উদ্যোগপর্ব: ১৬। দুর্য্যোধনের দুরাগ্রহ

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ভগবান নারদের কথা সত্য, আমিও সেরূপ ইচ্ছা করি, কিন্তু আমার শক্তি নেই। কৃষ্ণ, তুমি যা বলেছ তা ধর্মসংগত ও ন্যায্য, কিন্তু বৎস, আমি স্বাধীন নই, দুরাত্মা পুত্রেরা আমার আদেশ মানবে না, গান্ধারী বিদুর ভীষ্ম প্রভৃতির কথাও দুর্যোধন শোনে না। তুমিই ওই দুর্বুদ্ধিকে বোঝাবার চেষ্টা কর।

কৃষ্ণ মিষ্ট বাক্যে দুর্যোধনকে বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, মহাপ্রাজ্ঞ বংশে তোমার জন্ম, তুমি শাস্ত্রজ্ঞ ও সর্বগুণান্বিত, যা ন্যায়সম্মত তাই কর। সজ্জনের প্রবৃত্তি ধর্মার্থযুক্ত দেখা যায়, কিন্তু তোমাতে তার বিপরীতই দেখছি। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, অশ্বত্থামা, বিদুর, সোমদত্ত, বাহ্লীকরাজ, বিকর্ণ (১), বিবিংশতি (১), সঞ্জয় এবং তোমার জ্ঞাতি ও মিত্রগণ সকলেই সন্ধি চান। তুমি পিতামাতার বশবর্তী হও। যে লোক শ্রেষ্ঠ সুহৃদগণের উপদেশ অগ্রাহ্য ক’রে হীন মন্ত্রণা দাতাদের মতে চলে সে ঘোর বিপদে পড়ে। তুমি আজন্ম পাণ্ডবদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছ কিন্তু তাঁরা তা সয়েছেন। পাণ্ডবরা যে রাজ্য জয় করেছিলেন তা এখন তুমি ভোগ করছ, কর্ণ দুঃশাসন শকুনি প্রভৃতির সহায়তায় তুমি ঐশ্বর্যলাভ করতে চাচ্ছ। তোমার সমস্ত সৈন্য এবং ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতি সকলে মিলেও ধনঞ্জয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবেন না। খাণ্ডবপ্রস্থে যিনি দেবতা গন্ধর্ব যক্ষ প্রভৃতিকে জয় করেছিলেন, কোন্ মানুষ তাঁর সমকক্ষ? শুনেছি বিরাটনগরে বহু জনের সঙ্গে এক জনের আশ্চর্য যুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধই আমার উক্তির যথেষ্ট প্রমাণ। যিনি সাক্ষাৎ মহাদেবকে যুদ্ধে সন্তুষ্ট করেছিলেন, আমি যাঁর সঙ্গে থাকব, সেই অর্জুনকে তুমি জয় করবার আশা কর! রাজা দুর্যোধন, কৌরবকুল যেন বিনষ্ট না হয়, লোকে যেন তোমাকে নষ্টকীর্তি কুলঘ্ন না বলে। পাণ্ডবগণ তোমাকে যুবরাজের পদে এবং ধৃতরাষ্ট্রকে মহারাজের পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন, তুমি তাঁদের অর্ধ রাজ্য দিয়ে রাজলক্ষ্মী লাভ কর।

(১) দুর্যোধনের ভ্রাতা।

ভীষ্ম দুর্যোধনকে বললেন, বৎস, তুমি কৃষ্ণের কথা শোন, কুলঘ্ন কুপুত্র... হয়ো না, হিতৈষীদের বাক্য লঙ্ঘন ক'রে কুপথে যেয়ো না, পিতামাতাকে শোকসাগরে মগ্ন কোরো না। দ্রোণ বললেন, বৎস, কেশব ও ভীষ্ম তোমাকে ধর্মসঙ্গত হিতবাক্যই বলেছেন, তুমি এ'দের কথা রাখ, কৃষ্ণের অপমান ক'রো না। আত্মীয়বর্গ ও সমস্ত প্রজার মৃত্যুর কারণ হয়ো না, কৃষ্ণার্জুন যে পক্ষে আছেন সে পক্ষকে তুমি অজেয় জেনো। বিদুর বললেন, দুর্যোধন, তোমার জন্য শোক করি না, তোমার বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্যই করি। তোমার কর্মের ফলে এ'রা অনাথ ও মিত্রহীন হয়ে হীনপক্ষ পক্ষীর ন্যায় বিচরণ করবেন, কুলনাশক কুপুত্রকে জন্ম দেবার ফলে ভিক্ষুক হবেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, দুর্যোধন, মহাত্মা কৃষ্ণের কথা অতিশয় মঙ্গলজনক, তাতে অলব্ধ বিষয়ের লাভ হবে, লব্ধ বিষয়ের রক্ষা হবে। তুমি যদি এ'র অনুরোধ প্রত্যাখ্যান কর তবে নিশ্চয় পরাভূত হবে। ভীষ্ম ও দ্রোণ বললেন, দুর্যোধন, যুদ্ধারম্ভের পূর্বেই শত্রুতার অবসান হ'ক। তুমি নতমস্তকে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম কর, তিনি তাঁর সুলক্ষণ দক্ষিণ বাহু তোমার স্কন্ধে রাখুন, তোমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিন; ভীমসেন তোমাকে আলিঙ্গন করুন, পাণ্ডব ভ্রাতাদের সঙ্গে তোমাকে মিলিত দেখে এই রাজারা সকলে আনন্দাশ্রু মোচন করুন।

দুর্যোধন কৃষ্ণকে বললেন, তুমি বিবেচনা না ক'রে কেবল পাণ্ডবদের প্রতি প্রীতির বশে আমাকে নিন্দা করছ। তুমি বিদুর পিতা পিতামহ ও আচার্য দ্রোণ — তোমরা কেবল আমাকেই দোষ দাও, পাণ্ডবদের দোষ দেখ না। বিশেষ চিন্তা ক'রেও আমি নিজের বৃহৎ বা ক্ষুদ্র কোনও অপরাধই দেখতে পাই না। পাণ্ডবগণ দ্যুতক্রীড়া ভালবাসতেন সেজন্যই আমাদের সভায় এসেছিলেন। সেখানে শকুনি তাঁদের রাজ্য জয় করেছিলেন তাতে আমার কি দোষ? বিজিত ধন পিতার আজ্ঞায় তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার পর তাঁরা আবার পরাজিত হয়ে বনে গিয়েছিলেন, তাতেও আমাদের অপরাধ হয় নি। তবে কি জন্য তাঁরা কৌরবদের শত্রুগণের সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাদের বিনষ্ট করতে চান? উগ্র কর্মে বা কঠোর বাক্যে ভয় পেয়ে আমরা ইন্দ্রের কাছেও নত হব না। পাণ্ডবদের কথা দূরে থাক, দেবতারাও ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কর্ণকে পরাস্ত করতে পারেন না। আমরা শত্রুর নিকট নত না হয়ে যদি যুদ্ধে বীরশয্যা লাভ করি তবে বন্ধুগণ আমাদের জন্য শোক করবেন না। কেশব, পূর্বে আমার পিতা পাণ্ডবগণকে যে রাজ্যাংশ দেবার আদেশ দিয়েছিলেন, আমি জীবিত থাকতে পাণ্ডবরা তা পাবেন না। যখন আমি অল্পবয়স্ক ও পরাধীন ছিলাম, তখন অজ্ঞতা বা ভয়ের বশে পিতা যা দিতে চেয়েছিলেন এখন তা আমি দেব না। তীক্ষ্ণ সূচীর অগ্রভাগে যে পরিমাণ ভূমি বিদ্ধ হয়, তাও আমি ছাড়ব না।

ক্রোধচঞ্চলনয়নে হাস্য করে কৃষ্ণ বললেন, তুমি আর তোমার মন্ত্রীরা যুদ্ধে বীরশয্যাই লাভ করবে। পাণ্ডবদের ঐশ্বর্য দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তুমি শকুনির সঙ্গে দ্যূতসভার আয়োজন করেছিলে। তুমি ভিন্ন আর কে ভ্রাতৃজায়াকে সভায় আনিয়ে নির্যাতন করতে পারে? তুমি কর্ণ আর দুঃশাসন অনার্যের ন্যায় বহু নিষ্ঠুর কথা বলেছিলে। বারণাবতে পঞ্চপাণ্ডব ও কুন্তীকে তুমি দগ্ধ করার চেষ্টা করেছিলে। সর্বদাই তুমি পাণ্ডবদের সঙ্গে এইরূপ ব্যবহার করে আসছ, তবে তুমি অপরাধী নও কেন? তারা তাদের পৈতৃক অংশই চাচ্ছেন, তাতেও তুমি সম্মত নও। পাপাত্মা, ঐশ্বর্যভ্রষ্ট ও নিপাতিত হয়ে তোমাকে অবশেষে সবই দান করতে হবে।

দুঃশাসন দুর্যোধনকে বললেন, রাজা, আপনি যদি সন্ধি না করেন, তবে ভীষ্ম দ্রোণ ও পিতা আপনাকে আমাকে ও কর্ণকে বন্ধন করে পাণ্ডবদের হাতে দেবেন। এই কথা শুনে দুর্যোধন ক্রুদ্ধ হয়ে মহানাগের ন্যায় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে সভা থেকে উঠে চলে গেলেন; তাঁর ভ্রাতারা মন্ত্রীরা এবং অনুগত রাজারাও তাঁর অনুসরণ করলেন।

ভীষ্ম বললেন, ধর্ম ও অর্থ বিসর্জন দিয়ে যে লোক ক্রোধের বশবর্তী হয়, শীঘ্রই সে বিপদে পড়ে এবং তার শত্রুরা হাসে। কৃষ্ণ বললেন, কুরুবংশের বৃদ্ধগণ মহা অন্যায় করেছেন, একটা মূর্খকে রাজার ক্ষমতা দিয়েছেন অথচ তাকে নিয়ন্ত্রিত করেন নি। ভরতবংশীয়গণ, আপনাদের হিতার্থে আমি যা বলছি আশা করি তা আপনাদের অনুমোদিত হবে।—দুরাত্মা কংস তার পিতা ভোজরাজ উগ্রসেন জীবিত থাকতেই তাঁর রাজ্য হরণ করেছিল। আমি তাকে বধ করে পুনর্বার উগ্রসেনকে রাজপদে বসিয়েছি। কুলরক্ষার জন্য যাদব বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয়গণ কংসকে ত্যাগ করে স্বস্তিলাভ করেছেন। দেবাসুরের যুদ্ধকালে যখন সমস্ত লোক দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে ধ্বংসের মুখে যাচ্ছিল তখন ব্রহ্মার আদেশে ধর্মদেব দৈত্যদানবগণকে বন্ধন করে বরুণের নিকট সমর্পণ করেছিলেন। আপনারাও দুর্যোধন কর্ণ শকুনি আর দুঃশাসনকে বন্ধন করে পাণ্ডবদের হাতে দিন। অথবা কেবল দুর্যোধনকেই সমর্পণ করে সন্ধি স্থাপন করুন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, আপনার দুর্বলতার জন্য যেন ক্ষত্রিয়গণ বিনষ্ট না হন।—

ত্যজেৎ কুলার্থে পুরুষং গ্রামস্যার্থে কুলং ত্যজেৎ।
গ্রামং জনপদস্যার্থে আত্মার্থে পৃথিবীং ত্যজেৎ।।

—কুলরক্ষার প্রয়োজনে একজনকে ত্যাগ করবে, গ্রামরক্ষার জন্য কুলত্যাগ, দেশরক্ষার জন্য গ্রামত্যাগ এবং আত্মরক্ষার জন্য পৃথিবীও ত্যাগ করবে।