উদ্যোগপর্ব: ১৭। গান্ধারীর উপদেশ — কৃষ্ণের সভাত্যাগ
কৃষ্ণের কথায় ধৃতরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে বিদুরকে বললেন, দূরদর্শিনী গান্ধারীকে এখানে ডেকে আন, আমি তাঁর সঙ্গে দুর্যোধনকে অনুনয় করব। গান্ধারী এলে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, তোমার দুরাত্মা অবাধ্য পুত্র প্রভুত্বের লোভে রাজ্য ও প্রাণ দুই হারিয়েছে, সুহৃদ্গণের উপদেশ না শুনে সে অশিষ্টের ন্যায় সভা থেকে চ'লে গেছে।
গান্ধারী বললেন, অশিষ্ট অবিনীত ধর্মনাশক লোকের রাজা পাওয়া উচিত নয় তথাপি সে পেয়েছে। মহারাজ, তুমিই দোষী, পুত্রের দুষ্ট প্রবৃত্তি জেনেও স্নেহবশে তার মতে চলেছ, মূঢ় দুরাত্মা লোভী কুসঙ্গী পুত্রকে রাজ্য দিয়ে এখন তার ফল ভোগ করছ।
ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে বিদুর দুর্যোধনকে আবার সভায় নিয়ে এলেন। গান্ধারী বললেন, পুত্র, তোমার পিতা ও ভীষ্মদ্রোণাদি সুহৃদ্বর্গের কথা রাখ। রাজত্বের অর্থ মহৎ প্রভুত্ব, দুরাত্মারা এই পদ কামনা করে কিন্তু রাখতে পারে না। যে লোক কামনা বা ক্রোধের বশে আত্মীয় বা অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণ করে, কেউ তার সহায় হয় না। পাণ্ডবগণ ঐক্যবদ্ধ মহাপ্রাজ্ঞ বীর, তাঁদের সঙ্গে মিলিত হ'লে তুমি সুখে পৃথিবী ভোগ করতে পারবে। বৎস, ভীষ্ম-দ্রোণ যা বলেছেন তা সত্য, কৃষ্ণার্জুন অজেয়। তুমি কেশবের শরণাপন্ন হও, তা হ'লে তিনি উভয় পক্ষের মঙ্গল করবেন। যুদ্ধে কল্যাণ নেই, ধর্ম বা অর্থ নেই, সুখ নেই, সর্বদা জয়ও হয় না। তুমি তের বৎসর পাণ্ডবদের প্রচুর অপকার করেছ, তোমার কামনা আর ক্রোধের জন্য তা বর্ধিত হয়েছে, এখন তার উপশম কর। মূঢ়, তুমি মনে কর ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ প্রভৃতি তোমার জন্য যুদ্ধে সর্ব শক্তি প্রয়োগ করবেন, কিন্তু তা হবে না। কারণ, এই রাজ্যে তোমাদের আর পাণ্ডবদের সমান অধিকার, দুই পক্ষের সঙ্গেই এ'দের সমান স্নেহসম্বন্ধ, কিন্তু পাণ্ডবরা অধিকতর ধর্মশীল। ভীষ্মাদি তোমার অন্নে পালিত সেজন্য জীবন বিসর্জন দিতে পারেন, কিন্তু যুধিষ্ঠিরকে শত্রুরূপে দেখতে পারবেন না। বৎস, কেবল লোভ করলে সম্পত্তিলাভ হয় না, লোভ ত্যাগ কর, শান্ত হও।
মাতার কথায় অনাদর দেখিয়ে দুর্যোধন ক্রুদ্ধ হয়ে শকুনি কর্ণ ও দুঃশাসনের কাছে গেলেন। তাঁরা মন্ত্রণা ক'রে স্থির করলেন, কৃষ্ণ ক্ষিপ্রকারী, তিনি ধৃতরাষ্ট্র আর ভীষ্মের সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাদের বন্ধন করতে চান; অতএব আমরাই আগে তাঁকে সবলে নিগৃহীত করব, তাতে পাণ্ডবরা বিমূঢ় ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়বে। ধৃতরাষ্ট্র ক্রুদ্ধ হয়ে বারণ করলেও আমরা কৃষ্ণকে বন্ধন ক'রে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করব।
দুর্যোধনাদির এই অভিসন্ধি বুঝতে পেরে সাত্যকি সভা থেকে বেরিয়ে কৃতবর্ম্মাকে বললেন, শীঘ্র আমাদের সৈন্য ব্যূহবদ্ধ কর এবং বর্ম্ম ধারণ ক'রে তুমি এই সভার দ্বারদেশে থাক। তার পর সাত্যকি সভায় গিয়ে কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরকে দুর্যোধনাদির অভিসন্ধি জানিয়ে বললেন, বালক ও জড়বুদ্ধি যেমন বস্ত্রদ্বারা প্রজ্বলিত অগ্নি আবরণ করতে চায়, এই মূর্খগণ সেইরূপ কৃষ্ণকে বন্ধন করতে চাচ্ছে। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, মহারাজ, আপনার পুত্রেরা কালের কবলে পড়েছে, তারা বিগর্হিত অসাধ্য কর্ম্ম করতে যাচ্ছে।
কৃষ্ণ বললেন, রাজা, এরা যদি আমাকে সবলে বন্দী করতে চায় তবে আপনি অনুমতি দিন, এরা আমাকে বাঁধুক কিম্বা আমিই এদের বাঁধি। আমি এদের সকলকে নিগৃহীত ক'রে পাণ্ডবদের হাতে দিতে পারি, তাতে অনায়াসে তাঁদের কার্যসিদ্ধি হবে। কিন্তু আপনার সমক্ষে আমি এই নিন্দিত কর্ম্ম করব না। আমি অনুমতি দিচ্ছি, দুর্যোধন যা ইচ্ছা হয় করুক।
দুর্যোধনকে আবার ডেকে আনিয়ে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, নৃশংস পাপিষ্ঠ, তুমি ক্ষুদ্রবুদ্ধি পাপাত্মাদের সাহায্যে পাপকর্ম্ম করতে চাচ্ছ! হস্ত দ্বারা বায়ুকে ধরা যায় না, চন্দ্রকেও স্পর্শ করা যায় না, মস্তকদ্বারা পৃথিবী ধারণ করা যায় না; সেইরূপ কৃষ্ণকেও সবলে গ্রহণ করা যায় না।
কৃষ্ণ বললেন, দুর্যোধন, তুমি মোহবশে মনে করছ আমি একাকী, তাই আমাকে সবলে বন্দী করতে চাচ্ছ। এই দেখ— পাণ্ডবগণ, অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয়গণ, আদিত্য রুদ্র ও বসুগণ, মহর্ষিগণ, সকলেই এখানে আছেন। এই ব'লে কৃষ্ণ উচ্চহাস্য করলেন। তখন সহসা তাঁর ললাটে ব্রহ্মা, বক্ষে রুদ্র, মুখ থেকে অগ্নি, এবং অন্যান্য অঙ্গ থেকে ইন্দ্রাদি দেবতা যক্ষ রক্ষ গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি, হলধর বলরাম ও পঞ্চ পাণ্ডব আবির্ভূত হলেন। আয়ুধ উদ্যত ক'রে অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয় বীরগণ তাঁর সম্মুখে এলেন এবং শঙ্খ চক্র গদা শক্তি শার্ঙ্গধনু প্রভৃতি সর্বপ্রকার প্রহরণও উপস্থিত হ’ল। সহস্রচরণ সহস্রবাহু সহস্রনয়ন কৃষ্ণের ঘোর মূর্ত্তি দেখে সভাস্থ সকলে ভয়ে চোখ বুজলেন, কেবল ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর সঞ্জয় ও ঋষিরা চেয়ে রইলেন, কারণ ভগবান জনার্দন তাঁদের দিব্যচক্ষু দিয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রও দিব্যদৃষ্টি পেয়ে কৃষ্ণের পরম রূপ দেখলেন। দেবতা গন্ধর্ব্ব ঋষি প্রভৃতি প্রণাম ক'রে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, প্রভু, প্রসন্ন হও, তোমার রূপ সংবরণ কর, নতুবা জগৎ বিনষ্ট হবে।
তখন কৃষ্ণ পূর্ব রূপ গ্রহণ করলেন এবং ঋষিদের অনুমতি নিয়ে সাত্যকি আর বিদুরের হাত ধরে সভা থেকে বেরিয়ে এলেন। নারদাদি মহর্ষিগণও অন্তর্হিত হলেন।
দারুকের আনীত রথে উঠে কৃষ্ণ যখন প্রস্থাপনের উপক্রম করছিলেন তখন ধৃতরাষ্ট্র তাঁর কাছে এসে বললেন, জনার্দন, পরদের উপর আমার কতটুকু প্রভাব তা তুমি দেখলে। আমার দূরভিসন্ধি নেই, দুর্যোধনকে যা বলেছি তা তুমি শুনেছ। সকলেই জানে যে আমি সর্বপ্রযত্নে শান্তির চেষ্টা করছি।
ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্মদ্রোণাদিকে কৃষ্ণ বললেন, কৌরবসভার যা হ’ল তা আপনারা দেখলেন, দুর্যোধন আমাকে বন্দী করবার চেষ্টা করেছে তাও জানেন। ধৃতরাষ্ট্রও বলছেন তাঁর কোনও প্রভুত্ব নেই। এখন আপনারা আজ্ঞা দিন আমি যুধিষ্ঠিরের কাছে ফিরে যাব। এই বলে কৃষ্ণ রথারোহণে কুন্তীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।