উদ্যোগপর্ব: ১৫। বিশ্বামিত্র, গালব, যযাতি ও মাধবী

নারদ বললেন, দুৰ্য্যোধন, সুহৃদগণের কথা তোমার শোনা উচিত, কোনও বিষয়ে নিৰ্ব্বন্ধ (জিদ) ভাল নয়, তার ফল ভয়ঙ্কর হয়। একটি প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন। — পুরাকালে বিশ্বামিত্র যখন তপস্যা করছিলেন, তখন তাঁর কাছে বশিষ্ঠের রূপ ধরে স্বয়ং ধৰ্ম্মদেব উপস্থিত হলেন। ক্ষুধার্ত্ত অতিথিকে দেখে বিশ্বামিত্র ব্যস্ত হয়ে পরমান্নের চরু পাক করতে লাগলেন। ধৰ্ম্ম অপেক্ষা করলেন না, অন্য তপস্বীদের অন্ন ভোজন করলেন। তার পর বিশ্বামিত্র অদ্ভুত অন্ন নিয়ে এলে ধৰ্ম্ম বললেন, আমি ভোজন করেছি, যে পৰ্য্যন্ত ফিরে না আসি তত কাল তুমি অপেক্ষা কর। বিশ্বামিত্র দুই হাতে মাথার উপর অন্নপাত্র ধরে বায়ুভোজী ও নিশ্চেষ্ট হয়ে রইলেন। এই সময়ে শিষ্য গালব তাঁর পরিচর্য্যা করতে লাগলেন। এক বৎসর পরে বশিষ্ঠরূপী ধৰ্ম্ম ফিরে এসে বললেন, বিপ্রর্ষি, আমি তুষ্ট হয়েছি। এই ব'লে তিনি অন্ন ভোজন ক'রে চ'লে গেলেন।

বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয়ত্ব ত্যাগ ক'রে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করলেন এবং প্রীত হয়ে গালবকে বললেন, বৎস, এখন যেখানে ইচ্ছা হয় যেতে পার। গালব বললেন, আপনাকে গুরুদক্ষিণা কি দেব? তিনি বার বার এই প্রশ্ন করায় বিশ্বামিত্র কিঞ্চিৎ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আমাকে আট শত এমন অশ্ব দাও যাদের কান্তি চন্দ্রের ন্যায় শুভ্র এবং একটি কৰ্ণ শ্যামবর্ণ।

গালব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বিষ্ণুকে স্মরণ করতে লাগলেন। তখন তাঁর সখা গরুড় এসে বললেন, গালব, আমার সঙ্গে এস, তোমার অভীষ্ট পূৰ্ণ হবে। গরুড় গালবকে নিয়ে নানা দিকে নানা লোকে ভ্রমণ করলেন এবং পরিশেষে রাজা যযাতির কাছে এসে গালবের গুরুদক্ষিণার জন্য অশ্ব প্রার্থনা করলেন। যযাতি বললেন, সখা, আমি পূৰ্ব্বের ন্যায় ধনবান নই, কিন্তু এই ব্ৰহ্মৰ্ষিকে নিরাশ করতেও পারি না। গালব, আপনি আমার কন্যা মাধবীকে নিয়ে যান, রাজারা এই কন্যার শুল্কস্বরূপ নিশ্চয় আপনার অভীষ্ট আট শত অশ্ব দেবেন, আমিও দৌহিত্র লাভ করব।

যযাতির কন্যা মাধবীকে নিয়ে গালব অযোধ্যার রাজা হর্য্যশ্বের কাছে গেলেন। তাঁর প্রার্থনা শুনে হর্য্যশ্ব বললেন, এই কন্যা অতি সুলক্ষণা, ইনি রাজচক্রবর্ত্তী পুত্রের জন্ম দিতে পারবেন। কিন্তু আপনি শুল্কস্বরূপ যা চান তেমন অশ্ব দুই শত মাত্র আমার আছে। আমি এই কন্যার গর্ভে একটি পুত্র উৎপাদন করব, আপনিও মোর অভীষ্ট পূর্ণ করুন। মাধবী গালবকে বললেন, এক ব্রহ্মবাদী মুনি আমাকে বর দিয়েছেন — তুমি প্রত্যেক বার প্রসবের পর আবার কুমারী হবে। অতএব আপনি দুই শত অশ্ব নিয়ে আমাকে দান করুন; এর পরে আরও তিন রাজার কাছে আমাকে নিয়ে যাবেন, তাতে আপনার আট শত অশ্ব পূর্ণ হবে, আমারও চার পুত্র লাভ হবে। গালব হর্য্যশ্বকে বললেন, মহারাজ, আমার শুল্কের চতুর্থাংশ নিয়ে আপনি এই কন্যার গর্ভে একটি পুত্র উৎপাদন করুন!

যথাকালে হর্য্যশ্ব বহুমনা নামে একটি পুত্র লাভ করলেন। তখন গালব তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, মহারাজ, আপনি অভীষ্ট পুত্র পেয়েছেন, এখন অবশিষ্ট শুল্কের জন্য আমাকে অন্য রাজার কাছে যেতে হবে। সত্যবাদী হর্য্যশ্ব তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুসারে মাধবীকে প্রত্যর্পণ করলেন, মাধবীও পুনর্ব্বার কুমারী হয়ে গালবের সঙ্গে চললেন। তার পর গালব একে একে কাশীরাজ দিবোদাস এবং ভোজরাজ উশীনরের কাছে গেলেন। তাঁরাও প্রত্যেকে দুই শত অশ্ব দিয়ে মাধবীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করলেন। তাঁদের পুত্রের নাম যথাক্রমে প্রতর্দন ও শিবি।

গরুড় গালবকে বললেন, পূর্ব্বে মহর্ষি ঋচীক কান্যকুব্জরাজ গাধিকে এইরূপ সহস্র অশ্ব শুল্ক দিয়ে তাঁর কন্যা সত্যবতীকে বিবাহ করেছিলেন। এই সকল অশ্ব ঋচীক বরুণালয়ে পেয়েছিলেন। মহারাজ গাধি ব্রাহ্মণগণকে সমস্ত অশ্ব দান করেন, তাঁদের কাছ থেকে হর্য্যশ্ব দিবোদাস ও উশীনর প্রত্যেকে দুই শত অশ্ব ক্রয় করেন, অবশিষ্ট চার শত পথে অপহৃত হয়। এই কারণে আর এরূপ অশ্ব পাওয়া যাবে না, তুমি এই ছয় শতই বিশ্বামিত্রকে দক্ষিণা দাও।

বিশ্বামিত্রের কাছে গিয়ে গালব বললেন, আপনি গুরুদক্ষিণাস্বরূপ এই ছয় শত অশ্ব নিন এবং অবশিষ্ট দুই শতের পরিবর্তে এই কন্যাকে নিন। তিন জন রাজর্ষি এর গর্ভে তিনটি ধার্ম্মিক পুত্র উৎপাদন করেছেন, আপনি চতুর্থ পুত্র উৎপাদন করুন। বিশ্বামিত্র বললেন, গালব, তুমি প্রথমেই এই কন্যা আমাকে দাও নি কেন, তা হলে আমার চারটি বংশধর পুত্র হত। বিশ্বামিত্র মাধবীকে নিলেন, অশ্বগুলি তাঁর আশ্রমে বিচরণ করতে লাগল। যথাকালে অষ্টক নামে মাধবীর একটি পুত্র হল। বিশ্বামিত্র এই পুত্রকে ধর্ম্ম অর্থ ও অশ্বগুলি দান করলেন এবং মাধবীকে শিষ্য গালবের হাতে দিয়ে বনে চ’লে গেলেন।

গালব মাধবীকে বললেন, তোমার প্রথম পুত্র বহুমনা দাতা, দ্বিতীয় প্রতর্দন বীর, তৃতীয় শিবি সত্যধর্ম্মরত এবং চতুর্থ অষ্টক যজ্ঞকারী। তুমি এই চার পুত্র প্রসব ক’রে আমাকে, চার জন রাজাকে এবং তোমার পিতাকে উদ্ধার করেছ।

তার পর গরুড়ের সম্মতি নিয়ে গালব মাধবীকে যযাতির হাতে প্রত্যর্পণ ক’রে বনে তপস্যা করতে গেলেন।

যযাতি তাঁর কন্যার স্বয়ম্বর করাবার ইচ্ছা করলেন। যযাতিপুত্র যদু ও পুরু ভগিনীকে রথে নিয়ে গঙ্গাযমুনাসঙ্গমস্থ আশ্রমে গেলেন। বহু রাজা এবং নাগ যক্ষ গন্ধর্ব প্রভৃতি স্বয়ম্বরে উপস্থিত হলেন, কিন্তু মাধবী সকলকে প্রত্যাখ্যান ক’রে তপোবনকেই বরণ করলেন। তিনি মৃগীর ন্যায় বনচারিণী হয়ে বিবিধ ব্রতনিয়ম ও ব্রহ্মচর্য পালন ক’রে ধর্মসঞ্চয় করতে লাগলেন।

দীর্ঘ আয়ু ভোগ করে যযাতি স্বর্গে গেলেন। বহু বর্ষ স্বর্গবাসের পর তিনি মোহবশে দেবতা ঋষি ও মনুষ্যকে অবজ্ঞা করতে লাগলেন। স্বর্গবাসী রাজর্ষিগণ তাঁকে ধিক্কার দিয়ে বললেন, এ কেন স্বর্গে এল? কে একে চেনে? সকলেই বললেন, আমরা একে চিনি না। তখন যযাতির তেজ নষ্ট হ’ল, তিনি তাঁর আসন থেকে চ্যুত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পড়তে লাগলেন। দেবরাজের এক দূত এসে তাঁকে বললেন, রাজা, তুমি অত্যন্ত মদগর্বিত, সকলকেই অপমান কর, তুমি স্বর্গবাসের যোগ্য নও, গর্বের জন্যই তোমার পতন হ’ল। যযাতি স্থির করলেন, আমি সাধুজনের মধ্যেই পতিত হব। সেই সময়ে প্রতর্দন বসুমনা শিবি ও অষ্টক নৈমিষারণ্যে বাজপেয় যজ্ঞ করছিলেন। যজ্ঞের ধর্ম অবলম্বন করে যযাতি সেই চার রাজার মধ্যে অবতরণ করলেন। তখন মাধবীও বিচরণ করতে করতে সেখানে এলেন এবং পিতা যযাতিকে প্রণাম ক’রে বললেন, এই চার জন আমার পুত্র, আপনার দৌহিত্র। আমি যে ধর্ম সঞ্চয় করেছি তার অর্ধ আপনি নিন। প্রতর্দন প্রভৃতি রাজারা তাঁদের জননী ও মাতামহকে প্রণাম করলেন। গালবও অকস্মাৎ সেখানে এসে বললেন, রাজা, আমার তপস্যার অষ্টম ভাগ নিয়ে আপনি স্বর্গারোহণ করুন।

সাধুজন যেমন তাঁকে চিনতে পারলেন তৎক্ষণাৎ যযাতির পতন নিবারিত হ’ল। প্রতর্দন প্রভৃতি উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমরা সৎকর্মের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছি তা আপনাকে দিলাম, তার প্রভাবে আপনি স্বর্গারোহণ করুন। যযাতি ভূমি স্পর্শ করলেন না, দৌহিত্রগণের উক্তির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী ত্যাগ করে স্বর্গে উঠতে লাগলেন। দেবতারা তাঁকে সাদরে অভিনন্দন করলেন। ব্রহ্মা বললেন, মহারাজ, তুমি বহু যজ্ঞ দান ও প্রজাপালন ক’রে যে পুণ্য অর্জন করেছিলে তা তোমার অভিমানের ফলে নষ্ট হয়েছিল, তাই তুমি স্বর্গবাসীদের ধিক্কার পেয়ে পতিত হয়েছিলে। অভিমান বলগর্ব হিংসা কপটতা বা শঠতা থাকলে স্বর্গভোগ চিরস্থায়ী হয় না। উত্তম মধ্যম বা অধম কাউকেও তুমি অপমান ক’রো না, গর্বিত লোকে শান্তি পায় না।

উপাখ্যান শেষ ক’রে নারদ বললেন, অভিমানের ফলে যযাতি স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন, অতিশয় নির্বন্ধের জন্য গালবও দুঃখভোগ করেছিলেন। দুর্যোধন, তুমি অভিমান ক্রোধ ও বংশের অভিপ্রায় ত্যাগ কর, পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি কর।