তুত করলে। এই রথ চতুরশ্বযোজিত, অর্ধচন্দ্র মৎস্য পশু পক্ষী ও পুষ্পের চিত্রে শোভিত, স্বর্ণ ও মণরত্নে ভূষিত, এবং ব্যাঘ্রচর্মে আবৃত। রথের উপরে গরুড়ধ্বজ স্থাপিত হ’লে কৃষ্ণ সাত্যকিকে তুলে নিলেন। বশিষ্ঠ বামদেব শুক্র নারদ প্রভৃতি দেবর্ষি ও মহর্ষিগণ কৃষ্ণের দক্ষিণ দিকে দাঁড়ালেন। পাণ্ডবগণ এবং দ্রুপদ বিরাট প্রভৃতি কিছুদূর অনুগমন করলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, জনার্দন, যিনি আমাদের বাল্যকাল থেকে বর্ধিত করেছেন, দুর্যোধনের ভয় ও মৃত্যুসংকট থেকে রক্ষা করেছেন, আমাদের জন্য বহু দুঃখ ভোগ করেছেন, পুত্রবিরহবিধুরা আমাদের সেই মাতাকে তুমি অভিবাদন ও আলিঙ্গন ক’রে আশ্বস্ত করো। আমরা যখন বনে যাই তখন তিনি সরোদনে আমাদের পশ্চাতে ধাবিত হয়েছিলেন, আমরা তাঁকে পরিত্যাগ করে প্রস্থান করেছিলাম। তুমি ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ ও অশ্বত্থামা এবং বয়োজ্যেষ্ঠ রাজগণকে আমাদের হয়ে অভিবাদন করো, মহাপ্ৰাজ্ঞ বিদুরকে আলিঙ্গন করো।
অৰ্জুন বললেন, গোবিন্দ, দুৰ্যোধন যদি তোমার কথায় অবজ্ঞা না করে অর্ধরাজ্য আমাদের দেয় তবে আমরা সুখী হব, তা যদি না করে তবে তার পক্ষের সকল ক্ষত্রিয়কে আমি বিনষ্ট করব। এই কথা শুনে ভীম আনন্দিত হয়ে কম্পিত-দেহে সগর্বে গর্জন ক’রে উঠলেন। সেই নিনাদ শুনে সৈন্যগণ কম্পিত হ’ল, হস্তী অশ্ব প্রভৃতি মলমূত্র ত্যাগ করলে।
কৃষ্ণের সারথি দারুক দ্রুতবেগে রথ চালালেন। কিছুদূর যাবার পর নারদ দেবল মৈত্রেয় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন পরশুরাম প্রভৃতি মহর্ষিগণ কৃষ্ণের কাছে এসে বললেন, মহামতি কৃষ্ণ, আমরা তোমার বাক্য ও তার প্রত্যুত্তর শোনবার জন্য কৌরবসভায় যাচ্ছি। তুমি নির্বিঘ্নে অগ্রসর হও, সভায় আবার আমরা তোমাকে দেখব। সূর্যাস্তকালে আকাশ লোহিতবর্ণ হ’লে কৃষ্ণ বৃকস্থলগ্রামে পৌঁছলেন। পরিচারকগণ তাঁর রাত্রিবাসের জন্য সেখানে শিবিরস্থাপন ও খাদ্যপানীয় প্রস্তুত করলে। কৃষ্ণ স্থানীয় ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ করে ভোজন করালেন।
কৃষ্ণ আসছেন এই সংবাদ দূতমুখে শুনে ধৃতরাষ্ট্র হৃষ্ট হয়ে তাঁর উপযুক্ত সংবর্ধনার জন্য সঞ্জয়কে আদেশ দিলেন। দুৰ্যোধন নানা স্থানে সুসজ্জিত পটমণ্ডপ নির্মাণ এবং খাদ্য পেয় প্রভৃতির আয়োজন করলেন। কৃষ্ণ সে সকল উপেক্ষা ক’রে কৌরবরাজধানীর দিকে চললেন।
ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বললেন, আমি কৃষ্ণকে অশ্বসমেত ঘোলাটি স্বর্ণভূষিত রথ, আটটি মদস্রাবী হস্তী, যাদের সন্তান হয় নি এমন এক শ রূপবতী দাসী, এক শ দাস এবং বহু কম্বল ও মৃগচর্ম উপহার দেব। এই উজ্জ্বল বিমল মণি যা দিনে ও রাত্রিতে দীপ্তি দেয়, এটিও দেব। দুৰ্যোধন ভিন্ন আমার সকল পুত্র ও পৌত্র, সালংকারা বারাঙ্গনাগণ এবং অনাবৃতমুখে কল্যাণীয়া কন্যাগণ কৃষ্ণের প্রত্যুদ্গমনের জন্য যাবে। ধ্বজপতাকায় নগর সাজানো হোক, পথে জল দেওয়া হোক।
বিদুর বললেন, মহারাজ, আপনি সরল পথে চলুন, আমি বুঝতে পারছি আপনি ধর্মের জন্য বা কৃষ্ণের প্রিয়কামনায় উপহার দিচ্ছেন না, আপনার এই ভুরি- দক্ষিণা ছিল মাত্র। পাণ্ডবরা পাঁচটি গ্রাম চান, আপনি তাও দিতে প্রস্তুত নন, অথচ অর্থ দিয়ে কৃষ্ণকে স্বপক্ষে আনবার ইচ্ছা করেছেন। ধনদান বা নিন্দা বা অন্য উপায়ে আপনি কৃষ্ণাৰ্জ্জুনের মধ্যে ভেদ ঘটাতে পারবেন না। পূর্ণ কুম্ভ, পাদপ্রক্ষালনের জল এবং কুশলপ্রশ্ন ভিন্ন জনার্দন কিছুই গ্রহণ করবেন না। তিনি কুরু-পাণ্ডবের মঙ্গলকামনায় আসছেন, আপনি তাঁর সেই কামনা পূর্ণ করুন।
দুর্যোধন বললেন, বিদুর সত্য বলেছেন, কৃষ্ণ পাণ্ডবদের প্রতি অনুরক্ত, তাঁকে আমাদের পক্ষে আনা যাবে না। তিনি নিশ্চয়ই পূজ্যাহর্, কিন্তু দেশ কাল বিবেচনা করে তাঁকে এখন মহার্ঘ উপহার দেওয়া উচিত নয়, তিনি মনে করবেন আমরা ভয় পেয়েছি। আমরা যুদ্ধে উদ্যোগী হয়েছি, যুদ্ধ ভিন্ন শান্তি হবে না।
কুরুপিতামহ ভীষ্ম বললেন, তোমরা কৃষ্ণের সমাদর কর বা না কর তিনি ক্ষুব্ধ হবেন না, কিন্তু তাঁকে যেন অবজ্ঞা করা না হয়। তিনি যা বলবেন বিশ্বস্তচিত্তে তোমাদের তাই করা উচিত। তিনি ধর্মসঙ্গত ন্যায্য কথাই বলবেন, তোমরাও তাঁকে প্রিয়বাক্য বলো।
দুর্যোধন বললেন, আমি পাণ্ডবদের সঙ্গে মিলিত হয়ে রাজ্যভোগ করতে পারব না। যা স্থির করেছি শুনুন— আমি জনার্দনকে আবদ্ধ করে রাখব, তা হলে যাদবগণ পাণ্ডবগণ এবং সমস্ত পৃথিবী আমার বশে আসবে।
দুর্যোধনের এই দুরভিসন্ধি শুনে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, এমন ধর্মবিরুদ্ধ কথা বলো না, হৃষীকেশ দূত হয়ে আসছেন, তার উপর তিনি তোমার বৈবাহিক, আমাদের প্রিয় এবং নিরপরাধ। ভীষ্ম বললেন, ধৃতরাষ্ট্র, তোমার দুর্ব্বুদ্ধি পুত্র কেবল অনর্থ বরণ করে, তুমিও এই পাপিষ্ঠের অনুসরণ করছ। কৃষ্ণকে বন্ধন করলে দুর্যোধন তার অমাত্য সহ ক্ষণমধ্যে বিনষ্ট হবে। এই বলে ভীষ্ম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে সভা ত্যাগ করে চলে গেলেন।
প্রাতঃকালে কৃষ্ণ বৃকস্থল ত্যাগ করে হস্তিনাপুরে এলেন। দুর্যোধনের ভ্রাতারা এবং ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতি অগ্রসর হয়ে তাঁর প্রত্যুদগমন করলেন। রাজপথে বহু লোক কৃষ্ণের স্তুতি করতে লাগল, বরনারীগণ উপর থেকে দেখতে লাগলেন, তাঁদের ভারে অতিবৃহৎ অট্টালিকাও যেন স্থানচ্যুত হল। তিন কক্ষ্যা (মহল) অতিক্রম করে কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গেলেন। ধৃতরাষ্ট্রাদি সকলেই গাত্রোত্থান করে সম্বর্ধনা করলেন। পুরোহিতগণ যথাবিধি গো মধুপর্ক ও জল দিয়ে কৃষ্ণের সৎকার করলেন।
কিছুক্ষণ আলাপের পর কৃষ্ণ বিদুরের ভবনে গেলেন এবং অপরাহ্নে পিতৃস্বসা কুন্তীর সঙ্গে দেখা করলেন।