উদ্যোগপর্ব: ১২। কুন্তী, দুর্য্যোধন ও বিদুরের গৃহে কৃষ্ণ

কৃষ্ণের কণ্ঠ আলিঙ্গন করে কুন্তী সরোদনে বললেন, বৎস, আমার পুত্রেরা বাল্যকালেই পিতৃহীন হয়েছিল, আমিই তাদের পালন করেছিলাম। পূর্বে যারা বহু ঐশ্বর্যের মধ্যে সুখে বাস করত তারা কি করে বনবাসের কষ্ট সইল? ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির ও মহাবল ভীমার্জুন কেমন আছে? জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বশবর্তী আমার সেবাকারী বীর সহদেব কেমন আছে? যাকে আমি নিমেষমাত্র না দেখে থাকতে পারতাম না সেই নকুল কেমন আছে? যিনি আমার সকল পুত্র অপেক্ষা প্রিয়, যিনি কুরুসভায় নিগৃহীত হয়েছিলেন, সেই কল্যাণী দ্রৌপদী কেমন আছেন? আমি দুর্যোধনের দোষ দিচ্ছি না, নিজের পিতারই নিন্দা করি। বাল্যকালে যখন আমি কন্দুক নিয়ে খেলতাম তখন তিনি কেন আমাকে কুন্তীভোজের (১) হাতে দিয়েছিলেন? আমি পিতা ও ভাসুর ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক বঞ্চিত হয়েছি, আমার বেঁচে লাভ কি? অর্জুনের জন্মকালে দৈববাণী হয়েছিল — এই পুত্র পৃথিবীজয়ী হবে, এর যশ স্বর্গ স্পর্শ করবে। কৃষ্ণ, যদি ধর্ম থাকেন তবে যাতে সেই দৈববাণী সফল হয় তার চেষ্টা করো। ধনঞ্জয় আর বৃকোদরকে বলো, ক্ষত্রিয় নারী যে নিমিত্ত পুত্র প্রসব করে তার কাল উপস্থিত হয়েছে। এই কাল যদি বৃথা অতিক্রম কর তবে তা অতি অশুভকর কর্ম হবে। উপযুক্ত কাল সমাগত হলে জীবনত্যাগও করতে হয়, তোমরা যদি নীচ কর্ম কর তবে চিরকালের জন্য আমি তোমাদের ত্যাগ করব। নকুল-সহদেবকে বলো, তোমরা বিক্রমার্জিত সম্পদ ভোগ কর, প্রাণের মায়া করো না। অর্জুনকে বলো, তুমি দ্রৌপদীর নির্দিষ্ট পথে চলবে।

(১) আদিপর্ব ১৯-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

কুন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে কৃষ্ণ বললেন, আপনার ন্যায় মহীয়সী কে আছেন? হংসী যেমন এক হৃদ থেকে অন্য হৃদে আসে সেইরূপ আপনার পিতা শূরের (২) বংশ থেকে আপনি কুন্তীভোজের বংশে এসেছেন। আপনি বীরপত্নী, বীরজননী। শীঘ্রই পুত্রদের নীরোগ কৃতকার্য হতশত্রু রাজশ্রীসমন্বিত ও পৃথিবীর অধিপতি দেখবেন।

(২) শূর—বসুদেবের পিতা।

কুন্তীর নিকট বিদায় নিয়ে কৃষ্ণ দুর্যোধনের গৃহে গেলেন। সেখানে দুঃশাসন কর্ণ শকুনি এবং নানা দেশের রাজারা ছিলেন। সংবর্ধনার পর কৃষ্ণ আসনে উপবিষ্ট হ’লে দুর্যোধন তাঁকে ভোজনের অনুরোধ করলেন, কিন্তু কৃষ্ণ সম্মত হলেন না। দুর্যোধন বললেন, জনার্দন, তোমার জন্য যে খাদ্য পানীয় বসন ও শয্যার আয়োজন করা হয়েছে তা তুমি নিলে না কেন? তুমি কুরু-পাণ্ডব দুই পক্ষেরই হিতাকাঙ্ক্ষী ও আত্মীয়, রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রিয়, তথাপি আমাদের আতিথ্য প্রত্যাখ্যান করলে এর কারণ কি?

কৃষ্ণ তাঁর বিশাল বাহু তুলে মেঘগম্ভীর স্বরে বললেন, ভরতবংশধর, দূত কৃতকার্য হ’লেই ভোজন ও পূজা গ্রহণ করে। দুর্যোধন বললেন, এমন কথা বলা তোমার উচিত নয়, তুমি কৃতকার্য বা অকৃতকার্য যাই হও আমরা তোমাকে পূজা করবার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে আছি, তোমার সঙ্গে আমাদের শত্রুতা বা কলহ নেই, তবে আপত্তি করছ কেন? ঈষৎ হাস্য ক’রে কৃষ্ণ বললেন, সম্প্রীতি থাকলে অথবা বিপদে পড়লে পরের অন্ন খাওয়া যায়। রাজা, তুমি আমাদের উপর প্রীত নও, আমি বিপদেও পড়ি নি। শত্রুর অন্ন খাওয়া অনুচিত, তাকে অন্ন দেওয়াও অনুচিত। তুমি পাণ্ডবদের বিদ্বেষ কর, কিন্তু তাঁরা আমার প্রাণস্বরূপ। যে পাণ্ডবদের শত্রুতা করে সে আমারও করে, যে তাঁদের অনুকূল সে আমারও অনুকূল। দুর্ভিসন্ধির জন্য তোমার অন্ন দূষিত, তা আমার গ্রহণীয় নয়, আমি কেবল বিদুরের অন্নই খেতে পারি।

তার পর কৃষ্ণ বিদুরের গৃহে গেলেন। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতি সেখানে গিয়ে বললেন, কৃষ্ণ, তোমার বাসের জন্য সুসজ্জিত বহু গৃহ নিবেদন করছি। কৃষ্ণ বললেন, আপনাদের আগমনেই আমি সংস্কৃত হয়েছি। ভীষ্মাদি চলে গেলে বিদুর বিবিধ পবিত্র ও উপাদেয় খাদ্যপানীয় এনে বললেন, গোবিন্দ, এতেই তৃপ্ত হও, তোমার যোগ্য সমাদর কে করতে পারে? ব্রাহ্মণগণকে নিবেদনের পর কৃষ্ণ তাঁর অনুচরদের সঙ্গে বিদুরের অন্ন ভোজন করলেন।

রাত্রিকালে বিদুর বললেন, কেশব, এখানে আসা তোমার উচিত হয় নি। দুর্যোধন অধার্মিক ক্রোধী দুর্বিনীত ও মূর্খ। সে ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতির ভরসায় এবং বহু সৈন্য সংগ্রহ ক’রে নিজেকে অজেয় মনে করে। যার হিতাহিত জ্ঞান নেই তাকে কিছু বলা বধিরের নিকট গান গাওয়ার সমান। দুর্যোধন তোমার কথা গ্রাহ্য করবে না। নানা দেশের রাজারা সসৈন্যে কৌরবপক্ষে যোগ দিয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে পূর্বে তোমার শত্রুতা ছিল, যাঁদের ধন তুমি হরণ করেছ, তাঁরা সকলেই এখানে এসেছেন। কৌরবসভার এইসকল শত্রুদের মধ্যে তুমি কি ক’রে যাবে? মাধব, পাণ্ডবদের উপর আমার যে প্রীতি আছে তারও অধিক প্রীতি তোমার উপর আছে, সেজন্যই এই কথা বলছি।

কৃষ্ণ বললেন, আপনার কথা মহাপ্রাজ্ঞ বিচক্ষণ এবং পিতামাতার ন্যায় হিতৈষী ব্যক্তিরই উপযুক্ত। আমি দুর্যোধনের দুষ্ট স্বভাব এবং তার অনুগত রাজাদের শত্রুতা জেনেও এখানে এসেছি। মৃত্যুপাশ থেকে পৃথিবীকে যে মুক্ত করতে পারে সে মহান ধর্ম লাভ করে। মানুষ যদি ধর্মকার্যে যথাসাধ্য যত্ন করে তবে সম্পন্ন করতে না পারলেও তার পুণ্য হয়। আবার, কেউ যদি মনে মনে পাপচিন্তা করে কিন্তু কার্যে তা না করে তবে সে পাপের ফল পায় না, ধর্মজ্ঞগণ এইরূপ বলেন। আমি কুরু-পাণ্ডবদের মধ্যে শান্তিস্থাপনের যথাসাধ্য চেষ্টা করব, যাতে তাঁরা যুদ্ধে বিনষ্ট না হন। জ্ঞাতিদের মধ্যে ভেদ হলে যিনি সর্বপ্রযত্নে মধ্যস্থতা না করেন তাঁকে মিত্র বলা যায় না। আমি শান্তির চেষ্টা করলে কোনও শত্রু বা মূর্খ লোক বলতে পারবে না যে কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ কুরু-পাণ্ডবগণকে বারণ করলেন না। দুর্যোধন যদি আমার ধর্মসম্মত হিতকর কথা না শোনেন তবে তিনি কালের কবলে পড়বেন।