উদ্যোগপর্ব: ১৪। রাজা দম্ভোদ্ভব — মাতলি ও গরুড়

সভায় যে রাজারা ছিলেন তাঁরা সকলেই মনে মনে কৃষ্ণবাক্যের প্রশংসা করলেন, কিন্তু কিছুই বললেন না, নীরবে রোমাঞ্চিত হয়ে রইলেন। তখন জামদগ্ন্য পরশুরাম বললেন, মহারাজ, আমি একটি সত্য দৃষ্টান্ত বলছি শুনুন।— পুরাকালে দম্ভোদ্ভব নামে এক রাজা ছিলেন, তিনি সর্বদা সকলকে প্রশ্ন করতেন, আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বা আমার সমান যোদ্ধা কেউ আছে কিনা। এক তপস্বী ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে বললেন, গন্ধমাদন পর্বতে নর ও নারায়ণ নামে দুই পুরুষশ্রেষ্ঠ তপস্যা করছেন, তুমি কখনও তাঁদের সমান নও, তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। দম্ভোদ্ভব বিশাল সৈন্য নিয়ে গন্ধমাদনে গিয়ে ক্ষুৎপিপাসা ও শীতাতপে শীর্ণ দুই ঋষিকে দেখলেন এবং তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ প্রার্থনা করলেন। নর-নারায়ণ বললেন, এই আশ্রমে ক্রোধ লোভ অস্ত্রশস্ত্র বা কুটিলতা নেই, এখানে যুদ্ধ হ’তে পারে না, তুমি অন্যত্র যাও, পৃথিবীতে বহু ক্ষত্রিয় আছে। দম্ভোদ্ভব শুনলেন না, বার বার যুদ্ধ করতে চাইলেন। তখন নর ঋষি এক মুষ্টি ইষীকা (কাশ তৃণ) নিয়ে বললেন, যুদ্ধকামী ক্ষত্রিয়, তোমার অস্ত্র আর সৈন্যদল নিয়ে এস। রাজা শরবর্ষণ করতে লাগলেন, কিন্তু তাঁর আক্রমণ ব্যর্থ হ'ল। নর ঋষি ইষীকা দিয়ে সেনাগণের চক্ষু কর্ণ নাসিকা বিদ্ধ করতে লাগলেন। ইষীকায় আচ্ছন্ন হয়ে আকাশ শ্বেতবর্ণ হয়ে গেছে দেখে রাজা নর ঋষির চরণে পড়লেন। নর বললেন, আর এমন ক'রো না, তুমি ব্রাহ্মণের হিতকামী এবং নির্লোভ নিরহংকার জিতেন্দ্রিয় ক্ষমাশীল হয়ে প্রজাপালন কর, বলাবল না জেনে কাকেও আক্রমণ ক'রো না। তখন রাজা দম্ভোদ্ভব প্রণাম ক'রে চ'লে গেলেন।

উপাখ্যান শেষ ক'রে পরশুরাম বললেন, মহারাজ, নারায়ণ ঋষি নর অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, নর-নারায়ণই অর্জুন-কৃষ্ণ হয়ে জন্মেছেন। আপনি সদ্‌বুদ্ধি অবলম্বন ক'রে পাণ্ডবগণের সঙ্গে সন্ধি করুন, যুদ্ধে মত দেবেন না।

মহর্ষি কণ্ব বললেন, দুৰ্যোধন, মনে ক'রো না যে তুমিই বলবান, বলবান অপেক্ষাও বলবান দেখা যায়। একটি পুরাতন ইতিহাস বলছি শোন।—ইন্দ্রসারথি মাতলির একটি অনুপম রূপবতী কন্যা ছিল, তার নাম গুণকেশী। মাতলি তাঁর কন্যার যোগ্য বর কোথাও না পেয়ে পাতালে গেলেন। সেই সময়ে নারদও বরুণের কাছে যাচ্ছিলেন; তিনি বললেন, আমরা তোমার কন্যার জন্য বর নির্বাচন ক'রে দেব। নারদ মাতলিকে নাগলোকে নিয়ে গিয়ে বিবিধ আশ্চর্য বস্তু দেখালেন। মাতলি বললেন, এখানে আমার কন্যার যোগ্য বর কেউ নেই, অন্যত্র চলুন। নারদ মাতলিকে দৈত্যদানবদের নিবাস হিরণ্যপুরে নিয়ে গিয়ে বললেন, এখানকার কোনও পুরুষকে নির্বাচন করতে পার। মাতলি বললেন, দানবদের সঙ্গে আমি সম্বন্ধ করতে পারি না, তারা দেবগণের বিপক্ষ। অন্যত্র চলুন, আমি জানি আপনি কেবল বিরোধ ঘটাতে চান! তার পর নারদ গরুড়বংশীয় পক্ষীদের লোকে এসে বললেন, এরা নির্দয় সর্পভোজী, কিন্তু কার্যত ক্ষত্রিয় এবং বিষ্ণুর উপাসক। মাতলি সেখানেও বর নির্বাচন করলেন না। নারদ তাঁকে রসাতল নামক সপ্তম পৃথিবীতলে নিয়ে গেলেন, যেখানে গোমাতা সুরভি বাস করেন, যার ক্ষীরধারা থেকে ক্ষীরোদ সাগরের উৎপত্তি।

তার পর তাঁরা অনন্ত নাগ বাসুকীর পুরীতে গেলেন। সেখানে একটি নাগকে বহুক্ষণ দেখে মাতলি প্রশ্ন করলেন, এই সুদর্শন নাগ কার বংশধর? একে গুণকেশীর যোগ্য মনে করি। নারদ বললেন, ইনি ঐরাবত নাগের বংশজাত আর্যকের পৌত্র, এর নাম সুমুখ। কিছুকাল পূর্বে এর পিতা চিকুর গরুড় কর্তৃক নিহত হয়েছেন। মাতলি প্রীত হয়ে বললেন, এই সুমুখই আমার জামাতা হবেন। সুমুখের পিতামহ আর্যকের কাছে গিয়ে নারদ মাতলির ইচ্ছা জানালেন। আর্যক বললেন, দেবর্ষি, ইন্দ্রের সখা মাতলির সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ কে না চায়? কিন্তু গরুড় আমার পুত্র চিকুরকে ভক্ষণ করেছে এবং বলেছে এক মাস পরে সুমুখকেও খাবে; এই কারণে আমার মনে সুখ নেই। মাতলি বললেন, সুমুখ আমার সঙ্গে ইন্দ্রের কাছে চলুন, ইন্দ্র গরুড়কে নিবৃত্ত করবেন।

নারদ ও মাতলি সুমুখকে নিয়ে দেবরাজের কাছে গেলেন, সেখানে ভগবান বিষ্ণুও ছিলেন। নারদের মুখে সকল বৃত্তান্ত শুনে বিষ্ণু বললেন, বাসব, সুমুখকে অমৃত পান করিয়ে অমর কর। ইন্দ্র সুমুখকে দীর্ঘায়ু দিলেন, কিন্তু অমৃত পান করালেন না। তার পর সুমুখ ও মাতলিকন্যা গুণকেশীর বিবাহ হ’ল।

সুমুখ দীর্ঘায়ু পেয়েছে জেনে গরুড় ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে বললেন, তুমি আমাকে নাগভোজনের বর দিয়েছিলে, এখন বাধা দিলে কেন? ইন্দ্র বললেন, আমি বাধা দিই নি, বিষ্ণুই সুমুখকে অভয় দিয়েছেন। গরুড় বললেন, দেবরাজ, আমি ত্রিভুবনের অধীশ্বর হবার যোগ্য, তথাপি পরের ভৃত্য হয়েছি। তুমি থাকতে বিষ্ণু আমার জীবিকায় বাধা দিতে পারেন না, তুমি আর বিষ্ণুই আমার গৌরব নষ্ট করেছ। তার পর গরুড় বিষ্ণুকে বললেন, আমার পক্ষের এক অংশ দিয়েই তোমাকে আমি অক্লেশে বইতে পারি, ভেবে দেখ কে অধিক বলবান। বিষ্ণু বললেন, তুমি অতি দুর্ব্বল হয়েও নিজেকে বলবান মনে করছ; অণ্ডজ, আমার কাছে আত্মশ্লাঘা ক’রো না। আমি নিজেই নিজেকে বহন করি, তোমাকেও ধারণ করি। তুমি যদি আমার বাম বাহুর ভার সইতে পার তবেই তোমার গর্ব্ব সার্থক হবে। এই ব’লে বিষ্ণু তাঁর বাম বাহু গরুড়ের স্কন্ধে রাখলেন, হতচেতন হয়ে গরুড় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে গরুড় প্রণাম করে বললেন, প্রভু, আমি তোমার ধ্বজবাসী পক্ষী মাত্র, আমাকে ক্ষমা কর। তোমার বল জানতাম না তাই মনে করতাম আমার বলের তুলনা নেই। তখন বিষ্ণু তাঁর পদাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে সুমুখকে গরুড়ের বক্ষে নিক্ষেপ করলেন। সেই অবধি সুমুখের সঙ্গে গরুড় অবিরোধে বাস করেন।

উপাখ্যান শেষ ক’রে কণ্ব বললেন, গরুড়ের গর্ব্ব এইরূপে নষ্ট হয়েছিল। বৎস দুৰ্য্যোধন, যে পৰ্য্যন্ত তুমি যুদ্ধে পাণ্ডবদের সম্মুখীন না হচ্ছ সেই পৰ্য্যন্তই তুমি জীবিত আছ। তুমি বিরোধ ত্যাগ কর, বাসুদেবকে আশ্রয় ক’রে নিজের কুল রক্ষা কর। সর্বদর্শী নারদ জানেন, এই কৃষ্ণই চক্ৰগদাধর বিষ্ণু।

দুৰ্য্যোধন কণ্বের দিকে চেয়ে উচ্চহাস্য করলেন এবং গজশুণ্ডতুল্য নিজের উরুতে চপেটাঘাত ক’রে বললেন, মহর্ষি, ঈশ্বর আমাকে যেমন সৃষ্টি করেছেন এবং ভবিষ্যতে আমার যা হবে আমি সেই ভাবেই চলছি, কেন প্রলাপ বকছেন?