উদ্যোগপর্ব: ১৩। কৌরবসভায় কৃষ্ণের অভিভাষণ

পরদিন প্রভাতকালে সুকণ্ঠ সূতমাগধগণের বন্দনায় এবং শঙ্খ ও দুন্দুভির রবে কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গ হ’ল। তাঁর প্রাতঃকৃত্য শেষ হ’লে দুর্যোধন ও শকুনি তাঁর কাছে এসে বললেন, রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্ম প্রভৃতি তোমার প্রতীক্ষা করছেন। কৃষ্ণ অগ্নি ও ব্রাহ্মণগণকে প্রদক্ষিণ করলেন এবং কৌস্তুভ মণি ধারণ ক’রে বিদুরকে নিয়ে রথে উঠলেন। দুর্যোধন শকুনি এবং সাত্যকি প্রভৃতি রথে গজে ও অশ্বে অনুগমন করলেন। বহু সশস্ত্র অস্ত্রধারী সৈন্য কৃষ্ণের অগ্রে এবং বহু হস্তী ও রথ তাঁর পশ্চাতে গেল। রাজসভার নিকট এসে কৃষ্ণের অনুচরগণ শঙ্খ ও বেণুর রবে সর্বদিক নিনাদিত করলে। বিদুর ও সাত্যকির হাত ধ’রে কৃষ্ণ সভাদ্বারে রথ থেকে নামলেন। তিনি সভায় প্রবেশ করলে ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম দ্রোণাদি এবং সমস্ত রাজারা সসম্মানে গাত্রোত্থান করলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে সর্বতোভদ্র নামে একটি স্বর্ণখচিত আসন কৃষ্ণের জন্য রাখা ছিল। সকলকে যথাযোগ্য সম্ভাষণ করে কৃষ্ণ ভীষ্মকে বললেন, নারদাদি ঋষিগণ অন্তরীক্ষে রয়েছেন, তাঁরা এই রাজসভা দেখতে এসেছেন; তাঁদের সম্বর্ধনা ক’রে আসন দিন, তাঁরা না বসলে আমরা কেউ বসতে পারি না। ভীষ্মের আদেশে ভৃত্যেরা মণিকান্তভূষিত বহু আসন নিয়ে এল, ঋষিরা তাতে বসে অর্ঘ্য গ্রহণ করলেন।

অতসীপুষ্পের ন্যায় শ্যামবর্ণ পীতবসনধারী জনার্দন সুবর্ণে গ্রথিত ইন্দ্রনীলমণির ন্যায় শোভমান হলেন। তাঁর আসন স্পর্শ করে বিদুর একটি মৃগচর্মাবৃত মণিময় পীঠে বসলেন। কর্ণ ও দুর্যোধন কৃষ্ণের অদূরে একই আসনে বসলেন। সভা নীরব হল। নিদাঘান্তে মেঘধ্বনির ন্যায় গম্ভীরকণ্ঠে কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে বললেন, ভরতনন্দন, যাতে কুরুপাণ্ডবদের শান্তি হয় এবং বীরগণের বিনাশ না হয় তার জন্য আমি প্রার্থনা করতে এসেছি। আপনাদের বংশ সকল রাজবংশের শ্রেষ্ঠ, এই মহাবংশে আপনার নির্মিত কোনও অন্যায় কর্ম হওয়া উচিত নয়। দুর্যোধনাদি আপনার পুত্রগণ অশিষ্ট, মর্যাদাজ্ঞানশূন্য ও লোভী, এরা ধর্ম ও অর্থ পরিহার করে নিজের শ্রেষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন। কৌরবগণের ঘোর বিপদ উপস্থিত হয়েছে, আপনি যদি উপেক্ষা করেন তবে পৃথিবীর ধ্বংস হবে। আপনি ইচ্ছা করলেই এই বিপদ নিবারিত হতে পারে। মহারাজ, যদি পুত্রদের শাসন করেন এবং সন্ধির জন্য যত্নবান হন তবে দুই পক্ষেরই মঙ্গল হবে। পাণ্ডবগণ যদি আপনার রক্ষক হন তবে ইন্দ্রও আপনাকে জয় করতে পারবেন না। যে পক্ষে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কর্ণ প্রভৃতি আছেন সেই পক্ষে যদি পঞ্চপাণ্ডব ও সাত্যকি প্রভৃতি যোগ দেন তবে কোন্ দুর্বুদ্ধি তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাইবে? কৌরব ও পাণ্ডবগণ মিলিত হলে আপনি অজেয় ও পৃথিবীর অধিপতি হবেন, প্রবল রাজারাও আপনার সঙ্গে সন্ধি করবেন। পাণ্ডবগণ অথবা আপনার পুত্রগণ যুদ্ধে নিহত হলে আপনার কি সুখ হবে বলুন। পৃথিবীর সকল রাজা যুদ্ধের জন্য সমবেত হয়েছেন, তাঁরা ক্রুদ্ধ হয়ে সৈন্য ধ্বংস করবেন। মহারাজ, এই প্রজাবর্গকে আপনি ত্রাণ করুন, আপনি প্রকৃতিস্থ হলে এরা জীবিত থাকবে। এরা নিরপরাধ, দাতা, লজ্জাশীল, সজ্জন, সদ্বংশীয়, এবং পরস্পরের সুহৃৎ, আপনি মহাভয় থেকে এদের রক্ষা করুন। এই রাজারা, যাঁরা উত্তম বসন ও মালা স্মরণ করে এখানে সমবেত হয়েছেন, এঁরা ক্রোধ ও শত্রুতা ত্যাগ করে পানভোজনে তৃপ্ত হয়ে নিরাপদে নিজ নিজ গৃহে ফিরে যান। পিতৃহীন পাণ্ডবগণ আপনার আশ্রয়েই বর্ধিত হয়েছিলেন, আপনি এখনও তাঁদের পুত্রের ন্যায় পালন করুন। পাণ্ডবগণ আপনাকে এই কথা বলেছেন — আপনার আজ্ঞায় আমরা দ্বাদশ বৎসর বনবাসে এবং এক বৎসর অজ্ঞাতবাসে বহু দুঃখ ভোগ করেছি, তথাপি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করি নি। আপনি আমাদের পিতা, আপনিও প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন, আমাদের প্রাপ্য রাজ্যের ভাগ দিন। আমরা সকলে বিপথে চলেছি, আপনি পিতা হয়ে আমাদের সৎপথে আনুন, নিজেও সৎপথে থাকুন। পাণ্ডবরা এই সভাসদ্গণকে লক্ষ্য ক'রে বলেছেন, এঁরা ধর্মজ্ঞ, যেন অন্যায় কার্য না করেন; যে সভায় অধর্ম ধর্মকে এবং অসত্য সত্যকে বিনষ্ট করে সেখানকার সভাসদ্গণও বিনষ্ট হন।

তার পর কৃষ্ণ বললেন, এই সভায় যেসকল মহীপাল আছেন তাঁরা বলুন আমার বাক্য ধর্মসঙ্গত ও অর্থকর কিনা। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, আপনি ক্ষত্রিয়গণকে মৃত্যুপাশ থেকে মুক্ত করুন, ক্রোধের বশীভূত হবেন না। অজাতশত্রু ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির আপনার সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করেছেন তা আপনি জানেন। জতুগৃহদাহের পর তিনি আপনার আশ্রয়েই ফিরে এসেছিলেন। আপনি তাঁকে ইন্দ্রপ্রস্থে পাঠিয়েছিলেন, তিনি সকল রাজাকে বশে এনে আপনারই অধীন করেছিলেন, আপনার মর্যাদা লঙ্ঘন করেন নি। তার পর শকুনি কপট দ্যূতে তাঁর সর্বস্ব হরণ করেছিলেন। সে অবস্থাতেও এবং দ্রৌপদীর নিগ্রহ দেখেও যুধিষ্ঠির ধৈর্যচ্যুত হন নি। মহারাজ, পাণ্ডবগণ আপনার সেবা করতে প্রস্তুত, যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত; আপনি যা হিতকর মনে করেন তাই করুন।